Thursday, September 22, 2022

গণেশ কি পরম বৈষ্ণব? গণেশ কি বৈদিক?


গণেশ, শিবগণের মুখ্য, তাদের নায়ক.. গণনায়ক; তিনি কি বৈষ্ণব হবেন? স্বয়ং পরমেশ্বর শিব যিনি নিজেই বৈষ্ণব নন বরং নারায়ন উনার ভজনা করেন সেই পরম প্রভুর গণনায়ক কিভাবে বৈষ্ণব হতে পারেন??  তিনি বিঘ্নেশ, বিঘ্নকর্তা; আবার একইসঙ্গে তিনি সিদ্ধিদাতা। যিনি সিদ্ধি দান করেন তিনি বিঘ্নের কর্তা বা বিঘ্ন দান করেন কীভাবে? আসুন আলোচনা করি। 

তিনি কেন গজানন? 

প্রথমেই বাঙালী পাঠক ভ্রূ তুলে বলবেন, "শনি, শনি; শনির নজরেই তো উমার ছেলের অত সুন্দর মুখটা গলা থেকে খসে পড়ল। আহা গো!" 

বাঙালী মানসে ব্রহ্মবৈবর্তের প্রভাব অনস্বীকার্য ও সুদূরপ্রসারী। সেই ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণেই আছে শনির দৃষ্টির জন্য গণেশ গজমুণ্ডধারী। 

ছোটবেলায় এটাই আমিও জানতাম। তারপর ধীরে ধীরে পৌরাণিক সিরিয়ালের বাড়বাড়ন্তের আমলে শিবপুরাণের তথ্যটি সামনে এল। 

উমা নিজের গাত্রমল দিয়ে এক শিশুকে সৃজন করেছেন। নিযুক্ত করেছেন দ্বারপালরূপে। শিব উপস্থিত হয়েছেন উমাভবনের দ্বারে। বিনায়ক কিছুতেই তাকে প্রবেশ করতে দেবেন না। অবশেষে শিবের ত্রিশূলের আঘাতেই তিনি মুণ্ডহীন হলেন যদিও পরে গজানন রূপে আত্মপ্রকাশ করলেন। 

শিবপুরাণ অনুসারে, দেবী পার্বতী কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থী তিথিতে বিনায়ককে সৃজন করেছিলেন। 

তবে এই দুই কাহিনির পরেও রয়ে যায় কিছু অতিরিক্ত; যা নিয়ে সকলে চর্চা করেন, যে কাহিনি সকলের জানা তা চর্বিতচর্বণে আমি আগ্রহী নই কোনওকালেই। গণেশ কেন গজানন এই বিষয় নিয়েও আজকের দিনে আলোচনা করতাম না কিন্তু আমি নিশ্চিত গণেশের গজানন হওয়ার যে কাহিনিটি লিখতে চলেছি, তা অধিক আলোচিত নয়। 

গণেশের জন্য কোনও ভিন্ন পুরাণ নেই। তবে গণেশ পুরাণ নামে একটি উপপুরাণ পাওয়া যায়। উমাত্মজ গণেশের সন্ধান পাই তাই শৈব পুরাণের পাতাতেই। 

স্কন্দপুরাণের মাহেশ্বর খণ্ডে গণেশের জন্মকথা বিবৃত হয়েছে। 

তারকাসুর দেবতাদের স্বর্গচ্যূত করেছেন; দেবতারা মরিয়া হয়ে হর পার্বতীর বিয়ে দেবার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারপর বিস্তর কাঠখড় এবং আস্ত কামদেবকে পুড়িয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন হৈমবতী ও শঙ্কর। মন্দারপর্বতের রত্নময় প্রাসাদে বাস করা কালীন পার্বতী নিজের গাত্রমল থেকে এক গজমুখ মনুষ্যমূর্তি নির্মাণ করলেন। 

এতস্মিন্তরে দেবী প্রোদ্বর্ত্তয়তি গাত্রকম্।। 

উদ্বর্ত্তনমলেনাথ নরং চক্রে গজাননম্। 

দেবানাং সংস্তবৈঃ পুণ্যৈঃ কৃপয়াভিপরিপ্লুতা।। 

পুত্রেত্যুবাচ তং দেবী ততঃ সংহৃষ্টমানসা। 

দেবতাদের পুণ্য স্তুতি শুনে আপ্লুত হয়ে দেবী হৃষ্টচিত্তে তাকেই পুত্র বলে সম্বোধন করলেন ও আদর করতে শুরু করলেন। 

অর্থাৎ মাহেশ্বরখণ্ডের অন্তর্গত কুমারিকা খণ্ডমের এই অংশ অনুসারে গণেশ গজমুণ্ড নিয়েই আবির্ভূত হয়েছিলেন; তার মস্তক কর্তিতই হয়নি কখনও। 

এবারে ফিরি সেই প্রথম কথায়, বিঘ্নের দেবতা নাকি বিঘ্ননাশক? 

এই কুমারিকাখণ্ডমেই গজাননের জন্মের পরে মহাদেব পার্বতীকে বলেন যে তাদের পুত্র মহাদেবের মতই গুণবান হবেন। বিক্রমে, বীর্যে, দয়ায় তিনি শিবতুল্য। 

আর এরপরেই গণেশের সম্পর্কে অতীব গুরুত্বপূর্ণ কথাটি ঘোষণা করেন। 

যেষাং ন পূজ্যাঃ পূজ্যন্তে ক্রোধাসত্যপরাশ্চ যে। 

রৌদ্রসাহসিকা যে তেষাং বিঘ্নং করিষ্যতি। 

শ্রুতিধর্ম্মান্ জ্ঞাতিধর্ম্মান্ পালয়ন্তি গুরূংশ্চ যে।। 

কৃপালবো গতক্রোধাস্তেষাং বিঘ্নং হরিষ্যতি। 

যারা পূজনীয়দের পূজা (সম্মান প্রদর্শন ইত্যাদি) করবে না, যারা ক্রোধী, দুঃসাহসী ও অসত্যপরায়ণ, এই পুত্র (গণেশ) তাদের জীবনে বিঘ্ন উৎপাদন করবেন। 

যারা ধর্ম পালন করেন(এর মানে এই নয় তিলক কেটে নিরামিষ কেহেয় লাফালাফি করবো), গুরুজনের পূজা করেন, দয়ালু, ক্রোধহীন তাদের বিঘ্ননাশ করবেন। 

অর্থাৎ বোঝা গেল বিঘ্ন নামের বিভাগের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তাকেই দেওয়া হয়েছে। কর্ম অনুসারে তিনিই কখনও বিঘ্নদান করেন কখনওবা বিঘ্ননাশ। 

আর শুধু তাই নয়,

সবিঘ্নানি ভবিষ্যন্তি পূজয়াস্য বিনা শুভে 

শঙ্কর, পার্বতীকে বললেন, "হে শুভে, এঁর পূজা ছাড়া সমস্ত ধর্মকর্ম বিবিধ বিঘ্নে আক্রান্ত হবে"। 

এমনকি স্কন্দপুরাণ অনুসারে কার্তিকের অগ্রজ তিনি। তারকাসুরহন্তা কার্তিকের আবির্ভাবের আগে অবধি তিনিই দায়িত্ব নিয়ে দেবতাদের বিঘ্ননাশ ও দৈত্য দানবদের বিঘ্নদান করে গেছেন।

পরবর্তীতেও, এই একই কাজ দায়িত্ব সহকারে পালন করেছেন তিনি। 

এইবার যেহেতু বাঙালি হিন্দু এক শ্রেণীর অসাধু ধর্ম ব্যাবসায়ীদের দ্বারা মারাত্মক রকমের ইনফ্লুয়েন্সড এবং এদের ধারনা গণেশ হলেন সামান্য দেবতা। আর যেহেতু ভাগবত গীতায় বলা আছে দেবতা পূজা ঠিক না তাই এরা গণেশকে অবহেলা করেন বা গণেশকে খুব একটা পাত্তা দেন না। 

আমাদের জানা উচিৎ বেদ ছাড়া আমাদের কোন গতি নেই। বেদেই সকল কিছুর উৎস্য আমাদের ঋষি মুনিরা সবাই বেদ মাতাকে আশ্রয় করেই এই ধর্মীয় জ্ঞানকে ত্বরান্বিত করেছেন যুগে যুগে। তাই বেদের উল্লেখিত দেবতারাই আমাদের মুখ্য পূজ্য। আসুন দেখে নেই  বেদে 'গাণপত্য' মত বা গণেশ ভক্তদের সম্পর্কে কি বলা আছে। 



'গণ' বা জীবের যিনি ঈশ্বর তিনিই গণেশ। ভগবান গণেশ হলেন, গণশক্তির প্রতীক । সিদ্ধিবিনায়ক মঙ্গলমূর্তি ভগবান শ্রীগণেশকে বিঘ্নহর্তা নামে অবিহিত করা হয়। সকল শুভ কর্মের শুরুতে শ্রীগণেশের পূজা করা হয়। দেবতাদের মধ্যে ‘প্রথম পূজ্য’ তিনি।বৈদিককাল থেকেই গণেশের উপাসনা দেখতে পাওয়া যায় । ঋগ্বেদ সংহিতায় গণপতি বা গণেশকে কবিদের মধ্যে কবি, এবং মন্ত্রসমূহের স্বামী বলে অবিহিত করা হয়েছে।


গণানাং ত্বা গণপতিং হবামহে

কবিং কবীনামুপমশ্রবস্তমম্।

জ্যেষ্ঠরাজং ব্রহ্মণাং ব্রহ্মণস্পত

আ নঃ শৃণ্বন্নূতিভিঃ সীদ সাদনম্।।

(ঋগ্বেদ সংহিতা:২.২৩.১)


"হে ব্রহ্মণস্পতি! তুমি গণপতি, কবিদের মধ্যে তুমি কবি, তোমার অন্ন সর্বোৎকৃষ্ট ও উপমানভূত। তুমি প্রশংসনীয়দের মধ্যে রাজা এবং মন্ত্রসমূহের স্বামী। আমরা তোমাকে আহ্বান করি, তুমি আমাদের স্তুতি শ্রবণ করে আশ্রয় প্রদানার্থে যজ্ঞগৃহে উপবেশন কর।"


যাস্কাচার্যের নিরুক্তে ব্ৰহ্মণস্পতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি ব্রহ্মের রক্ষক বা পালয়িতা। ব্রহ্মরূপ ব্ৰহ্মণস্পতি কি করে ব্রহ্মের রক্ষক বা পালয়িতা হতে পারে? এ বিষয়ের সংশয় নিরসনে বলা যায় যে, বৈদিক নিঘণ্টকোষ অনুসারে (২.৭) ‘ব্রহ্মন্’ শব্দের অর্থ অন্ন এবং ঋগাদি মন্ত্র। ব্রহ্মণস্পতি হলেন মন্ত্র এবং অন্ন এ উভয়েরই রক্ষক বা পালয়িতা।বৃষ্টিপ্রদানাদি দ্বারা; বৃষ্টি না হলে অন্ন হয় না এবং অন্নের অভাবে জীবলোক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে সমাজ সভ্যতা বিনষ্ট হয়। তখন আর মন্ত্র যথাযথভাবে রক্ষিত হয় না।


ব্ৰহ্মণস্পতির্ব্রহ্মণঃ পাতা বা পালয়িতা বা ৷৷

(নিরুক্ত:১০.১২.৫)


"ব্রহ্মণস্পতি শব্দের অর্থ ব্রহ্মের রক্ষক বা পালয়িতা।"


শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতায় গণপতিকে গণের অধিপতি, প্রিয় গণের প্রিয়পতি এবং নিধি বা সম্পদের অধিপতি বলা হয়েছে ।


গণানাং ত্বা গণপতিং হবামহে,

প্রিয়াণাং ত্বা প্রিয়পতিং হবামহে।

নিধীনাং ত্বা নিধিপতিং হবামহে, বসো মম।।

(যজুর্বেদ : ২৩.১৯)


"হে জীবের অধিপতি গণপতি, তোমাকে আহ্বান করি। হে প্রিয়গণের মধ্যে প্রিয়পতি, তোমায় আহ্বান করি।তুমি নিধিগণের (সম্পদ) মধ্যে নিধিপতি, তোমায় আহ্বান করি। হে বসুরূপ ভগবান তোমায় আহ্বান করি; তুমিই আমার একমাত্র পালক হও।"


কৃষ্ণ যজুর্বেদীয় তৈত্তিরীয় আরণ্যকে ভগবান গণেশকে 'তৎপুরুষায়' বলে অবিহিত করে একটি বিনায়ক গায়ত্রী রয়েছে।


তৎপুরুষায় বিদ্মহে বক্রতুণ্ডায় ধীমহি।

তন্নো দন্তিঃ প্রচোদয়াৎ।।

(তৈত্তিরীয় আরণ্যক:১০.১.২৫)


"সেই বিনায়ক পুরুষকে জানতে আমরা বক্রতুণ্ড গজাননের ধ্যান করি। সেই ধ্যানে মহাদন্ত গণপতি আমাদের অনুপ্রাণিত করুন বা তাঁর পথে প্রেরণ করুন।"


শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার ষোড়শ অধ্যায়ে সর্বব্যাপী এবং সকলের মাঝে বিরাজমান রুদ্রের স্তোত্র করতে গিয়ে রুদ্রকে গণপতি বলে অবিহিত করা হয়েছে।অর্থাৎ রুদ্ররূপ শিব এবং গণপতিরূপ গণেশ যে একই এ মন্ত্রে বিষয়টি সুস্পষ্ট।


নমো গণেভ্যো গণপতিভ্যশ্চ বো নমো৷

নমো ব্রাতভ্যো ব্রাতপতিভাশ্চ বো নমো।

নমো গৃৎসেভ্যো গৃৎসপতিভ্যশ্চ বো নমো।

নমো বিরূপেভ্যো বিশ্বরূপেভ্যশ্চ বো নমঃ॥


নমঃ সেনাভ্যঃ সেনানিভ্যশ্চ বো নমো।

নমো রথিভ্যো অরথেভ্যশ্চ বো নমো।

নমঃ ক্ষত্তৃভাঃ সংগ্রহীতৃভ্যশ্চ বো নমো।

নমো মহদ্ভ্যো অর্ভকেভ্যশ্চ বো নমঃ৷৷


নমস্তক্ষভ্যো রথকারেভ্যশ্চ বো নমো।

নমঃ কুলালেভ্যঃ কর্মরেভ্যশ্চ বো নমো।

নমো নিষাদেভ্যঃ পুঞ্জিষ্ঠেভ্যশ্চ বো নমো।

নমঃ শ্বনিভ্যো মৃগয়ুভ্যশ্চ বো নমঃ৷৷

(শুক্লযজুর্বেদ সংহিতা:১৬.২৫-২৭)


"গণসমূহকে নমস্কার এবং তোমাদের অর্থাৎ গণপতিগণকেও নমস্কার। নানা জাতিসমূহের সঙ্ঘকে নমস্কার। এই সঙ্ঘের পালকগণকে নমস্কার। লম্পটগণকে নমস্কার। জটী-মুণ্ডী ইত্যাদি বিরূপগণকে নমস্কার। (নগ্নমুণ্ডজটিলাদয়স্তেভ্যো বো নমঃ)। এবং তুরঙ্গবদন তথা হয়গ্রীব প্রভৃতি বিশ্বরূপ গণসমূহকে নমস্কার ৷


সেনাগণ রূপী রুদ্রদের নমস্কার; সেনাপতিগণকে নমস্কার; রথারোহীগণকে নমস্কার এবং রথহীনগণকে নমস্কার। রথের অধিষ্ঠাতাবৃন্দ রূপী রুদ্রদের নমস্কার; রথের অশ্বকে চালিতকারী সারথিগণকে নমস্কার; মহান্ বীরগণরূপী রুদ্রগণকে নমস্কার; বীর শিশুসমূহরূপী রুদ্রগণকে নমস্কার৷


তক্ষ (সূত্রধার) জনরূপী রুদ্রগণকে নমস্কার; রথনির্মাতারূপী রুদ্রগণকে নমস্কার; কুম্ভকারগণকে নমস্কার, কর্মকারগণকে নমস্কার, গিরিচর মাংসাসী নিষাদগণকে নমস্কার; শিকারী কুক্কুরসমূহকে নমস্কার; শিকারী কুক্কুরগণের শিকারী প্রভুবৃন্দরূপী রুদ্রগণকে নমস্কার৷"


শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার ষোড়শ অধ্যায়ের মত কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতাতেও গণ ও গণপতি স্বরূপ রুদ্রকে নমস্কার করা হয়েছে। মন্ত্রগুলো বা মন্ত্রগুলোর কয়েকটি পাদ প্রায় একই বলা চলে। অর্থাৎ রুদ্ররূপ শিব এবং গণপতিরূপ গণেশ যে একই তা শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার মত কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতার মন্ত্রেও বিষয়টি সুস্পষ্ট। সেই মন্ত্রে মহৎ ও ক্ষুদ্র রূপসহ বিকৃতরূপ ও বিশ্বরূপধারী রুদ্রদেব এবং তাঁর গণদের উদ্দেশে বারবার নমস্কার করা হয়েছে।


নমো গণেভ্যো গণপতিভ্যশ্চ বো নমো

নমো বিরূপেভ্যো বিশ্বরূপেভ্যশ্চ বো নমো।

নমো মহদ্ভ্যঃ ক্ষুল্লকেভ্যশ্চ বো নমো নমো রথিভ্যোঽরথেভ্যশ্চ বো নমো নমো রথেভ্যঃ

রথপতিভ্যশ্চ বো নমো।

নমো রথেভ্যঃ রথপতিভ্যশ্চ বো নমো নমঃ

সেনাভ্যূঃ সেনানিভ্যশ্চ বো নমো। নমঃ ক্ষত্তৃভ্যঃ সংগ্রহীতৃভ্যশ্চ বো নমো নমস্তক্ষভ্যো রথকারেভ্যশ্চ

বো নমো। নমঃ কুলালেভ্যঃ কর্মারেভ্যশ্চ বো নমো

নমঃ পুঞ্জিষ্টেভ্যো নিষাদেভ্যশ্চ বো নমো।

নম ইষুকৃদ্ভ্যো ধন্বকৃদ্ভ্যশ্চ বো নমো।

নমো মৃগয়ুভ্যঃ স্বনিভ্যশ্চ বো নমো নমঃ

শ্বভ্যঃ শ্বপতিভ্যশ্চ বো নমঃ।।

(কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা:৪.৫.৪)


শুক্লযজুর্বেদ সংহিতায় ভগবান গণেশের উদ্দেশ্যে যজ্ঞে আহুতি প্রদানের মন্ত্র প্রদান করা হয়েছে। সেই মন্ত্র হল, "গণপতয়ে স্বাহা"। যে মন্ত্র আজও ভগবান গণেশের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত যজ্ঞে ব্যবহৃত হয়।


অসবে স্বাহা বসবে স্বাহা বিভুবে

স্বাহা বিবস্বতে স্বাহা গণশ্রিয়ে স্বাহা

গণপতয়ে স্বাহাঽভিভুবে স্বাহাঽধিপতয়ে

স্বাহা শূষায় স্বাহা সংসর্পায় স্বাহা চন্দ্রায়

স্বাহা জ্যোতিষে স্বাহা মলিম্বুচায় স্বাহা

দিবা পতয়তে স্বাহা৷।

(শুক্লযজুর্বেদ সংহিতা:২২.৩০)


"অসু-বসু-বিভু-বিবস্বান-গণশ্রী-গণপতি-অভিভূ-বল-

সংসর্প জ্যোতিষ-ম্লীমুচ-দিবাপতি ইত্যাদির অধিপতি দেবগণের উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি।"


ভগবান গণপতিকে যারা ব্রহ্মরূপে উপাসনা করে, তাদের গাণপত্য বলে। এ গাণপত্য মতটি সনাতন পঞ্চমতের অন্যতম। এ গাণপত্য মতপথের সম্প্রদায়টি বৈদিককাল থেকেই বহমান। বেদের মধ্যেই আমরা গণেশ গায়ত্রী মন্ত্র পাই। সেই মন্ত্রে "বক্রতুণ্ডায় ধীমহি" এবং 'তন্নো দন্তিঃ প্রচোদয়াৎ" বাক্য পাই। যে বাক্য সুস্পষ্টভাবে ভগবান গণেশকে নির্দেশ করে। ভগবান গণেশকে বেদে কখনো ব্রহ্মণস্পতি (ঋগ্বেদ সংহিতা:২.২৩.১) ; কখনো রুদ্র বলা হয়েছে (কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা:৪.৫.৪)।আবার ইন্দ্রও বলা হয়েছে:


নি ষু সীদ গণপতে গণেষু

ত্বামাহুর্বিপ্রতমং কবীনাম্।

ন ঋতে ত্বৎ ক্রিয়তে কিং

চনারে মহামর্কং মঘবঞ্চিত্ৰমর্চ।।

(ঋগ্বেদ সংহিতা:১০.১১২.৯)


"হে বহুলোকের অধিপতি গণপতি ! স্তবকর্তাদের মধ্যে উপবেশন কর, ক্রিয়াকুশল ব্যক্তিদের মধ্যে তুমিই শ্রেষ্ঠ। কি নিকটে, কি দূরে, তোমা ব্যতিরেকে কিছুই অনুষ্ঠান হয় না। হে ধনশালী ! আমাদের ঋকসমূহকে বিস্তারিত ও বিচিত্র রূপ করে দাও।"


একই পরমেশ্বর গণপতিকে ব্রহ্মণস্পতি, রুদ্র, ইন্দ্র ইত্যাদি বিবিধ নামে অবিহিত করার কারণ বেদেই সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। বেদে বলা হয়েছে যে, সেই পপরমেশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। সেই এক এবং অদ্বিতীয় পরমেশ্বরকেই বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হলেও, তিনি বহু নন।


ইন্দ্রং মিত্রং বরুণমগ্নি-মাহু রথো

দিব্যঃ স সুপর্ণো গরুত্মান্।

একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি

অগ্নি যমং মাতরিশ্বানমাহুঃ।।

(ঋগ্বেদ: ১.১৬৪.৪৬)


"সেই সদ্বস্তু অর্থাৎ পরব্রহ্ম এক ও অদ্বিতীয়। কিন্তু জ্ঞানীগণ তাঁকেই ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, অগ্নি, দিব্য (সূর্য্য), সুপর্ণ, গরুড়, যম, বায়ু ইত্যাদি বিভিন্ন নামে অভিহিত করে থাকেন।"


শৈব এবং শাক্ত মতের মিলিত রূপ গাণপত্য। এ গাণপত্য মত বেদ থেকে উদ্ভূত হয়ে বৈদিক যুগ থেকেই প্রচলিত। এ গাণপত্য মত সনাতন পঞ্চমতের অন্যতম। কেউ যদি বলেন গণেশ বা গণপতি শুধুমাত্র দেবতা বা কারো দাস তাঁদের শক্তভাবে বর্জন করুন। 














Saturday, August 6, 2022

ঋকবেদে পরমেশ্বর শিব

 ঋগবেদে প্রভু পরমেশ্বর শিব

পরমেশ্বর ভগবান শিব বৈদিকযুগ থেকেই উপাসিত। আমরা জানি বেদের মুল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছেন প্রভু পরমেশ্বর আদি দেব সদা শিব। সকল কিছু উনার থেকেই উৎপন্ন আবার সকল কিছু উনাতেই নিঃশেষ হবে। বেদে রুদ্র রূপী শিব বা শিব রূপী রুদ্র নতুন কিছু না। সকল শৈবরা জানেন বেদের সেই রেফারেন্স গুলো। প্রশ্ন হচ্ছে UNESCO কতৃক সবথেকে প্রাচীন যে গ্রন্থ সেটার মধ্যে কি শিব আছেন? আসুন দেখে নেই। এখানে উল্লেখ্য ঋগবেদ বলতে আমি শুধু বেদের সংহিতা ভাগকে বুঝাই নাই। ঋগবেদের ৩ টি শাখা বর্তমান তা হল শাকল, ভাস্কল এবং আশ্বালায়ন শাখা। এর থেকে যদি কেউ কিছু বলে তাহলে তা অবশ্যই বেদের থেকে বলছেন বুঝতে হবে।  তাই অযথা কমেন্টে তর্ক না করার অনুরোধ রইলো। 

ঋগ্বেদ সংহিতার দশম মণ্ডলে কৈলাশ পর্বতের স্বর্ণশিখরে বসবাসকারী শিবের উল্লেখ পাই। সেই শিব যেমন অচিন্ত্য নিরাকার তেমনি, সাকার রূপধারী। সে জ্যোতির্ময় রূপের তিনটি নয়ন এবং তিনি নীলকন্ঠ। কৈলাশ পর্বতে শিবের সে নিবাস অত্যন্ত রমনীয়। সে নিবাস জীবের শুভ এবং কল্যাণকর। পরমেশ্বর শিবের সে নিবাসে দেবতারা সদা আনন্দে বিরাজ করেন। 

কৈলাশশিখরাভাসং হিমবদ্ গিরিসংস্থিতম্।

নীলকন্ঠং ত্র‍্যক্ষং চ তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু।।

কৈলাশশিখরে রম্যে শঙ্করস্য শুভে গৃহে।

দেবতাস্তত্র মোদন্তি তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু।।

(ঋগ্বেদ সংহিতা : আশ্বলায়ন শাখা, ১০.১৭১.২৪-২৫)

"কৈলাশ পর্বতের স্বর্ণশিখরের ন্যায় জ্যোতির্ময়,  হিমগিরিতে সংস্থিত, নীলকন্ঠ ত্রিনেত্র রূপ শিবে আমার মন সংযুক্ত হোক।

রমনীয় কৈলাশ পর্বতের শুভ গৃহে বা শিবের নিবাসে দেবতারা সদা আনন্দে বিরাজ করেন, সেই আমার মন শিবসঙ্কল্পময় বা শিবের সাথে সংযুক্ত হোক।"

শুধু ঋগ্বেদই নয় অথর্ববেদসহ শুক্ল-কৃষ্ণ উভয় যজুর্বেদেই পরমেশ্বর শিবের স্তোত্র রয়েছে।   শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার ষোলতম অধ্যায়টি পুরোটাই রুদ্ররূপী,শিবরূপী পরমব্রহ্মের স্তোত্র দিয়েই পূর্ণ।সমাজের প্রত্যেকটি শ্রেণী এবং পেশার মানবের মাঝেই রুদ্ররূপ ব্রহ্মের প্রকাশ। ষোলতম অধ্যায়ে  গুরুজন, বালক, তরুণ, গর্ভস্থ শিশু,পিতা, মাতা ও সকল আপনজনদের ভগবান রুদ্রের কাছে রক্ষা করার প্রার্থনা করা হয়েছে অনন্য অসাধারণ  কাব্যময়তায়। ব্রহ্মরূপী রুদ্রই বৃক্ষ-লতা-গুল্মরূপে, জীবের পালকরূপে, সন্ন্যাসী, সাধু-সন্ত থেকে চোর, বাটপাড়, ছিনতাইকারী সকলরূপে এক তিনিই বিরাজিত। কারণ তিনি ছাড়া যে জগতে আর দ্বিতীয় কেউ নেই।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়:

"দেবাধিদেব মহাদেব!

অসীম সম্পদ, অসীম মহিমা ॥

মহাসভা তব অনন্ত আকাশে।

কোটি কণ্ঠ গাহে জয় জয় জয় হে ॥"

আমরা আজ কথায় কথায় নিজদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতায় অবলীলায় বলে ফেলি যে, বেদে কোন দেবতা প্রসঙ্গে বলা নেই। কিন্তু কথাটি সত্য তো নয়ই ; বরং সর্বাংশে মিথ্যা। বেদের আরণ্যক অংশের প্রায় পুরোটা উপাসনাবিধি নিয়েই রচিত। আর আরণ্যক যে বেদ তা সম্প্রতি বহু ব্যাকরণ এবং বেদজ্ঞ পন্ডিত গন স্বীকার করেছেন।





 বর্তমানে আমরা ভগবান শিবের অভিষেক এবং সকল রোগনাশের জন্যে 

"ত্র‍্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম" মন্ত্র এবং শিবের ষড়াক্ষর মন্ত্র " ওঁ নমঃ শিবায় " জপ করি। আপনারা জানলে অবাক হবেন,  সকল মন্ত্রই বেদ থেকেই নেয়া। মৃত্যু প্রত্যেকের জীবনেই নিশ্চিত।গাছের একটি পাকা ফল আম বা পেপে পেকে টশটশে হয়ে  নিজেই গাছ থেকে ঝরে পরে। ঠিক সেভাবেই পূর্ণায়ু পেয়ে আমরা যেন আমাদের দেহরূপ প্রদীপকে যাঁর থেকে এসেছি, তাঁর কাছেই সমর্পণ করতে পারি ভগবানের কাছে এমনই আমাদের প্রার্থনা করা উচিত। আমরা কেউ অনন্তকাল বেঁচে থাকতে থাকতে পারব না।মহাকাল রুদ্রের প্রতি সমর্পিত বেদের মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রে ঠিক এ সমর্পণ ভাবটিই সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবিদর্দ্ধনম্।

উর্বারুকমিব বন্ধনান্ মৃত্যোর্মুক্ষীয় মামৃতাৎ।।

(ঋগ্বেদ সংহিতা:০৭.৫৯.১২)

"অতীত,বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বা জন্ম,জীবন ও মৃত্যু -এ ত্রয়ীদ্রষ্টা রুদ্ররূপ হে পরমেশ্বর, তোমার বন্দনা করি।তুমি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য সুন্দর পরিবেশ ও পুষ্টিকর খাদ্যের দাতা।পাকা উর্বারুক ফলের ন্যায় আমরা যেন পূর্ণায়ু পেয়েই মৃত্যুর বন্ধন হতে মুক্ত হতে পারি। তোমার অমৃতরূপ হতে যেন বঞ্চিত না হই।"

নমঃ শম্ভবায় চ ময়োভবায় চ।

নমঃ শঙ্করায় চ ময়স্করায় চ।

নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ।।

(শুক্লযজুর্বেদ সংহিতা : ১৬.৪১)

"মুক্তি এবং সংসারসুখদাতা ভগবান শিবকে নমস্কার, লৌকিক ও মোক্ষসুখের কারক শিবকে নমস্কার ; যিনি কল্যাণরূপ হয়ে ভক্তজনের কল্যাণ-বিধান করেন সেই ভগবান রুদ্রকে নমস্কার। "

বেদের তৈত্তিরীয় আরণ্যকের দশম প্রপাঠকের বাইশ অনুবাকে একা শুধু ভগবান শিব নয়; অম্বিকাপতি, উমাপতিকেও বন্দনা করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ ভগবান শিবের সাথে সাথে জগন্মাতা অম্বিকাকেও বন্দনা করা হয়েছে। 

নমো হিরণ্যবাহবে হিরণ্যবর্ণায় হিরণ্যরূপায়

হিরণ্যপতয়ে অম্বিকাপতয় উমাপতয়ে

পশুপতয়ে নমো নমঃ।।

"অম্বিকাপতি,উমাপতি, পশুপতি, হিরণ্যাদি সর্বনিধির পালক,তেজোময়, হিরণ্যবাহু, হিরণ্যবর্ণ, হিরণ্যরূপ পরমেশ্বর শিবের উদ্দেশে নমস্কার। "

শুধুমাত্র বেদেই নয়, মহাভারতের অসংখ্য স্থানে শিবমহিমা এবং স্তোত্র আছে। এর মধ্যে অনুশাসন পর্বের সপ্তদশ অধ্যায়ে বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক বলা ভগবান শ্রীশিবের সহস্র নামস্তোত্র অন্যতম , এ পবিত্র স্তোত্র সনাতন ধর্মাবলম্বী আমাদের নিত্যপাঠ্য।সেই স্তোত্রের শুরুতেই ভগবান শিবের মহিমা সম্পর্কে ঋষি তণ্ডী শ্রীকৃষ্ণকে যা বলছেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

"যিনি তেজেরও তেজ, তপস্যারও তপস্যা, শান্তদিগের মধ্যে অতিশান্ত, সকল প্রভারও প্রভা, জিতেন্দ্রিয়দের মধ্যে যিনি জিতেন্দ্রিয়, জ্ঞানীদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, দেবতাদেরও যিনি দেবতা,ঋষিদের ঋষি, যজ্ঞসমূহের যজ্ঞ, মঙ্গলকারীদের মঙ্গলকারী, রুদ্রগণের রুদ্র, প্রভাবশালীদের প্রভাব, যোগীদের যোগী, সকল কারণের কারণ এবং যাঁর থেকে সমস্তলোক উৎপন্ন হয় আবার যাঁর মধ্যে লয় পায়, সেই সর্বভূতাত্মা, সংহর্তা, অমিততেজা ভগবান মহাদেবের অষ্টোত্তর সহস্রনাম আমার নিকট শুনুন ; হে মনুষ্যশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ, এ মহাপবিত্র স্তোত্র শ্রবনেই আপনি সকল অভীষ্ট লাভ করবেন।

(শিবসহস্রনামস্তোত্রম : ২৬-৩০)

প্রায় দুইহাজার বছর পূর্বে মহাকবি কালিদাস তাঁর জগতনন্দিত মহাকাব্য রঘুবংশের শুরুতে প্রথম শ্লোকেই জগতের আদি মাতা-পিতা পার্বতী এবং পরমেশ্বর শিবের বন্দনা করেছেন অসাধারণ আলঙ্কারিক ব্যঞ্জনায়। তিনি বলেছেন-যেমন শব্দ এবং শব্দ থেকে উৎপন্ন তার অর্থকে আলাদা করা যায় না; ঠিক একইভাবে শিব এবং শক্তিকেও আলাদা করা যায় না। 

বাগর্থাবিব সম্পৃক্তৌ বাগর্থপ্রতিপত্তয়ে।

জগতঃ পিতরৌ বন্দে পার্বতীপরমেশ্বরৌ।।

"শব্দ এবং শব্দের অর্থ যেমন করে সম্পৃক্ত ; ঠিক একইভাবে সম্পৃক্ত জগতের আদি পিতা-মাতা শিব এবং পার্বতী। বাগর্থ সহ সকল প্রকার বিদ্যা কলার প্রতিপত্তির জন্যে সেই পার্বতী- পরমেশ্বরকেই সদা বন্দনা করি।"

উপাস্য হিসেবে আলাদা আলাদাভাবে উপাসনা করলেও আমরা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মূলত এক ব্রহ্মেরই অনন্ত রূপ-রূপান্তরের উপাসনা করি। তাই বর্তমানের কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কথায় সংশয়াছন্ন না হয়ে আমরা আমাদের পূর্ববর্তী ঋষি-মুনিদের পথেই সাকার-নিরাকারের সমন্বয়েই অধিকারী ভেদে এক পরমেশ্বরের উপাসনা করতে চাই। অনেকে বলেন, সৃষ্টিকর্তা সাকার হতে পারেন না । আমি তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, সৃষ্টিকর্তা যদি সর্বশক্তিমান হন তবে তিনি সব পারেন, আর যদি না পারেন সেটা তার ব্যর্থতা; তখন তিনি আর সর্বশক্তিমান নন। তাইতো ঋগ্বেদ সংহিতায় বলা হয়েছে:

একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি 

অগ্নিং যমং মাতরিশ্বানমাহুঃ।। 

(ঋগ্বেদ : ০১.১৬৪.৪৬)

"সেই এক পরমেশ্বরকেই আমরা অগ্নি, যম, মাতরিশ্বান সহ বিভিন্ন নামে অভিহিত করি।"

বিভিন্ন নামে এবং রূপে অভিহিত করলেও তিনি বহু নন, তিনি আদতে একজনই। সেই অনন্তরূপে পরিব্যাপ্ত এক ঈশ্বরের করুণায় এ জগত পূর্ণ। 

বেদে কি আমাদের সবাইকে বৈষ্ণব হতে বলেছে? নব্য কৃষ্ণ ভক্তদের দাবী !!!

আমরা সকলেই জানি ইস্কনি ভন্ড কৃষ্ণভক্তদের ভন্ডামি খুব সূক্ষ্য। এরা শাস্ত্র না জানা সহজ সরল হিন্দুদের মাথা ধোলাই দিয়ে নিজেদের ব্যাবসা ভারী করে আর নারী সঙ্গ লাভে অনেকে তা করেও থাকেন। Propoganda ছড়াতে এদের জুরি মেলা ভার। এরই ফলশ্রুতিতে, নব্য কৃষ্ণ ভক্ত ইস্কনীদের নতুন আমদানী।

এরা শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার কোন এক মন্ত্র দেখিয়ে আমাদের বলে থাকেন যে আমাদের সকলকে বৈষ্ণব হতে বেদ নির্দেশ দিচ্ছেন।  চলুন দেখে নেই এই মন্ত্রটি আসলে কি  শুক্লযজুর্বেদ  (৫/২১, ৫/২৫)(স্ক্রীনশট) 


এই মন্ত্র দেখে বা প্রমাণ দেখে অনেকেই মগজ ধোলাই খেয়ে নিবেন। এই মন্ত্র শুক্লযজুর্বেদ সংহিতা শ্রী বিজন বিহারী গোস্বামী কতৃক সম্পাদিত। 

উনার বইয়ের থেকে স্ক্রীনশট



মজার ব্যাপার হল এইসব ভন্ড বৈষ্ণবের দল 

  • মন্ত্রের বিনিয়োগ কি?, 
  • কোন যাগের অন্তর্ভূক্ত?, 
  • যাগের নাম কি? 
  • কোন যাগে এই মন্ত্র বলতে হয় ? 
  • কেন বলতে হয়?
  • স্তব মন্ত্র নাকি আহুতি মন্ত্র? 
  • ঋক মন্ত্র? 
  • মন্ত্রের আহুতি কে? 
  • হোত্র কে?  
এইসব কিছুই বা  মন্ত্রের কোন পরিচয়ই এরা দেয় নাই।  যাইহোক এরা অবৈদিক এবং বেদ এরা মানেন না এটা জিজ্ঞাসু চক্ষুর জন্য নতুন কিছু না। প্রশ্ন এখানে আরেকটা!!!


আসুন অক্ষয় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত শুক্লযজুর্বেদ সংহিতা পূর্বভাগ থেকে একই মন্ত্র প্রত্যক্ষ্য করি।


সুধী, এখানে মন্ত্রটির অর্থ খেয়াল করুন। ভন্ডদের দেয়া উক্ত মন্ত্রের যুক্তিতে আমি পরে আসছি। আপাতত এই ২ টি স্ক্রীনশট খেয়াল করুন। এখানে অক্ষয় প্রকাশনী থেকে যে সংহিতা তাতে ভিন্ন কথা লেখা। এখানে তো " বৈষ্ণব হও "  এমন বাক্য কি পাওয়া যাচ্ছে? উত্তর হল না। পাওয়া যাচ্ছে না। সংস্কৃত ভাষার বিভিন্ন মারপ্যাচ এখানে মারতে আসিনি। বেদের কিছু মন্ত্র একদম অপরিবর্তনীয়। এই সব মন্ত্রের কোন ভিন্ন অর্থ সাধারণত করা যায় না। কিন্তু এমন কিছু মন্ত্র আছে যা ভাষ্যকার বিভিন্ন অর্থ করে থাকেন। এখন আন্তর্জাতিক মানের একটি সংঘটন শুধু এক ভাষ্য নিয়ে এমন কথা বলবেন কেন? এটা কেমন ধরণের ভন্ডামি? ভক্ত সংখ্যা বাড়ানো আর নিজেদের দূর্বল বেসকে শক্ত করার জন্য কেনই বা এদের এরকম ভন্ডামির আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে? 

এবার আসি যদি বেদে এই কথা থেকেও থাকে তাহলে প্রশ্ন হল এখানে কিসের ভিত্তিতে আপনাকে বৈষ্ণব হতে বলছে? 

যজ্ঞক্ষেত্র নির্বাচন  এবং এর অধিষ্ঠাতা -অধিষ্ঠাত্রী দেবতা -দেবীদের ক্ষেত্রে  প্রথমে তাঁর প্রার্থনা করা হয় এরপর তাঁর উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করা হয়। সংহিতা ভাগ সব সময় যজ্ঞের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। যজ্ঞতে যজ্ঞকর্তাকে অনেক কিছুর ভূমিকা পালন করতে হয় । এইবার এই ভাগে যেহেতু বিষ্ণুর বিক্রম বর্ণন করা হয়েছে তাই এই যজ্ঞে অবশ্যই যজ্ঞ যজমান বৈষ্ণব ( বিষ্ণু প্রীতি লাভের উদ্দেশ্যে উনার ভক্তি সাধন) হতে হবে। এখন এই মন্ত্রের মাধ্যমে কি বলা যায় যে সকল মানুষকে বৈষ্ণব হতে বলেছে? তাছাড়া যজ্ঞ শুধুমাত্র কয়েক মূহুর্ত বা কয়েক দিনের জন্য হয়ে থাকে। সেই সময় কেউ বৈষ্ণব বা বিষ্ণু ভক্ত থাকবেন এইটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে  Propoganda চালানো সরাসরি বেদে বলা বৈষ্ণব হতে বলা হচ্ছে এরকম মিথ্যাবাদী একমাত্র এরাই হতে পারে।  এতসময় যে আলোচনা করলাম তা মন্ত্রের এই ভাষ্যানুমোদিত সম্বোধ্য বা অর্থে কি ভাব প্রকাশ পায়, সুধীগণেরই তা বিচার্য। মন্ত্রগুলির মধ্যে কোনও সম্বোধ্য পদ নেই। সে ক্ষেত্রে শকট, হবিধান, ররাট্যন্ত, লজানি প্রভৃতি পদ অধ্যাহার করবার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধ মনে হয় না এই মিথ্যেবাদীর দল করেছেন।

আমার সর্বশেষ নিবেদন পাঠকের উদ্দেশ্যে, আমরা জানি বেদের সংহিতা ভাগে যজ্ঞ তথা কর্মকান্ড নিয়ে কথা বলে। আর আমাদের প্রিয় বৈষ্ণব সমাজ সবসময় আর্য সমাজের বিপক্ষে কথা বলার সময় মুক্তি নিয়ে কথা বলে আর্য সমাজকে কোনঠাসা করেন। সব সময়  পরা আর অপরা বিদ্যা নিয়ে কথা বলেন।  বিস্তারিত এই লিঙ্ক কিন্তু আজকে উনারাই কর্মকান্ড নিয়ে পোষ্ট দিচ্ছেন !! এইটা কি স্বেচ্চাচারী না? 

আরও বলা যায় এরা ভগবান বিষ্ণুদেবকে মানেন না। এদের মতে এক কৃষ্ণের থেকে লক্ষ লক্ষ বিষ্ণুর সৃষ্টি। এখন যখন বেদে কৃষ্ণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় তখন এরা নারায়ন বা বিষ্ণুকে দেখান। যখন কৃষ্ণের supremacy নিয়ে কথা  বলা হয় তখন এরা বেদের নারায়নকে দেখান। মানে যখন আসল ধরে টান দেয়া হয় তখন নারায়ন কৃষ্ণ এক। যখন এদের দলে ভিড়ে যাবেন তখন নারায়ন কিছুই না। কৃষ্ণই সমস্ত কিছু। 

আসলে এরা হল ভন্ড ধর্ম ব্যাবসায়ী। যা যা এদের সুবিধা তাই এরা মানে। যা এদের বিপক্ষে এরা তা মানেন না । যাকে ইংরেজী ভাষায় বলা হয় Hypocrisy...  



Sunday, July 10, 2022

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত ( ইসকন) এর অশাস্ত্রীয় কাল্পনিক গুরু পরম্পরা

 

খুব ছোট লেখা এবং খুব সংক্ষেপে যাতে পাঠক এক নজরে বুঝতে পারে। এই কথাগুলো যেকোন ইসকনের আখড়ায় ( মন্দির না) গিয়ে জিজ্ঞাসা করে দেখুন। এই অশাস্ত্রীয় পাপীগুলো চুপ করে থাকবে নাহয় উলটাপালটা যুক্তি প্রদর্শন করবে। 
কেশব দত্ত ঠক্কুর মহাশয় ছিলেন গৌড়ীয় বৈষ্ণব ( পড়ুন কৃৈষ্ণব )পন্থার এক অন্যতম গুরু বা Pioneer বলা যায়। তো উনার ছেলে শ্রী বিনোদ দত্ত তাঁর বাবার পরম্পরায় দীক্ষিত না হয়ে উনি এদেরই আরেক পরম্পরার গুরু গৌড় কিশোরদাস  বাবাজির নিকট দীক্ষা নেন। এইদিকে গৌড় কিশোর দাস বাবাজি হলেন জগন্নাথ দাস বাবাজির দীক্ষিত। বলা হয় জগন্নাথ দাস বাবাজি ,গৌড়িয় কৃৈষ্ণবদের অন্যতম পন্ডিত শ্রী বলদেব বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের পরম্পরার একজন ছিলেন। মজার ব্যাপার হল যাদের আপনারা সন্ন্যাসী বলে জানেন এরা আসলে গৃহস্থ ছিলেন। এই যে মহা পন্ডিত শ্রী বলদেব বিদ্যাভূষণ, উনি কিন্তু গৃহস্থ ছিলেন। মানে উনার স্ত্রী সন্তান ছিল। এই সমস্থ সন্ন্যাসকে আতুড় সন্ন্যাস বলা হয়। আর এই কথা আমার না উপনিষদ বাক্য। 

যাইহোক, বিনোদ দত্ত বাবু কি করলেন? গৌড় কিশোর দাস বাবাজি গত হবার পর নিজে ব্রাহ্মন ডেকে উনার ছবি সামনে রেখে বিরজা করান এবং এরপর সন্ন্যাস নেন। কি হাস্যকর চিন্তা করেন। সাধারণত গুরু সবার সামনে এবং সর্ব সম্মুখকে স্বাক্ষী মেনে তাঁর শিষ্যকে দীক্ষা দেন এবং সেটাই হাজার হাজার বছর থেকে হয়ে আসছে আর এটাই শাস্ত্রীয় নিয়ম। কিন্তু এই বিনোদ বাবু কি করলেন? গায়ের জোরে বলা যায় নিজেই নিজের সন্ন্যাস দীক্ষা সম্পন্ন করলেন। এইখানে মূর্খের দল ট্যালিপ্যাথি, স্বপ্ন সহ অনেক হাস্যকর যুক্তি টানবে। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন একে জোড়াতালি বলে। যখন এরা ধরা খায় তখন এরা এইসব বলেই পার পায়। বাস্তবে এই ধরণের অধিকার শাস্ত্র আমাদের কাউকে দেয় না। তাছাড়া বিরজা সন্ন্যাসে অব্রাহ্মণের অধিকার নাই।  তো এইসব কুকীর্তি শুনে আমাদের কেশব দত্ত ঠক্কুর মহাশয় অনেক রাগান্বিত হয়ে যান। উনি তাঁর সন্তানকে প্রশ্ন করেন 

"তুমি তো ব্রাহ্মণ নউ! আমি তা নই। তো তুমি কোন যুক্তিতে এই ব্রাহ্মণের ন্যায় সন্ন্যাস নিলে?"

এর উত্তরে উনি কিছুই বলতে পারেন নাই। ফলে কেশব বাবু উনার সন্তানকে ত্যাজ্য পুত্র করেন । এখন কথা হল সরস্বতী পরম্পরা যেহেতু ইসকনী কৃৈষ্ণবদের নাই তাই এরা এই উপাধি লিখতে পারে না। ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী বলে যার চুরণ সাধারণ ভক্তদের খাওয়ানো হয় তা আসলে ভুল। ইনাদের পরম্পরা হলেন সোজা কথায় গৌড় কিশোর দাস বাবাজি । সন্ন্যাস পরম্পরা নিয়ে এরা যে ফাইযলামী আর গায়ের জোরে অতিরিক্ত পরম্পরা যুক্ত করেছেন সেখানে গুরুর কোন অস্তিত্বই নাই।  এরজন্যই এই ইসকনের যে পরম্পরা তা একটি ভ্রান্ত পরম্পরা। গৌড়ীয় পরম্পরার সাথে এই ইসকনের পরম্পরার কোন সম্পর্ক নেই। অতিরক্ত যে পরম্পরা সেখানে যোগ হয়েছে এর কারণে এদের যে পরম্পরা সেটা একটা দূষিত পরম্পরা। আর কলিতে এটাই যে স্বাভাবিক তা শাস্ত্রবাক্য সিদ্ধ। 



এবার আসি দ্বিতীয় যুক্তিতে। যারা আরও ডিটেলে পড়তে চান এঁদের জন্য।


ইসকনীদের দাবী এরা হলেন চৈতন্য ভারতীর ( এরা মহাপ্রভু বলেন) অনুসারী। উনার দেখানো পথেই এরা চলেন। এখন আসুন দেখে নেই এই চৈতন্য ভারতী কে ছিলেন? এবং উনার পরম্পরা কি? 

প্রথমে দেখে নেই আদি শংকর প্রবর্তিত গুরু পরম্পরা।  (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় দ্বিতীয় ভাগ, পৃষ্ঠা-১৪) এর মতে, 


আনন্দগিরি-কৃত শঙ্করদিগ্বিজয় গ্রন্থে বলা হয়েছে–


শৃঙ্গপুরসমীপে তুঙ্গভদ্রানদীতীরে চক্রং নির্ম্মায় তদগ্রে সরস্বতীং নিঘায় এবমাকল্পং স্থিরাভব মদাশ্রমে ইত্যাজ্ঞাপ্য নিজমঠং কৃত্বা তত্র দেব্যাঃ পীঠনির্ম্মাণং কৃত্বা ভারতীসম্প্রদায়ং নিজশিষ্যাঞ্চকার। –(শঙ্করদিগ্বিজয়)

অর্থাৎ : তুঙ্গভদ্রা-নদীতীরে শৃঙ্গপুরের নিকটে চক্র নির্মাণ করিয়া তাহার সম্মুখে সরস্বতীদেবীকে প্রতিষ্ঠিত করিলেন, এবং বলিলেন, “কল্পান্ত পর্যন্ত আমার আশ্রমে অবস্থিতি কর।” পরে নিজ মঠ নির্মাণ ও তাহাতে দেবীর পীঠ প্রস্তুত করিয়া ভারতী নামক শিষ্য-সম্প্রদায় প্রবর্তিত করিলেন।

লিখিত আছে, শঙ্করাচার্যের শিষ্যেরা তাঁর আদেশানুসারে নানা দেশে ভ্রমণ ও সেখানকার পণ্ডিতদের সাথে বিতর্ক-বিচারে অবতীর্ণ হয়ে শিব, বিষ্ণু প্রভৃতি সাকার দেবতার উপাসনা প্রচার করেন। যেমন–

এবমশেষদিগ্বিজয়ং কৃত্বা তত্তদ্দেশস্থান্ কাংশ্চিত্ পঞ্চাক্ষরিহামন্ত্ররাজ্যে পদেশাদিনা তন্মতাবলম্বিনঃ করোতি পরমতকালানলঃ শঙ্করচার্য্যশিষ্যঃ। –(আনন্দগিরি-কৃত শঙ্করদিগ্বিজয়)

অর্থাৎ : শঙ্করাচার্যের শিষ্য পরমতকালানল অশেষরূপে দিগ্বিজয় করিয়া সেই সেই দেশের অনেক লোককে পঞ্চাক্ষর মন্ত্রের উপদেশ দ্বারা শৈবমতাবলম্বী করিতে থাকেন।


এভাবে দিবাকর আচার্য দ্বারা সৌর-মত, ত্রিপুর-কুমার দ্বারা শাক্ত-মত, গিরিজাপুত্র দ্বারা গাণপত্য-মত ও বটুকনাথ দ্বারা ভৈরব-উপাসনা প্রচারিত হয় বলে লিখিত আছে। তাঁরা সবাই পরম গুরু শঙ্করাচার্যের শিষ্য। তাঁর প্রধান চার শিষ্য হলেন– পদ্মপাদ, হস্তামলক, মণ্ডন ও তোটক। পদ্মপাদের দুই শিষ্য– তীর্থ ও আশ্রম। হস্তামলকের দুই শিষ্য– বন ও অরণ্য। মণ্ডনের তিন শিষ্য– গিরি, পর্বত ও সাগর। তোটকের তিন শিষ্য– সরস্বতী, ভারতী ও পুরি। 

এই শব্দগুলো উপাধি-বিশেষ। লিখিত আছে, বিশেষ বিশেষ লক্ষণানুসারে এই দশ শিষ্যের তীর্থাদি দশটি নাম ও এই দশ জন থেকেই দশনামী সন্ন্যাসীদের তীর্থাদি দশ সংজ্ঞা উৎপন্ন হয়েছে। 

এবার চৈতন্যদেবের জীবনী দিকে তাকাই। 

উনার সন্ন্যাসের দীক্ষাগুরু ছিলেন কেশব ভারতী। উনি কুলিয়াতে যা বর্ধমান পশ্চিম বঙ্গে অবস্থিত ।উনার পূর্ব নাম ছিল কালীনাথ আচার্য। তিনি মাধবেন্দ্ৰ পুরীর শিষ্য ছিলেন। শ্ৰীচৈতন্যদেব তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাসব্রত গ্ৰহণ করেন। এটা পরিস্কার যে উনি দশনামী সম্প্রদায়ের ছিলেন। এর জন্য চৈতন্য চরিতামৃততে দেখিঃ 

উনি নিজেই শঙ্করাচার্য্যকে গুরু মানতেন।।

পাশাপাশি যারা শ্রীধরকে মানে না, তাদের বেশ্যা বলে গালিগালাজ করতেন।।

" প্রভু হাসি কহে স্বামী না মানে যেইজন

বেশ্যার ভিতরে তারে করয়ে গণন "

------- চৈ.চঃ অন্তলীলা, সপ্তম পরিচ্ছদ, ১০০---------


"শ্রীধরের অনুগত যে করে লিখন

সব লোক মান্য করি করয়ে গ্রহণ।"

-------চৈ.চঃ অন্তলীলা, সপ্তম পরিচ্ছদ, ১২০----------


স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভু ভাগবত পুরানের ক্ষেত্রে শ্রীধর স্বামীর ভাষ্যকেই শ্রেষ্ঠ বলেছেন।

এবং এও বলেছেন, "যে ভাগবতে শ্রীধর স্বামীর ভাষ্য মানে না তাকে তোমরা বেশ্যার মধ্যে গণন কর।"

"শ্রীধর-উপরে গর্ব যে কিছু করিবে।

অন্তব্যন্ত লিখন সে লোকে না মানিবে।"

[অন্তব্যন্ত লিখন= অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত অর্থাৎ, শাস্ত্রের মীমাংসা বা সিদ্ধান্ত না বুঝে যথেচ্ছ ভাবে লেখা]

শ্রী ধর স্বামী ছিলেন ১১৬ তম গোবর্ধন পুরীপিঠাধীশ শঙ্করাচার্য্য।।


মাধবেন্দ্র পুরী মহাশয় ছিলেন লক্ষীপতি তীর্থের শিষ্য । ইনারা সবাই ছিলেন আচার্য্য শংকর প্রবর্তিত ১০ নামী সম্প্রদায়ের । প্রমাণ এদের নামের টাইটেলেই আছে। তীর্থ, পুরী , ভারতী ইত্যাদী যত টাইটেল বা উপাধি দেখা যায় এরা সবাই ১০ নামীর অন্তর্ভূক্ত। যদিও গৌড়িয়রা এঁদের সবাইকে মাধ্বচার্য্যের শিষ্য বলে দাবী করেন কিন্তু এই দাবী খুব খোঁড়া এবং হাস্যকর বটে। কারণ মাধ্বচার্য্য বা আনন্দ তীর্থ  মহাশয়ের যে সময় তা মধ্যযুগ  (১২৩৮-১৩১৭) এবং উনি নিজে যে তীর্থ উপাধি পান সেটা অদ্বৈত মঠের অধীন ১০ নামী সম্প্রদায় থেকে পান। তাহলে এইটা পরিষ্কার যে উনাদের গোড়াপত্তনকারী নিজেই দশনামীর অন্তর্ভুক্ত। মধ্যযুগীয় একজন ব্যাক্তি থেকে কিভাবে হাজার হাজার বছরের সনাতন ধর্মের পরম্পরার শুরু হয়? সাধারণ কমন সেন্স দিয়ে ধরলেই এঁদের ভন্ডামি ধরা যায়। তাছাড়া এঁদের যে ভাগবত গীতার হাস্যকর গুরু পরম্পরা সেটাও একটি কাল্পনিক মত। সে নিয়ে আলাদা লেখার ইচ্ছা আছে। 

এবার তাহলে ভাবুন,  শঙ্করাচার্যের সিদ্ধান্তকে খন্ডন করার অর্থ হলো চৈতন্য মহাপ্রভুকে কাঁদানো, তাই নয় কি! সোজা কথায় মহাপ্রভুকে গালি দেওয়া। কি রকম হাস্যকর ব্যাপার যার নাম ব্যবহারের মাধ্যমে গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের প্রসিদ্ধি হয়েছে, তাঁর(চৈতন্য মহাপ্রভুর) সিদ্ধান্তকেই অস্বীকার করা যে চরম অজ্ঞতা এটা আপনাদের বুঝতে হবে।


আরেকটা মজার ব্যাপার হল,চৈতন্য মহাপ্রভু কতগুলো গ্রন্থ লিখেছেন সেটা নিয়ে ওনাদের নিজেদের মধ্যেই মতবিরোধ রয়েছে ।  ক্ষোদ চৈতন্য চরিতামৃত চৈতন্য ভারতী মারা যাবার ২৪ বছর পরে লিখা হয় । যাইহোক এই নিয়ে নাহয় আরেকদিন লিখবো। সেখানে উল্লেখিত শিক্ষাষ্টকম যা চৈতন্য ভারতীর কতৃক একমাত্র রচনা। মজার ব্যাপার হল  এঁদের মাঝে আবার তিনি যে শিক্ষাষ্টক্(আটটি শ্লোকের) রচনা করছেন এটা নিয়ে কোন মতবিরোধ নেই।এবার শিক্ষাষ্টক্ এর প্রথম শ্লোকের যে সিদ্ধান্ত তা শঙ্করাচার্যের সিদ্ধান্ত নয় কি! এই শিক্ষাষ্টক উনি ভজ গোবিন্দম ( আদি গুরু শংকরের রচনা) এর সিদ্ধান্ত থেকেই রচনা করেন। এবার দেখুন

 ―"চেতদর্পন মার্জনম্ অন্তে― শ্রীকৃষ্ণ সংকীর্তনম্"― অর্থাৎ চিত্তরূপী দর্পনের(যা পূর্বজন্মের সংস্কার,অহংকার ক্রোধ ইত্যাদির দরুন ময়লা হয়ে গেছে) পরিষ্কার শ্রীকৃষ্ণ সংকীর্তনের মাধ্যমে হয়(এটাই সংক্ষেপে প্রথম শ্লোকের অর্থ)।এবার একটু বিচার করুন তো, এটি কার সিদ্ধান্ত? উপনিষদ তথা শঙ্করাচার্য্যের সিদ্ধান্ত নয় কি? এবার শুনুন ও বিচার করুন― অন্যের মুখ দেখার জন্য শুধু নেত্র হলেই চলে নাকি দর্পণের প্রয়োজনীয়তা আছে?না নেই।শুধু নেত্র হলেই হয়।কিন্তু নিজের মুখ দেখতে হলে নেত্রের সাথে দর্পনের প্রয়োজন পড়ে। যদি চৈতন্য মহাপ্রভুর দৃষ্টিতে শ্রীকৃষ্ণ কেবলমাত্র উনার উপাস্যই বা আত্মীয়ই হত তাহলে তিনি শ্রীকৃষ্ণের দর্শনের জন্য কেবল নেত্রের কথাই উল্লেখ করতেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ উনার দৃষ্টিতে নিজ-আত্মাস্বরূপ বিধায়, আত্মাস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণের দর্শনের জন্য চিত্তরূপী দর্পনের পরিষ্কারের প্রয়োজনীয় পড়েছে।



Tuesday, May 3, 2022

মানব দেহ পূজা বা দেহ পূজা কি ঠিক?

 দেহ কি আমাদের মুক্তি দেয়?

নমস্কার। একজন সনাতনী হিসাবে আমারা সকলেই জানি যে সনাতন ধর্ম পঞ্চমতের সমন্বয়ে গঠিত। আদিগুরু তথা জগৎগুরু আদি শংকর স্মার্ত ধারা প্রচলন করে আমাদের সকলকে এক করে দিয়ে গেছেন যাতে করে আমরা বহিরাগত শক্তিদ্বারা আর বিভাজিত না হয়ে এক থাকি এবং সনাতনের বিজয় ধ্বজা চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেই। কিন্তু মধ্য যুগে কিছু ধর্ম বিকৃতিকারীদের কু-চিন্তা এবং কুট কৌশলের ফলে আজ ধর্মে বিভাজন হয়েছে এবং ফলশ্রুতিতে সনাতনীরা নিজেদের মধ্যেই মারামারিতে লিপ্ত। এমতাবস্থায় সুজোগ নিচ্ছে পশ্চিমা ইসলামিক এবং খ্রীষ্টান শক্তি।

এরই ধারাবাহিকতায় হিন্দুদের ধর্মান্তরকরণ এবং লাভজিহাদ নামক কুটকৌশল সনাতনীদের আরও দূর্বল করছে। কারন একটাই, আব্রাহামিকদের একেশ্বরবাদ এবং আমাদের এক ব্রহ্ম তত্ত্ব সনাতনীদের কাছে পরিষ্কার না। কারন অধিকাংশ সনাতনীর ধারণা কৃষ্ণ, বিষ্ণু, দূর্গা, শিব ইত্যাদি সবাই বিভিন্ন বেশে উপরে কোন এক অজানা স্থানে বসে আছেন এবং তাঁদের সেই দেহ যদি পূজা করি তাহলে এরা আমাদের অভিষ্ঠ লক্ষ পূরণে উনারা সহায়তা করবেন। বর্তমানে বিভিন্ন মতবাদীরা তাঁদের নিজ নিজ মন্দিরে দেহ পূজা করে তাতেই মনোনিবেশ করছে এবং এতে সুজোগ পাচ্ছে বিধর্মীরা। যদিও বৈষ্ণবেরা বিষ্ণু শিলা এবং শৈবরা লিঙ্গ পূজা করছেন তবুও যোগী বা সিদ্ধ পুরুষের লক্ষ্য থাকে নির্গুণ তত্ত্বে অর্থ্যাৎ সর্ব স্থানে ব্রহ্মের উপলব্ধি করা। আর সেই নির্গুন তত্ত্বে পৌঁছাতে গেলে সঠিক নিয়ম বা প্রসেসের মধ্য দিয়েই যেতে হয়। কিন্তু তথাকথিত মধ্যযুগীয় গৌড়ীয় ধারায় এই ভাব সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত।


তাই
আজ এই লেখায় আলোচনা করবো দেহ কি আমাদের মুক্তি দেয় নাকি দেহ একটি ভ্রম মাত্র?

·       ব্রহ্ম কি দেহধারী?

আসুন শুরু করা যাক।

আমাদের প্রাণের শাস্ত্র এবং স্মৃতি শাস্ত্রের একমাত্র বৈদিক মুখপাত্র যোগেশ্বর কৃষ্ণের দ্বারা প্রণীত শ্রীমদ্ভাগবত গীতাতেই রয়েছে এর সকল উত্তর।

শ্লোক সহ আলোচনা করছি।

বিভেদকারীদের দাবীঃ

গীতা ৯/১১
अवजानन्ति मां मूढा मानुषीं तनुमाश्रितम् |
परं भावमजानन्तो मम भूतमहेश्वरम् || 11|

অবজানন্তি মাং মুঢা মানুষীং তনুমাশ্রিতম্‌।

পরং ভাবমজানন্তো মম ভূতমহেশ্বরম্।| ১১।।

অনুবাদঃ প্রাণিসমূহের উপর সর্বপ্রকারে এঁব্ধ্যপূর্ণ আমার পরম ভাব

বোধে অসমর্থ হওয়ায় অজ্ঞব্যক্তিগণ, মনুষ্যমূত্তিধারী সামান্ত জীব বলিয়া আমাকে

অবজ্ঞা করিয়া থাকে ॥১১

কিন্তু এবার ১০/৩ দেখুন। যোগেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ কি বলছেন দেখুন।

यो मामजमनादिं च वेत्ति लोकमहेश्वरम् |

असम्मूढ: स मर्त्येषु सर्वपापै: प्रमुच्यते || 3|

যো মামজমনাদিঞ্চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্‌।

অসংমুঢ়ঃ স মর্ত্যেযু সর্ববপাঁপৈঃ প্রমুচ্যতে ॥ ৩

অনুবাদঃ যে ব্যক্তি মোহ-পরবশ না হইয়! আমাকে অনাদি,

জন্ম-রহিত [এবং] সকল লোকেরই পরমেশ্বর এই বলিয়া বুঝিয়া থাকে, মর্ত্ত্যগণের

মধ্যে সে বাক্তি সকল পাপ হইতে মুক্তিলাভ করিয়। থাকে ॥৩

আমরা জানি ব্রহ্ম হলেন জন্ম-মৃত্যু আবদ্ধ থেকে মুক্ত। উনি মায়া দ্বারা আবদ্ধ নন বরং মায়ার প্রকাশ উনি স্বয়ং নিজেই। তাহলে যে বা যারা যোগেশ্বর ভগবান কৃষ্ণকে ব্রহ্মরূপে জড়-শরীর রুপে না ভেবে সাক্ষাৎ ব্রহ্মরূপে অনাদির কারন হিসাবে জানবে সেই পাপ হতে মুক্ত। অথচ আমরা আজ যা দেখছি তা আসলেই কি শ্রীকৃষ্ণের বানী ??





চলুন দেখে নেই অন্য স্থানে গীতায় কি বলা আছে এই দেহ ভ্রম সম্পর্কে।

গীতা ২/১৮ বলছে,

अन्तवन्त इमे देहा नित्यस्योक्ता: शरीरिण: |

अनाशिनोऽप्रमेयस्य तस्माद्युध्यस्व भारत || 18||

অন্তবস্ত ইমে দেহা নিত্যস্কোক্তাঃ শরীরিনাঃ |

অনাশিনোহপ্রমেয়স্য তম্মাদৃযুধ্যস্ব ভারত ॥ ১৮

অনুবাদঃ হে ভারত, 'অবিনাশী অপ্রমেয় ও নিত্য শরীরীর এই সফল

দেহই বিনাশশীলরূপে উক্ত হইয়াছে [যে কারণে আস্থার বিনাশ হয় না]. এই

জন্য তুমি যুদ্ধ কর।

অর্থ্যাৎ শরীর অনিত্য। এর বিনাশ আছে। আর বিনাশী যেকোন কিছুই মায়া বা মিথ্যা। তাই এর পূজা করা ঠিক না।

 

 

একই অধ্যায়ের ২৮ এবং ৫৫ নং শ্লোক কি বলছে দেখে নেই।

अव्यक्तादीनि भूतानि व्यक्तमध्यानि भारत |

अव्यक्तनिधनान्येव तत्र का परिदेवना || 28||

 

অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত ।

অব্যক্তনিধনানেব্য তত্র কা পরিদেবন। ॥ ২৮

অনুবাদঃ এই পৃথিবী প্রসৃতি ও তাহা হইতে উৎপন্ন পুত্রমিত্র

প্রভৃতি ভূতসমূহের পূর্বাববস্থা উপলব্ধ নহে; ইহাদের ভবিষ্যদবস্থাও অপরি- জ্ঞাত অর্থাৎ ইহাদের পূর্বাপর অবস্থা প্রত্যক্ষগোচর হইবার নহে) কেবল ইহাদের বর্তমান অবস্থাই "ব্যক্ত হইয়া থাকে, সুতরাং এই পূর্বাপরসত্তারহিত

ক্ষণিক বস্তর উৎপত্তি বা বিনাশে এই প্রকার মোহনিবন্ধন প্রলাপ কি প্রকারে

[ সঙ্গত হইতে পারে ? ]॥ ২৮ :

 

प्रजहाति यदा कामान्सर्वान्पार्थ मनोगतान् |

आत्मन्येवात्मना तुष्ट: स्थितप्रज्ञस्तदोच्यते || 55||

প্রজহাতি যদা কামান্‌ সর্ববান্‌ পার্থ মনোগতান্‌।

আত্মন্যেবাত্মন! তুটঃ স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্যতে ॥ ৫৫

অনুবাদঃ হেপার্থ! পরমাত্মস্বরূপ নিজরূপে পরিতুষ্ট হইয়া যে সময় [যোগী] সকলপ্রকার মনোগত কাম (ইচ্ছাবিশেষ ) পরিত্যাগ করে, সেই সময়ই তাহাকে স্থিতধী-বলা যায় ॥ ৫৫

এছাড়াও গীতায় অনেক শ্লোকে (যেমন ৩/৩, ৪/৫, ৯/৪) দেহ ভ্রমে ঈশ্বপর চিন্তাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

তাই আসুন প্রভু যোগেশ্বর কৃষ্ণের পূজা আমরা বংশীধারি বা চক্রধারী যে রূপেই করি না কেন তা যেন দেহ বা জড় শরীর বোধে না হয়। তা যেন হয় এক অব্যাক্ত পরমাত্মা স্বরূপ।

ওম।  

Friday, April 29, 2022

কৃৈষ্ণবদের দাবী আদি শংকর মায়াবাদ প্রচার করেছেন?

নমঃ শিবায়। সকলকে নমস্কার । বর্তমানে কৃৈষ্ণব আগ্রাসন বাংলায় সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে। সকল কালী, শিব, দূর্গা, শনি ইত্যাদি মন্দির দখল করে সেখানে চলছে অশাস্ত্রীয় এবং বিকৃত হরে কৃষ্ণ নাম এবং আন্তর্জাতিক আমেরিকান একটি অবৈদিক সংঘটনের আস্ফালন। 

এদের গুরু বা আচার্য্যরা এদের যে শিক্ষা দিয়েছে এরা এদেরই পথ অনুসরণ করছে। এদের বিভেদকামী আচরণ আর মতবাদের জন্য বাংলাদেশী সনাতন সমাজ আজ ভাগে ভাগে বিভক্ত। আদিগুরু যেভাবে সনাতন ধর্মের আমাদের সকল মত বা পথের সমন্বয় করে দিয়ে আমাদের শক্তিশালী একটি জাতিতে পরিণত করেছিলেন,  সেই ব্যাক্তির মতকে এই অবৈদিক দল মায়াবাদ বলে গালি দেয়। এর প্রমাণে এরা পদ্মপুরাণ থেকে একটি শ্লোক মানুষকে দেখিয়ে বিভ্রান্ত করে। আজকে সেই হাস্যকর যুক্তির খন্ডনে এই লেখা। আসুন প্রথমে শ্লোকটি দেখে নেই।     

পদ্মপুরাণে উত্তরখণ্ডে ৬২ অধ্যায়ে রুদ্র স্বয়ং দেবীকে বলেছেন--


"মায়াবাদমসচ্ছাস্ত্রং প্রচ্ছন্নং বৌদ্ধ মুচ্যতে।

ময়ৈব বিহিতং দেবী কলৌ ব্রাহ্মণ মূর্তিণা।।"


"হে দেবী , আমি কলি যুগে ব্রাহ্মণ মূর্তি ধারণ করে অসৎ শাস্ত্র মাধ্যমে মায়াবাদ রুপ প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ মত স্থাপন করি"।


ভগবদ্ বিমুখ ঘোর নাস্তিক আসুরিক ভাবাপন্ন মানুষের চেতনা থেকে ভগবান নিজেকে আড়াল করে রাখতে চাইলেন। তাই ভগবান তার প্রিয় জন মহাদেবের মাধ্যমে মায়াবাদ প্রচার করতে নির্দেশ দিলেন।


ভগবান শ্রী হরি মহাদেব কে বলেন-


"স্বাগমৈঃ কল্পিতৈস্ত্ব জনান্ মদ্বিমুখান্ কু্রু।

মাং চ গোপয় যেন স্যাৎ সৃষ্টিরেষোত্তরোত্তরা।।"


"তোমার কল্পিত মতবাদের দ্বারা মানুষদের আমার প্রতি বিমুখ করে তোল। আমাকে এমন ভাবে গোপন করো যাতে বহির্মুখ মানুষেরা তাদের সংসার প্রবৃত্তি কর্মে বিরক্তি না জন্মে। বরং তারা উত্তরোত্তর জড়-জাগতিক উন্নতিতে আগ্রহী হয়।" (পদ্মপুরাণ উত্তর খন্ড ৬২/৩১)


এইস্থলে দেখা যায়,বলা হচ্ছে---

(১) জ্ঞানিগণের পাতিত্যকারক যে সকল তামসশাস্ত্র,তারা শৈব,পাশুপত,বৈশেষিক,ন্যায়,সাংখ্য,চার্বাক,বৌদ্ধ ও জৈনশাস্ত্র।

(২)মায়াবাদটি অসৎশাস্ত্র ও প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধশাস্ত্র।

(৩)এটি ব্রাহ্মণরুপী রুদ্রকর্তৃক কলিতে কথিত।

(৪)এই বাদটিতে শ্রুতিবাক্যের অন্যথা করা হয়েছে,কর্মের ত্যাগ উপদিষ্ট হয়েছে,জীব ও ঈশ্বরের ঐক্য উক্ত হয়েছে,ব্রহ্মকে নির্গুণ বলা হয়েছে ইত্যাদি।

  ভগবান শঙ্করের মত মায়াবাদ না--কিন্তু ব্রহ্মবাদ বা ঔপনিষদবাদ

এস্থলে ব্রাহ্মণরুপী রুদ্র মায়াবাদপ্রচারকর্তা বলে নির্দেশ থাকায় বৈষ্ণবগণ আচার্য শঙ্কর ও তাঁর মতবাদ বলে বুঝে থাকেন।কিন্তু শঙ্করসম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিগণ বলেন--এতে আচার্য শঙ্করের ব্রহ্মবাদ লক্ষ্য করা হয় নাই।কারণ,শঙ্করের মতবাদটি মায়াবাদই না; ব্রহ্মবাদ।যেহেতু শঙ্কর নিজ বেদান্তসূত্রভাষ্যে ২/২/৯ সূত্রের ভাষ্যে নিজেই বলেছেন--

 জ্ঞানশক্তিও সাংখ্য অনুমান করলে প্রতিবাদকার্য হতে তিনি নিবৃত্ত হলেন,আর তখন এক চেতনই অনেকস্বরুপ জগৎ প্রপঞ্চের উপাদান হল এরুপে ব্রহ্মবাদই স্বীকার করা হল।

এই যে শঙ্করমতকে মায়াবাদ বলা হয়,তা বিপক্ষগণের কথা।যেমন হিন্দু শব্দটা যবনগণ সিন্ধুবাসিগণকে নিন্দার ছলে বলত,কিন্তু কালে তারাই রাজা হওয়ায় যেমন আর্যগণ বাস্তবিকই সিন্ধুনদতীরবাসী বলে নিজেদেরকে হিন্দু বলতে লাগল।এস্থলেও যেন তদ্রুপ কতকটা হয়ে পড়েছে।বৈষ্ণবগণ প্রবল হয়ে শঙ্কর সম্প্রদায়কে যা বলে নিন্দা করতেন,শঙ্করসম্প্রদায়ের অজ্ঞব্যক্তিগণ তা নিন্দার সূচক না বুঝে নিজেকেই তাই বলে নির্দেশ করতে লাগল।পরে প্রসিদ্ধি অনুরোধে বিজ্ঞেও তাই বলতে লাগলেন।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শঙ্করমতকে মায়াবাদ বলাই যায় না।কারণ,যে মতে যাকে সর্বমূলতত্ত্ব বলে নির্দেশ করা হয়,তারই নামে সেই মতবাদের নামকরণ করা হয়।যেমন--শিব শক্তি বিষ্ণু প্রভৃতি যে যে মতে মূলতত্ত্ব বলা হয়,সেই সেই মতের নাম শৈব শাক্ত বৈষ্ণব প্রভৃতি।শঙ্করমতে জগৎ মিথ্যা(আবার এ মিথ্যা মানে অলীক বা অসৎ মনে করবেন না।) অর্থ্যাৎ মায়া,সত্য একমাত্র ব্রহ্ম।তাই সকলের মূলতত্ত্ব।এই ব্রহ্মে এই জগৎ কল্পিত বলে জগৎ মিথ্যা বলা হয়।সুতরাং মায়া মূলতত্ত্ব না, ব্রহ্মই মূলতত্ত্ব।এজন্য শঙ্করমতকে ব্রহ্মবাদই বলা সঙ্গত।অন্যত্র বহু স্থলে মীমাংসক ও ন্যায়াচার্যগণ এবং স্বমতের আচার্যগণ একে ঔপনিষদবাদ নামে আখ্যাত করেছে।এজন্য কুসুমাঞ্জলি,শাস্ত্রদীপিকা এবং মধুসূদনী প্রভৃতি গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।

        এবার আসুন দেখে নেই কেন শঙ্করমতকে মায়াবাদ বলে এরা 

কৃৈষ্ণবগণ একে মায়াবাদ বলবার কারণ এই যে,এর সঙ্গে বৌদ্ধমতের কিঞ্চিৎ সাদৃশ্য আছে।সে সাদৃশ্য এই যে,বৌদ্ধগণ জগৎকে অসতে অর্থ্যাৎ শূন্যে,মায়া বা অবিদ্যাকল্পিত বলিয়া থাকেন,সুতরাং বৌদ্ধমতেও জগৎ নাই।শঙ্করমতে জগৎ সতে অর্থাৎ ব্রহ্মে মায়াকল্পিত বলিয়া পরমার্থতঃই নাই।এখন জগতের না থাকা অংশে বা কল্পিতত্ব অংশে ঐক্যই একটু সাদৃশ্য বলতে হবে।বৈষ্ণবাদি বিপক্ষগণ এই সাদৃশ্য অংশকে লক্ষ্য করিয়া নিজমতে নিষ্ঠার বৃদ্ধি উদ্দেশ্যে পরমতের নিন্দা করে একে মায়াবাদ বলেছেন।বস্তুতঃ বৌদ্ধমতে জগৎকল্পনার অধিষ্ঠান অর্থ্যাৎ মূলতত্ত্ব অসৎ বা শূন্য এবং শঙ্করমতে সেই অধিষ্ঠান বা মূলতত্ত্ব সৎ ব্রহ্ম,আর তাতে এই দুই মতের যে অত্যন্ত বিরোধ তা কেউই অস্বীকার করতে পারেন না।অতএব মায়াবাদ শঙ্করের বাদ নহে।শঙ্কর যদি জগতের মূলতত্ত্ব বা অধিষ্ঠানকে মায়া বা শূন্য বলতেন তা হলে তাঁর মতবাদ মায়াবাদ হত।যেহেতু মূলত্ত্বানুসারেই মতবাদের নামকরণ হয়--এটাই রীতি।মায়া উভয় মতেই নিমিত্তকারণ বটে,কিন্তু তাই বলে তা যে অধিষ্ঠানরুপ উপাদান কারণ,তা শঙ্কর বলেন নাই।বৌদ্ধমতে উপাদানরূপ এই অধিষ্ঠান স্বীকার করা হয় না,তাঁদের মতে নিরধিষ্ঠান ভ্রম স্বীকার করা হয়।অতএব পদ্মপুরাণের এই নিন্দা প্রকৃতপক্ষে শঙ্করমতের নিন্দা না,পরন্তু অন্য কোন মতবাদের নিন্দা।পরবর্তী বিপক্ষগণ শঙ্করমতে এরুপ মায়াবাদত্ব আরোপ করিয়া নিন্দা করে থাকেন মাত্র।


তাদের যুক্তি অনুসারে  তারাই বিপদে পড়ে চৈতন্যস্বরুপ আত্মার জ্ঞানরুপে পরিণাম স্বীকার করায়,রামানুজ জৈনমতের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছেন বলে মনে করার সঙ্গত কারণ আছে।সর্বদর্শনসংগ্রহে মাধবাচার্য মধ্বের মুখে ভেদাভেদবাদী রামানুজকে জৈন পদাঙ্কনুসারী বলতে কুন্ঠিত হন নাই।রামানুজ যে পাঞ্চরাত্রমতাবলম্বী,সেই পাঞ্চরাত্র মত সম্বন্ধে বরাহ পুরাণে ৬৬ অধ্যায়ে আছে--

অলভা বেদমন্ত্রাণাং পাঞ্চরাত্রোদিতেন হি....শুদ্রাদীনান্ত ন শ্রোতপদবী মুপাযাস্যতি।।১২

তাহার পর অপরাপর পুরাণ মধ্যে আছে--

পাঞ্চরাত্রং ভাগবতং তন্ত্রং-----এবং বিধানি চান্যানি মোহনার্থানি তানি তু।।।

কুর্ম ১১ অধ্যায়,সুতসংহিতা ৪র্থ মুক্তিখণ্ড

এইরুপ পুরাণজাতীয় অপরাপর বহু গ্রন্থেই ভাগবত ও রামানুজমতের বহু নিন্দা আছে।যাহা হউক ইহা হইতে জানা যায়--

(১) বেদমন্ত্র লভ্য না হইলে পাঞ্চরাত্র আচারে ভগবান লাভ।

(২) পাঞ্চরাত্রমত ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের জন্য,শূদ্রের জন্য নহে।

(৩) পাঞ্চরাত্র ভাগবত ও বৈখানসতন্ত্র বেদভ্রষ্টের জন্য বিষ্ণু উপদেশ করিয়াছেন।

(৪) পাঞ্চরাত্রাদির বেদমূলকত্ব নাই ।

(৫)পাঞ্চরাত্রাদি শাস্ত্র মোহনার্থ রচিত।

(৬)ভাগবত ও সাত্ত্বত শাস্ত্র অভিন্ন।

(৭) কুণ্ড ও গোলকগণের জন্য অভিপ্রেত।কুণ্ড অর্থ--পতিসত্ত্বে জারজ পুত্র এবং গোলক অর্থ--পতি মরণান্তে জারজ পুত্র।।


এদিকে অদ্বৈতমতে জগৎকে বলা হয় মিথ্যা অর্থ্যাৎ অনির্বচনীয়।কেবলমাত্র জগতের ব্যবহারিক সত্যতাই এই মতে স্বীকৃত হইয়া থাকে।দ্বৈতবাদীও এই ব্যবহারিক সত্তার বাইরে যেতে পারেন না।আর,ব্যবহারিক সত্তাতো প্রাতিভাসিক সত্তারই সামগ্রিক উন্নতর সংস্করণমাত্র।

(The Collective elevation of an individual illusion)।

এই অবস্থায় বিজ্ঞানে বিজ্ঞেয় বিষয়ের প্রাতিভাসিক সত্তা দ্বৈতবাদীকেও নত মস্তকে স্বীকার করতে হবে।এই প্রাতিভাসিক সত্তার ক্ষেত্রে তা হলে দ্বৈতবাদী,অদ্বৈতবাদী,বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধ প্রভৃতি সকলেই  একমত।বিজ্ঞেয় বিষয়ের প্রাতিভাসিক সত্তার অতিরিক্ত পারমার্থিক সত্তার প্রশ্নে দ্বৈতবাদের সাথে অদ্বৈত ও বৌদ্ধমতের মতদ্বৈধ আছে সন্দেহ নাই।কিন্তু অন্ততঃ একটি ক্ষেত্রে (প্রাতিভাসিক সত্তার ব্যাখায়) তো সকল মতেরই অনুমোদন আছে দেখা গেল।অতএব বিজ্ঞানের আধারে জগৎ কল্পিত,এই সিদ্ধান্তের জন্য অদ্বৈতবেদান্তবাদ ও বিজ্ঞানবাদ যদি অভিন্ন হয়,তবে বিজ্ঞান জ্ঞেয় বিষয়ের প্রাতিভাসিক সত্তা আছে,এইরুপ সিদ্ধান্ত স্বীকার করার জন্য দ্বৈতবাদীকেও বিজ্ঞানবাদী বলতে আপত্তি কী?দ্বৈতবাদীর অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রকাশত্মযতি তদীয় 'বিবরণে' যে প্রত্যুত্তর দিয়েছেন,এটাই তাঁর(প্রকাশত্মযতির) নিগূঢ় রহস্য বলে মনে হয়।প্রকাশত্মযতির বক্তব্যের সাথে আমরা আরও একটু যোগ করে বলতে পারি-বহির্জগতের বস্তুসত্তা অস্বীকার করার জন্য যদি বিজ্ঞানবাদ ও অদ্বৈতবাদ এক হয়ে যায়,তবে পরিদৃশ্যমান বিশ্বের বাস্তব সত্তা স্বীকার করার জন্য চার্বাক দর্শন ও দ্বৈতদর্শন এক বা অভিন্ন হয়ে যায় না কেন?দ্বৈতবাদীরা কি নিজেদের চার্বাকপন্থী বলতে রাজি হবেন?


পুরাণে শঙ্করমতের নিন্দার উদ্দেশ্য

আর শঙ্করকে,চার্বাকমতপ্রবর্তক বৃহস্পতি অথবা বৌদ্ধমতপ্রবর্তক বুদ্ধের ন্যায় দৈত্যবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণকে মোহিত করবার জন্য রুদ্রাবতার বলতে পারা যায় না।কারণ,তাঁর প্রচারিত মত ব্যাসদেবেরই পুরাণমধ্যে বিস্তৃতভাবে বর্ণিত।পুরাণাদিমধ্যে বৌদ্ধ বা চার্বাকমত থাকলেও তাতে অশ্রদ্ধা উৎপাদনের জন্য সেই পুরাণমধ্যেই বলা হয়েছে।কিন্তু শঙ্করমতের সম্বন্ধে সে চেষ্টা করা হয় নাই।যে পুরাণে শঙ্করমত উক্ত তাতে তার বিন্দুমাত্র নিন্দা নাই।যে পুরাণে অন্যমত বর্ণিত,তাতেই নিন্দা আছে।


ঋণঃ স্বামী চিদঘনানন্দ পুরী ও  আশুতোষ শাস্ত্রী,কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ,
প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ স্কলার,এম-এ পিএইচডি,বিদ্যাবাচস্পতি

Sunday, April 24, 2022

শ্রীকৃষ্ণের শিব উপাসনার তাৎপর্য ও শিক্ষা

“যদত্র পরমং গুহ্যং স বৈ দেব মহেশ্বরঃ”;



সমস্ত শাস্ত্রের মধ্যে অতি গোপনীয় তত্ত্ব হল শিবতত্ত্ব। অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ায় শিবকে সবাই জানতে পারে না। যে অধিকারী ভক্তকে তিনি দয়া করেন, তিনিই তাঁকে বিন্দু পরিমাণ জানতে পারে।তিনি চিন্তার অতীত, বুদ্ধির অতীত, শাস্ত্রের অতীত। সাধনায় তুষ্ট হয়ে ভক্তের হৃদয়ে গভীরে তিনি দর্শন দেন; আবার কখনো মূর্তিমান হয়ে সাকার রূপ ধারণ করেন। কেউ তাঁকে সম্যকরূপে জানতে পারে না। পক্ষান্তরে তিনি ভূত,বর্তমান ভবিষ্যতের দ্রষ্টা, নিয়ন্তা এবং সাক্ষীপুরুষ।


বেদাঃ সাঙ্গোপনিষদঃ পুরাণাধ্যাত্মনিশ্চয়াঃ।

যদত্র পরমং গুহ্যং স বৈ দেব মহেশ্বরঃ।।

(মহাভারত: দ্রোণপর্ব, ১৭০.৮৯)


বেদ, ব্যাকারণাদি বেদাঙ্গশাস্ত্র, উপনিষদ পুরাণ ও সমস্ত অধ্যাত্মশাস্ত্রের মধ্যে যা অত্যন্ত গোপণীয় তাই মহাদেব মহেশ্বর।


পরমেশ্বর শিব সমস্ত কিছুর মধ্যে অতি গূঢ় ভাবে আছেন এবং সমস্ত শাস্ত্রে অতি গোপনীয় তত্ত্ব, তাই সকলে পরমেশ্বর শিবকে জানতে পারেন না।


দেবাসুরমুনীনাং তু যচ্চ গুহ্যং সনাতনম্।

গুহায়াং নিহিতং ব্রহ্ম দুর্ব্বিজ্ঞেয়ং মুনেরপি।।

(মহাভারত:অনুশাসনপর্ব, ১৫.২৯)


“যিনি দেবতা, অসুর ও মুনিগণের নিকটেও গুপ্ত রয়েছেন, যে সনাতন ব্রহ্ম সাধুগণের হৃদয়গুহায় নিহিত আছেন এবং যিনি মুনিগণেরও দুর্জ্ঞেয়।”


দুর্জ্ঞেয় শিবকে অবতার পুরুষেরা অবতার রূপে এসে তাঁর উপাসনা পদ্ধতি আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন। নিরাকার বাতাস যেমন চোখে দেখা যায় না। কিন্তু একটি বেলুনে সেই বাতাসকে ভরে নিলে সেই বাতাসের একটি সাময়িক রূপ পাওয়া যায়। আবার বেলুন ছিদ্র করে দিলে কোন রূপ নেই। তেমনিভাবে চিন্তার অতীত পরমেশ্বর ভগবান যখন অবতাররূপে আসেন, তিনি জীবের মাঝে জীবের মত করে থেকে তাদের লোকশিক্ষা দিয়ে যান। জগতের মানুষের কি কি করতে হবে তা আমরা অবতারদের কর্ম থেকেই শিক্ষা লাভ করতে পারি। যিনি শিবরূপী দুর্জ্ঞেয় পরমেশ্বর তিনিই যখন কৃষ্ণ নামে অবতাররূপে এসেছেন ; তিনি তখন লোকশিক্ষার জন্যে শিবরূপে নিজেরই উপাসনা করে জগতকে শিক্ষা দিয়েছেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ , শিবভক্ত উপমন্যুর কাছে পাশুপত ব্রতের অনুষ্ঠান করেছিলেন। বিষয়টি শাস্ত্রের বিভিন্ন স্থানেই বর্ণিত আছে।ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শিব উপাসনার এ বিষয়টি মহাভারতের অনুশাসন পর্বের সাথে সাথে কূর্ম পুরাণের পূর্বভাগে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে।ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভস্ম মেখে, মুণ্ডিত মস্তকে বল্কল পড়ে রুদ্ররূপ শিবের নাম জপ করতে করতে তাঁর দর্শন পান। ভগবান শিব তাঁর শক্তি দেবী ভবানী সহ শ্রীকৃষ্ণের সামনে প্রকট হন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হাতজোড় করে কৃতাঞ্জলি মুদ্রায় গিরিশ ও গৌরীকে প্রণাম করে তাঁর স্তোত্র করেন।



নমোঽস্তু তে শাশ্বত সর্বযোনে

ব্রহ্মাধিপং ত্বামৃষয়ো বদন্তি ।

তপশ্চ সত্ত্বঞ্চ রজস্তমশ্চ

ত্বামেব সর্বং প্রবদন্তি সন্তঃ ।।

ত্বং ব্রহ্মা হরিরথ বিশ্বযোনিরগ্নিঃ

সংহর্ত্তা দিনকরমণ্ডলাধিবাসঃ ।

প্রাণস্ত্বং হুতবহবাসবাদিভেদ-

স্ত্বামেকং শরণমুপৈমি দেবমীশম্‌ ।।

সাংখ্যাস্ত্বাং ত্রিগুণমথাহুরেকরূপং

যোগাস্ত্বাং সততমুপাসতে হ্রদিস্থম্‌ ।

বেদাস্ত্বামভিদধতীহ রুদ্রমীড্যং

ত্বামেকং শরণমুপৈমি দেবমীশম্‌ ।।

ত্বৎপাদে কুসুমমথাপি পত্রমেকং

দত্বাসৌ ভবতি বিমুক্তবিশ্ববন্ধঃ ।

সর্বাঘং প্রণুদতি সিদ্ধ যোগিজুষ্টং

স্মৃত্বা তে পদযুগলং ভবৎপ্রসাদাৎ ।।

যস্যাশেষবিভাগহীনমমলং হ্রদ্যন্তরাবস্থিতং।

ত্তত্ত্বং জ্যোতিরনন্তমেকমচলং সত্যং পরংসর্বগম্‌ ।

স্থানং প্রাহুরনাদিমধ্যনিধনং যস্মাদিদং জায়তে।

নিত্যংত্বাহমুপৈমিসত্যবিভবং বিশ্বেশ্বরংতং শিবম্‌ ।।

ওঁ নমো নীলকণ্ঠায় ত্রিনেত্রায় চ রংহসে ।

মহাদেবায় তে নিত্যমীশানায় নমো নমঃ ।।

নমঃ পিনাকিনে তুভ্যং নমো মুণ্ডায় দণ্ডিনে ।

নমস্তে বহুহস্তায় দিগ্বস্ত্রায় কপর্দ্দিনে ।।

নমো ভৈরবনাদায় কালরূপায় দংষ্ট্রিনে ।

নাগযজ্ঞোপবীতায় নমস্তে বহ্নিরেতসে ।।

নমোঽস্তু তে গিরীশায় স্বাহাকারায় তে নমঃ ।

নমো মুক্তাট্টহাসায় ভীমায় চ নমো নমঃ ।।

নমস্তে কামনাশায় নমঃ কালপ্রথাথিনে ।

নমো ভৈরববেশায় হরায় চ নিষঙ্গিণে ।।

নমোঽস্তু তে ত্র্যম্বকায় নমস্তে কৃত্তিবাসসে ।

নমোঽম্বিকাধিপতয়ে পশূনাং পতয়ে নমঃ ।।

নমস্তে ব্যোমরূপায় ব্যোমাধিপতয়ে নমঃ ।

নরনারীশরীরায় সাংখ্যযোগপ্রবর্তিনে ।।

নমো ভৈরবনাথায় দেবানুগতলিঙ্গিনে ।

কুমারগুরুবে তুভ্যং দেবদেবায় তে নমঃ ।।

নমো যজ্ঞধিপতয়ে নমস্তে ব্রহ্মচারিণে ।

মৃগব্যাধায় মহতে ব্রহ্মাধিপতয়ে নমঃ ।।

নমো হংসায় বিশ্বায় মোহোনায় নমো নমঃ ।

যোগিনে যোগগম্যায় যোগমায়ায় তে নমঃ ।।

নমস্তে প্রাণপালায় ঘণ্টানাদপ্রিয়ায় চ ।

কপালিনে নমস্তুভ্যং জ্যোতিষাং পতয়ে নমঃ ।।

নমো নমো নমস্তুভ্যং ভূয় এব নমো নমঃ ।

মহ্যং সর্বাত্মনা কামান্‌ প্রপচ্ছ পরমেশ্বর ।।

(কূর্ম পুরাণ: পূর্বভাগ, ২৫.৬২-৭৮ )


“হে শ্বাশ্বত সর্বযানে ! আপনাকে প্রণাম করি। ঋষিগন আপনার সম্বন্ধে বলেন যে আপনিই ব্রহ্মারও অধিপতি এবং সাধুরা আপনাকেই সত্ত্ব, রজঃ তমঃ ও তপঃ বলে থাকেন।আপনিই ব্রহ্মা, আপনিই বিশ্বযোনি হরি, আপনিই অগ্নি, আপনিই সংহারকর্ত্তা এবং আপনিই সূর্যমণ্ডলের মধ্যে অবস্থান করেন । হে প্রভো! আপনিই প্রাণ, আপনিই অগ্নি ও ইন্দ্রাদিভেদে লোকপাল এবং আপনিই ঈশ। আমি ( শ্রীকৃষ্ণ ) একমাত্র আপনারই শরণগ্রহণ করছি । সাংখ্যেরা আপনাকে একরূপ এবং ত্রিগুণ বলে থাকেন । যোগিগন সতত আপনাকে হৃদয়ে ধ্যান করেন এবং বেদসমূহ আপনাকে পূজনীয় ‘রুদ্র’ বলে উল্লেখ করেছে। আমি একমাত্র আপনারই শরণাপন্ন হলাম। যে আপনার চরণে একটি পুস্প অথবা পত্র দেয়, সে-ই ভববন্ধন হতে বিমুক্ত হয় ; সিদ্ধ ও যোগীগণের সেবিত আপনার চরণযুগল স্মরণ করলে আপনার প্রসাদেই সমস্ত পাপ নিবারিত হয় । যিনি একমাত্র জ্যোতিঃ ; অশেষ বিভাগরহিত ; নির্মল হৃদয়ের অন্তরে অবস্থিত তত্ত্বপ্রকাশক , অচল, সত্য , সর্বোত্তোম ও সর্বগামী ; যিনি অনাদি – মধ্য – নিধন স্থানরূপ এবং সমস্ত জগত যাঁর থেকেই উৎপন্ন হয়েছে ; আমি সেই সত্যবিভব বিশ্বেশ্বর শিবকে প্রতিনিয়ত আশ্রয় করি । হে দেব! আপনি নীলকণ্ঠ , ত্রিনেত্র , রংহঃ , ঈশান ও মহাদেব – আপনাকে বারবার প্রনাম করছি । আপনি পিনাকী , মুণ্ডী, দণ্ডী, বহুভুজ , দিগ্বসন ও কর্প্পদী – আপনাকে নমস্কার । আপনি ভৈরবনাদ , কালরূপ , দংষ্ট্রী , নাগযজ্ঞোপবীতধারী ও বহ্নিরেতাঃ- আপনাকে নমস্কার । আপনি গিরিশ , স্বাহাকার , মুক্তাট্টহাস এবং ভীম – আপনাকে প্রণাম করি । আপনি কামনাশক , কালপ্রমাথী , ভৈরববেশ ও নিষঙ্গী হর ; আপনাকে নমস্কার । আপনি ত্রিলোচন , কৃত্তিবাসা , অম্বিকাপতি ও পশুপতি – আপনাকে নমস্কার করি । আপনি ব্যোমরূপ , ব্যোমাধিপতি , নরনারীদেহ এবং সাংখ্যযোগের প্রবর্তক – আপনাকে বারবার প্রণাম করি । আপনি ভৈরবনাথ , দেবানুগতলিঙ্গী, কুমারগুরু ও দেবদেব – আপনাকে নমস্কার করি । আপনি যজ্ঞাধিপতি , ব্রহ্মচারী , মহান মৃগব্যাধ ও ব্রহ্মাধিপতি – আপনাকে প্রণাম । আপনি হংস , বিশ্বমোহন , যোগী, যোগগম্য ও যোগময় – আপনাকে প্রনাম করি । আপনি প্রাণপাল , ঘণ্টানাদপ্রিয় , কপালী ও জ্যোতিস্পতি – আপনাকে প্রণাম । হে পরমেশ্বর ! আমি আপনাকে প্রনাম করছি ; আপনি সর্বপ্রযত্নে আমার মনের অভিষ্ট সিদ্ধ করুন।”


এইভাবে স্তব করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, পরমেশ্বর ভগবান শিব ও পরমেশ্বরী জগন্মাতা গৌরীর চরণে দণ্ডবৎ পতিত হয়ে তাঁদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করলেন।


এবং হি ভক্ত্যা দেবেশমাতিষ্টুয় স মাধবঃ ।

পপাত পাদয়োর্বিপ্রা দেবদেব্যোঃ স দণ্ডবৎ ।।

(কূর্ম পুরাণ:পূর্বভাগ,২৫.৭৯ )


“হে বিপ্রগণ ! শোনো। এইভাবে শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর ভগবান দেবাদিদেবের স্তব করে পরমেশ্বর ভগবান শিব ও দেবী অম্বিকার চরণে দণ্ডবৎ হলেন ।


শ্রীকৃষ্ণকে উমা সহ মহেশ্বর সশরীরে দর্শন দিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করিয়ে দেন যে তিনিই যে সকল জীবের কামনাপূর্ণকারী শিবের অভেদমূর্তি পুরুষোত্তম নারায়ণ। এ নারায়ণরূপে তিনিই সকল

জীবের প্রার্থনা সিদ্ধি করেন। যাঁর কৃপা ব্যতিরেকে সমস্ত কিছুই বিনষ্ট হয়ে যায়।


ত্বং হি সা পরমা মুর্মিমর্ম নারায়ণাহ্বা।

ন বিনা ত্বাং জগৎ সর্বং বিদ্যতে পুরুষোত্তম্।।

বেত্থ নারায়ণানন্তমাত্মানং পরমেশ্বরম্।

মহাদেবং মহাযোগং স্বেন যোগেন কেশব॥

(কূর্ম পুরাণ:পূর্বভাগ,২৫.৮২-৮৩ )


মহাভারতের অনুশাসন পর্বে শ্রীকৃষ্ণের শিব উপাসনার অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ তাৎপর্যমণ্ডিত এ বিষয়টি আরও সুবিস্তৃতভাবে রয়েছে। মহর্ষি উপমন্যুর নির্দেশনায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সম্মুখে মহাদেব এবং মহাদেবী উমা-মহেশ্বর আবির্ভূত হয়। শত্রুহন্তা শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন দিয়ে ভগবান শিব তাঁকে যেকোন দুর্লভ আটটি বর প্রার্থনা করতে বলেন। ভগবান শিব শ্রীকৃষ্ণকে নিজের পরম ভক্তরূপে উল্লেখ করে, তাঁর মঙ্গল বিধানের জন্য বর প্রার্থনা করতে বলেন। ভগবান শিব সাধুশ্রেষ্ঠ, যদুবংশশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণকে অতি দুর্লভ যেকোন দুর্লভ বর কামনা করতে বললেন। অনন্ত তেজরাশির মধ্যে ভগবান শিবের দর্শন এবং বরদানের প্রতিশ্রুতিবাক্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তিনি প্রীত হৃদয়ে উমা-মহেশ্বরকে ভূতলে মস্তক নিপতিত করে প্রণাম করে বর প্রার্থনা করলেন। মহাদেব শ্রীকৃষ্ণের আটটি বর প্রার্থনা শুনে “তাই হোক” বলে পূর্ণ করলেন। তখন শিবপত্নী উমাদেবী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর মঙ্গল সম্পাদনের জন্য স্বেচ্ছায় মহাদেবের মত তেজসম্পন্ন গুণসম্পন্ন ‘শাম্ব’ নামে একটি পুত্রের আশীর্বাদ করলেন।


ধর্মে দৃঢ়ত্বং যুধি শক্রঘাতং

যশস্তথাগ্র‍্যং পরমং বলঞ্চ।

যােগপ্রিযন্বং তব সন্নিকর্ষং

বৃণে সুতানাঞ্চ শতং শতানি॥

এবমস্ত্বিতি তদ্বাক্যং ময়ােক্তঃ প্রাহ শঙ্করঃ।

ততো মাং জগতো মাতা ধারিণী সর্বপাবনী।।

উবাচোমা প্রণিহিতা সর্বাণী তপসাং নিধিঃ।

দত্তো ভগবতা পুত্রঃ শাম্বাে নাম তবানঘ॥

(মহাভারত: অনুশাসন পর্ব,১৪.২-৪)


“ধৰ্মানুষ্ঠানে দৃঢ়তা, যুদ্ধে শত্রুসংহার, উত্তম যশ, উৎকৃষ্ট বল, যােগানুষ্ঠানে প্রীতি, আপনার সান্নিধ্য এবং দশসহস্র পুত্র আমি প্রার্থনা করি।আমার বর প্রার্থনায় মহাদেব বলিলেন—”তাই হোক”। এরপরে জগন্মাতা, জগদ্ধাত্রী, সর্বপাবনী, তপস্যানিধি ও মহাদেবের পত্নী উমাদেবী আমার মঙ্গলসম্পাদনে স্বেচ্ছায় আমাকে বললেন—হে নিস্পাপ কৃষ্ণ। ভগবান মহাদেব ‘শাম্ব’ নামে একটি পুত্র তােমাকে দান করিবেন।”


আমরা সনাতন শাস্ত্রের গুহ্য আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে না বুঝে বর্তমানে নিজস্ব সংকীর্ণতা, নিজস্ব চিন্তা এবং নিজস্ব মানসিকতা নিয়ে শাস্ত্রকে পাঠ করতে গিয়ে বারেবারেই নিজেদের অজ্ঞাতসারে নিজেরাই প্রতারিত হচ্ছি। আমরা যদি কূর্ম পুরাণের উক্ত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শিব উপাসনার এ ঘটনাটি ভাল করে পর্যবেক্ষণ করি তবে দেখতে পাবো- অচিন্ত্য পরমেশ্বরই অবতাররূপে জগতে এসে আবার তিনিই শিবের উপাসনা করছেন। উপাসনায় তুষ্ট হয়ে পরমেশ্বর শিবও তাঁদের অভেদত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। অর্থাৎ যিনিই শিব, তিনিই কৃষ্ণ। পরবর্তীতে শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর শিবের কাছে তাঁর তুল্য পুত্র কামনা করেন।এ সকল বিষয়ই লোকশিক্ষার্থে এক অদ্বিতীয় পরমেশ্বরের লীলা। তিনি এক ও অদ্বিতীয় হয়েও অনন্ত হয়ে, অনন্ত মূর্তিতে প্রকাশিত হয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে লীলা করেন। এ লীলা যোগ্য অধিকারী বিহীন কেউ উপলব্ধি করতে পারে না, তখন তারা প্রতারিত হয়। পরমেশ্বরকে বহু মনে করে। অচিন্ত্য পরমেশ্বরের কোন সুনির্দিষ্ট মূর্তি নেই। সর্বত্রই তিনি প্রকাশিত। তাঁর কোন পরিবার পরিজন নেই; কারো প্রতি রাজ বিদ্বেষ নেই; কোন পক্ষপাতিত্ব নেই। জগতের সকল জীবই যেমন তাঁর সন্তান, তেমনি তাঁর কোন সন্তানসন্ততি নেই।কিন্তু আমরা উপাসনার স্বার্থে আমাদের পরিবার পরিজনের আদলে সৃষ্টিকর্তারও পরিবার পরিজন কল্পনা করে অসীম ঈশ্বরকে সসীম সীমায় এনে সাধন জগতে অগ্রসর হই।


বিভিন্ন পুরাণে বিভিন্ন আপাত পরস্পরবিরুদ্ধ কাহিনী এবং সিদ্ধান্ত দেখে আমরা বর্তমানে আমরা বিভ্রান্ত হয়ে যাই। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। শাস্ত্রের সঠিক পাঠ, চর্চা এবং ধারণা না থাকায় এ ঘটনাগুলো ঘটছে। শিবপুরাণে শিবের মাহাত্ম্য, দেবীপুরাণে দেবীর মাহাত্ম্য, বিষ্ণুপুরাণে বিষ্ণুর মাহাত্ম্য, সূর্যপুরাণে সূর্যের মাহাত্ম্য এবং গণেশপুরাণে গণেশের মাহাত্ম্য সহ বিভিন্ন পুরাণে বিভিন্ন দেবতার মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। যে পুরাণ যে দেবতার নামে, সে পুরাণে সেই দেবতারই মাহাত্ম্যমণ্ডিত করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে মনে করে সনাতন ধর্ম বহুঈশ্বরবাদী। বিষয়টি হাস্যকর এবং অশাস্ত্রীয় হলেও অজ্ঞানতার কারণে সমাজে মতবাদটি প্রচলিত। যে পুরাণ নিয়ে এ বিভ্রান্তি, একটু ভাল করে সেই পুরাণগুলোর মধ্যে যদি আমরা দৃষ্টি দেই, তবে সেই পুরাণগুলোর মধ্যে আমরা একটি শাশ্বত সাধারণ বিষয় অনেকেই লক্ষ্য করে দেখি না। খুব ভালো করে যদি আমরা পুরাণগুলোকে পাঠ করি, তবে লক্ষ্য করে দেখতে পাবো প্রত্যেক পুরাণের মধ্যে যে দেবাতার নামে এবং যাঁর মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে সেই দেবতাকেই পরমেশ্বর পরমব্রহ্ম রূপে স্তোত্র করা হয়েছে। অর্থাৎ আমি যেই রূপে উপাসনা করি না কেন, পরমেশ্বরের আদতে এক এবং অদ্বিতীয়। তাঁর দ্বিতীয় নেই। তাই মুনিদের, ঋষিদের, পবিত্র হৃদয় সাধু-সন্তদের উপাসিত যেকোনো একটি রূপকে ইষ্ট নির্দিষ্ট করে যদি আমরা সাধন পথে অগ্রসর হই তবে আমরা মুক্তির পথে যেতে পারবো। এ সাধারণ বিষয়টি আমরা বুঝতে ভুল করি বারবার। বেদের মধ্যে, অষ্টাদশ পুরাণ এবং অষ্টাদশ উপপুরাণ মধ্যে, স্মৃতিশাস্ত্র মধ্যে -একথাই বোঝানো হয়েছে বিভিন্ন কাহিনী এবং দৃষ্টান্তের মাধ্যমে।

Thursday, April 14, 2022

অদ্বৈতবাদ খন্ডনের নামে বাতুলতার জবাব।

 অনলাইন দুনিয়ায় নতুন কিছু মাথামোটার আবির্ভাব হয়েছে যারা সনাতন ধর্মের হাজার হাজার বছরের অদ্বৈত পরম্পরার উপরে প্রশ্ন রেখে নিজেদের ব্যাবসা ফুলিয়ে তুলছে। আমাদের মাঝে বিভেদের যে দেয়াল তাঁর সূত্রপাত হয় এই এদের হাত ধরেই। যবন, ম্লেচ্ছরা ভারতবর্ষে আসার পরেও এদের এই বিভেদের দেয়াল দীর্ঘায়িত করা থামে নাই। যেমন বলা যায় কয়দিন আগেও ইস্কনের এক তথাকথিত সদস্য উনাদেরই আচার্য্যের বানী মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন। 


নিম্ন সেই ভিডিওটি 


শুধু তাই নয় এই নির্লজ্জ অহিন্দু ইস্কনের ব্যাক্তিকে অনলাইনে ইস্কনেরই কিছু সদস্য নির্লজ্জ ভাবে সমর্থন দিচ্ছে এবং এর যাবতীয় দোষ ঢাকার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে। 

এদের মতনই আরেক বিভেদবাদী হল দয়ানন্দ সরস্বতীর আর্য সমাজ। এদের অনেক সদস্যই অদ্বৈতবাদের বেসিক না জেনেই একে খন্ডাতে এসে হোঁচট খেয়েছে। এদের একজনের বাতুলতার প্রশ্নে আজকের এই লেখা। 

মুল পোষ্টের লিঙ্ক নিম্নে ( https://www.xn--45baaj2aiao5xbdb.com/2020/12/blog-post_18.html?m=1) 


এবার আমাদের উত্তরের পালা। অনেক বড় এবং শাস্ত্রীয় অনেক ট্যাকনিকাল ভাষা ব্যাবহার করা হয়েছে তাই ধৈর্য্য ধরে জিজ্ঞাসু চোখকে পড়ার অনুরোধ রইলো।  

চলুন শুরু করা যাক।  


দাবী

স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী অমর গ্রন্থ সত্যার্থ প্রকাশে বলেছেন 


জীব ও ব্রহ্মের একতা এবং জগৎ মিথ্যা ইত্যাদিরূপ যে শঙ্করাচার্য্যের মত ছিল তাহা উৎকৃষ্ট মত নহে,তবে যদি শঙ্করাচার্য্য জৈনমত কন্ডনের নিমিত্ত উক্ত মত স্বীকার করিয়া থাকেন তবে অপেক্ষাকৃত ভাল। নবীব বেদান্তীদিগের মতে জগৎ স্বপ্নবৎ,রজ্জুতে সর্প,শুক্তিকায় রজত,মৃগতৃষ্ণিকায় জল,গন্ধর্ব্ব নগর এবং ইন্দ্রজালের সদৃশ এই সংসার মিথ্যা এবং এক ব্রহ্মই সত্য। বাস্তবে নবীন বেদদন্তীগন রজ্জুকে বস্তু এবং সর্পকে অবস্তু মনে করিয়া এই ভ্রমজালে পতিত হইয়াছে। প্রশ্ন আসে সর্প কি বস্তু নহে..? যদি বল রজ্জুতে উহা নাই, তবে দেশান্তরে আছে উহার সংস্কার তোমার হৃদয়ে আছে" অতএব সর্প ও আর অবস্তু রহিলনা । এইরূপ স্থানুতে পুরুষ এবং সুক্তিকায় রজত ইত্যাদির; ব্যবস্থা বুঝিয়া লইতে হইবে। স্বপ্নাবস্থায়ও যাহার ভান (জ্ঞান) হয়, তাহা দেশান্তরে আছে এবং তাহার সংস্কার মনেও (আত্মাতেও) আছে। সুতরাং স্বপ্ন ও বস্তুতে অবস্তুর আরোপণের তুল্য নহে। অত্বৈত্যবাদী দের মতে রজ্জুতে সর্প তিন কালেই নাই অথচ অন্ধকার এবং অল্প প্রকাশের সংযোগে অকস্মাৎ রজ্জুর দর্শন হইলে সর্পভ্রম উপস্থিত হইয়া ভীতিবশতঃ কম্প উপস্থিত হয়। পরে যখন দীপাদি দ্বারা দেখা যায় তখন উক্ত ভয় এবং ভ্রম নিবৃত্ত হইয়া যায়; তদ্রূপ ব্রহ্মে জগতের মিথ্যা প্রতীতি হইয়াছে। ব্রহ্মের সাক্ষাৎকার হইলেই জগতের নিবৃত্তি এবং ব্রহ্মের প্রতীতি হইয়া যায়, যে রূপ সর্পের নিবৃত্তি 


এবং রজ্জুর প্রতীতি হইয়া থাকে। 


উত্তরঃ


এত মাত্রাতিরিক্ত বানানে ভুলে লেখা প্রশ্ন কি তা বুঝতেই মগজ থেকে রক্ত বের হচ্ছে।ধরে নিলাম এখানে তার প্রশ্ন নাই বা থাকলেও সেটা হচ্ছে সত্য বস্তুরই ভ্রম হয় এই। সেরকম কিছু হলে

তিনকালে যা একরূপ থাকে তাই সত্য। বস্তু শব্দে এই আত্মাকে বোঝায়।ব্যবহারিক সত্তা প্রতীত হলেও এদের কালত্রয়ব্যাপী একরূপতা নাই বলে মিথ্যা,অবস্তু। উপমার ক্ষেত্রে রজ্জু ও সর্প উভয়েই ব্যবহারিক সত্তা।একটিকে অপরটি বলে ভুল হয়। এই একের রজ্জুর সত্যজ্ঞান নাহলে সাদৃশ্যবশত অপরের আরোপ হয়।এই অধ্যারোপ দাষ্টার্ন্তিক থেকে বুঝতে পারি সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মে অর্থাৎ বস্তুতে,অজ্ঞানাদি সকল জড়বস্তুর আরোপ।জড়পদার্থাদির তিনকালে একরূপতা নাই বলে অবস্তু।

তাছাড়া আরোপ হতে গেলে যে পূর্বের সত্যবস্তু থাকতেই হবে,এমন কোন নিয়মও নাই। কারণ সংশয় বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে বস্তুশূন্য ভ্রমও হয়।মানুষ ভাবে হায়রে আগেও এভাবের ভুল হয়েছিল  এটা স্থাণু না পুরুষ ধ্যাৎ এখনো সেই ভুল হলো। এভাবে বস্তুশূন্য ভ্রম পরম্পরায় অধ্যারোপ হয়।সুতরাং ব্রহ্মে জগদভ্রমের ক্ষেত্রে পূর্বের সত্য জগতের অস্তিত্ব ধরতে হবে এমত টেকে না। কারণ অসত্য জগতের ভ্রমসংস্কারবশত পরবর্তী কালের দৃষ্ট জগৎকে সত্য বলে ভুল হয়।

এছাড়া মনে রাখতে হবে ব্রহ্মে অজ্ঞানের আরোপকে আমরা অনাদি বলেছি।ব্রহ্মে অজ্ঞানের আরোপ হল কারণ নিরপেক্ষ ও অনাদি।আরো মনে রাখা উচিত অধ্যারোপ প্রসঙ্গে সর্বত্র অধিকসত্তাক বস্তুতে  ন্যূনসত্তাক বস্তুর আরোপ হয়। যেমন রজ্জু সর্পের তুলনায় রজ্জুর সত্তা অধিক,কারণ যখন এটা সর্প নয়,রজ্জু এমন জ্ঞান হয় তখন পূর্বক্ষণে থাকা সর্পজ্ঞান বাধিত হয়ে যায়। তেমনি সংসার দশায় রজ্জুর জ্ঞান বাধিত হয় না রজ্জুসর্পের তুলনায় রজ্জু অধিকসত্তাক এবং রজ্জুর তুলনায় ব্রহ্ম অধিকসত্তাক। অতএব ব্রহ্মে রজ্জু অধ্যস্ত এবং রজ্জুতে সর্প অধ্যস্ত। দেখা যাচ্ছে—প্রাতিভাসিক সদ্বস্তু ব্যবহারিক সদ্বস্তুতে আর ব্যবহারিক সদ্বস্ত পারমার্থিক সদ্বস্তুতে আরোপিত হচ্ছে। বেদান্তের মতে আমরা জানি যে, ব্রহ্ম পারমার্থিক সৎ, জগৎপ্রপঞ্চ ব্যাবহারিক সৎ এবং স্বাপ্ন প্রপঞ্চ প্রাতিভাসিক সৎ।


এবার আরো কিছু বিষয়ে বলি জগৎ সমস্ত কিছু পারমার্থিক সত্য হয়।তাহলে বন্ধনও পারমার্থিক সত্য!অনেকে অদ্বৈতবেদান্তবিরোধী আচার্যের মতে পারমার্থিক হলেও নিবৃত্ত হয়।কিন্তু ভুলে যায় পারমার্থিক সত্য তাকেই বলে যে কোনো কালে কোনপ্রকারেই কারোর বাপের হেডম নাই তাকে নিবৃত্ত করার যেমন ব্রহ্মবস্তু। তার ভিন্ন সমস্ত জগৎ ও জাগতিক বন্ধন ও দুঃখাদি,যাদের অস্তিত্ব সত্য বলে প্রতিভাত হয় এবং যারা নিবৃত্ত হয় তারা লৌকিক পারমার্থিক বা ব্যবহারিক। যেসমস্ত মিঞ্চারা এই প্রকার অঙ্গীকার না করলে জগৎ এবং বন্ধন ও সুখদুঃখাদি জাগতিক পদার্থসকল পরমার্থসত্য ব্রহ্মবস্তুর সাথে সমসত্তাযুক্ত হয়ে পড়বে,ফলে তাদের বাধ বা নিবৃত্তি সম্ভব হবে না।কারণ সমসত্তাযুক্ত পারমার্থিক সত্য ব্রহ্মবস্তুর নিত্যতা এবং তার সমসত্তাযুক্ত পারমার্থিক সত্য জগৎ ও সত্য বন্ধনের অনিত্যতা অঙ্গীকারে "অর্দ্ধজরতীয়ন্যায়" প্রসক্ত হয়ে পড়বে। সেই অদ্ভুত বানানে ভুলে ভরা ব্লগারকে হয় " অর্দ্ধজরতীয়ন্যায়" অঙ্গীকার করতে হবে,অথবা জগৎ ও বন্ধনাদি জাগতিক পদার্থের "লৌকিক পারমার্থিকত্ব" স্বীকার করতে হবে। অন্য উপায় নাই। ফলে জগৎ ও জাগতিক পদার্থসকলের অপারমার্থিকত্ব,সুতরাং মিথ্যাত্বই বেচারিদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও স্বীকার্য।জ্ঞানের দ্বারা অজ্ঞানই নিবৃত্ত হয় এটাই বস্তুর স্বভাব। পারমার্থিক সত্য বস্তু,যা অজ্ঞানের কার্য্য তা জ্ঞানের দ্বারা কিপ্রকারে নিবৃত্ত হবে? শ্রীভগবানের প্রসাদে নিবৃত্ত হলেও তার সত্যতা ব্যাবহারিক হবে, পারমার্থিক না।


 


দাবী

মিথ্যা থেকে সত্যে পৌঁছানো যায় কিভাবে?এরকম অনেকের প্রশ্ন আসতে পারে



উত্তরঃ 


এখানে ছোট্ট করে সংকেতে উত্তর দিয়ে দিচ্ছি  ব্যাবহারিক জীবনে অনেক সময় মিথ্যা বস্তু-বোধ এবং অসত্য দর্শনকেও সত্য, শুভ ফলের জনক হতে দেখা যায়। দৃষ্টান্ত-স্বরূপে চিৎসুখ বলেন যে, কোনও উজ্জ্বল মণির ভাস্বর জ্যোতিঃপুঞ্জকে মণি-ভ্রম করে যদি কোন ভ্রান্তদর্শী মণি আহরণ করবার উদ্দেশ্যে ধাবিত হয়, তবে, সে সেখানে মণিটি অবশ্যই পাবে, এবং ঐ মণির দ্বারা জীবনে অনেক কাজও করতে পারবে। এখানে কিন্তু সে মণি দেখে মণি আহরণ করবার জন্য প্রবৃত্ত হয় নাই, মণির উজ্জ্বল জ্যোতিকে মণি ভ্রম করে ধাবিত হয়েছে। ভ্রমই যে এখানে তাঁর স্বার্থ-সিদ্ধির অনুকূল হয়েছে, এটা অস্বীকার করবার উপায় নাই। এরূপ আরও অনেক বিভ্রম দেখা যায়, যাহা ভ্রম হলেও ব্যাবহারিক জীবনে তার কার্যকারিতা কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তিই অস্বীকার করতে পারেন না। পৃথিবী বস্তুতঃ সচলা হইলেও পৃথিবী অচলা; পৃথিবী ঘোরে না, সূর্য্য পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াইতেছে, এরূপ অন্ধ বিশ্বাস কত যুগ যুগান্ত ধরে কত মানুষের চিত্তকে অধিকার করে আছে, এবং ঐরূপ মিথ্যা বিশ্বাস-মূলে কত কাজ কত ভাবে মানুষ করে চলেছে। জীবণে গতিপথে তাঁর ঐ মিথ্যা জ্ঞান তাঁকে নানা প্রকারে সাহায্যই করেছে; জীবনের গতিতে কোনরূপ বাধার সৃষ্টি করে নাই। সুতরাং কেমন করে বলব যে, মিথ্যার কোন প্রকার কার্যকারিতা নাই।





দাবী


এখন কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা দরকার যেমন ব্রহ্মে জগতের ভান কাহার হইয়াছে? নিশ্চয় জীবের এবং এই ভান (জ্ঞান) অজ্ঞানতার কারনে হয়। ইহাও বিচার্য অজ্ঞানতা কোথা হইতে হইয়াছে এবং কোথায় রহিয়াছে..? যদি বল অজ্ঞান অনাদি এবং ব্রহ্মে অবস্থান করে তাহলে 

ব্রহ্মে ব্রহ্ম বিষয়ক অজ্ঞান হইল অথবা অন্য কোন বিষয়ের অজ্ঞান হইল এবং ঐ অজ্ঞান কাহার হইল..?

অবিদ্যা কি সর্ব্বব্যাপী সর্ব্বজ্ঞের গুণ, নিশ্চয় নয় তা অল্পজ্ঞের গুণ হওয়া স্বাভাবিক। তাহা হইলে এক অনন্ত সর্ব্বজ্ঞ চেতন ব্যাতিরেকে অন্য কোন চেতন সত্ব্যার প্রমান মেলে। যদি অল্পজ্ঞ চেতন ব্রহ্ম হইতে ভিন্ন বলিয়া বিশ্বাস কর তাহা হইলে সমীচীন হয়। যদি এক স্থানে ব্রহ্মে অপনার স্বরূপ সম্বন্ধীয় অজ্ঞান হয় তাহা হইলে উক্ত অজ্ঞান সর্ব্বত্র বিস্তৃত হইয়া পড়ে। যেরূএ শরীরের (এক স্থানর) বিষ্ফোটকের পীড়া সমস্ত শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে আতুর অপটু করিয়া দেয় তদ্রুপ,ব্রহ্ম ও একদেশে অজ্ঞানী এবং ক্লেশযুক্ত হইলে সমস্ত ব্রহ্মই অজ্ঞানী এবং পীড়াভবনুযুক্ত হইয়া পড়ে


উত্তরঃ


এ ব্লগারের লেখা দেখে বুঝলাম ব্যাক্তি অদ্বৈতবাদ নিয়ে যখন ভূমিকা লিখছিল তা না বুঝে কপি পেস্ট মেরে দিয়েছে। নইলে খণ্ডনের বেলায় এরকম আউল ফাউল লেখার কথা না।

একই চৈতন্য মায়াপ্রতিবিম্বে ঈশ্বর,অবিদ্যাপ্রতিবিম্বে জীব। ঈশ্বর মায়াধীশ,জীব মায়ার অধীনে। বেশি না পঞ্চদশী গ্রন্থ খুলে পড়তে পারেন।

এবার বলি এ মহান দ্বিগিজয়ী পণ্ডিত ব্যক্তি ভক্তশ্রেষ্ঠ জগৎগুরু শ্রীরামানুজাচার্যের থেকে কপি পেস্ট মারার চেষ্টা করছে কিন্তু মডিফাই করতে গিয়ে পুরো বর্বাদ করে দিয়েছে  এককথায় লাইন ছাড়া কথাবার্তা হয়ে গেছে,অথবা নিজেই এরকম অদ্ভুত প্রশ্ন করে রেখেছে।কারণ অদ্বৈতবাদকে আঘাত দিতে গিয়ে বিশিষ্টাদ্বৈতাবাদী, ভেদাভেদবাদী পরিণামবাদীদের আঘাত দিয়ে ফেলেছে। গোমূ% হলে যা হয়। 

ব্রহ্ম অবিদ্যার আশ্রয়। যখন ব্রহ্মকে অবিদ্যার আশ্রয় বলা হয়--তখন সেটাও বলা হয় এই অবিদ্যা মিথ্যাবস্তু,সুতরাং তাতে ব্রহ্মের কোন অন্যথাভাব বা অসঙ্গত্বের হানি হয় না।যেটুকু যা বোধ হয়,তাও মিথ্যাই হয়। আর হ্যাঁ ব্রহ্মের সত্তা ও অবিদ্যার সত্তা সমান না।ব্রহ্ম তিনকালেই একরূপে বর্তমান,আর অবিদ্যা বর্তমানকালে মাত্র বর্তমান বলে বোধ হয়,অর্থাৎ তার প্রতীতি হয় বলে তাকে সৎ বলা হয়।কিন্তু ব্রহ্ম সৎ ই।সুতরাং হে মহাপণ্ডিত ব্রহ্মের সাথে অবিদ্যার বিরোধ কোথায়?রজ্জুকে যে সর্প আশ্রয় করে তাতে কি রজ্জুর সাথে বিরোধ হয়?অবিদ্যা যদি ব্রহ্মের ন্যায় সদ্বস্তু হতো,তা হলে আপনার আজাইরা আপত্তি মানা যেত।

এবার বলি জ্ঞান ও অজ্ঞানের বিরোধ তা বৃত্তিজ্ঞানের সম্বন্ধেই অদ্বৈতবাদী বলেন।যেমন ঘটজ্ঞানকালে ঘটবিষয়ক অজ্ঞান থাকে না,অর্থাৎ ঘটাকার বৃত্তিজ্ঞান ঘটবিষয়ক অজ্ঞানের বিরোধী। ব্রহ্ম তদ্রূপ অজ্ঞানের বিরোধী না,কিন্তু ব্রহ্মবিষয়ক বৃত্তিজ্ঞানই সেই ব্রহ্মবিষয়ক অজ্ঞানের বিরোধী। আর এই ঘটবিষয়ক বা ব্রহ্মবিষয়ক জ্ঞানের পূর্বে ঘটবিষয়ক বা ব্রহ্মবিষয়ক অজ্ঞানই থাকে বলে ঘট বা ব্রহ্ম সেই অজ্ঞান দ্বারা আবৃত বা তিরোহিত বলা হয়। 

যেমন রজ্জুবিষয়ক অজ্ঞান রজ্জুকে তিরোহিতই করে রাখে। কিন্তু বস্তুতঃ রজ্জু তিরোহিত না; তদ্রূপ ব্ৰহ্ম কখনই যথার্থরূপে তিরোহিত না। শুদ্ধ ব্রহ্মে অবিদ্যা কোন কালেই নাই। শুধু প্রপঞ্চদর্শনকালে মিথ্যা সম্বন্ধেই অবিদ্যা স্বীকার করা হয়; আর সেজন্যে তার দ্বারা ব্রহ্মের তাদৃশ তিরোধান হবে না কেন? 

ব্রহ্ম অল্পজ্ঞ হয়ে যাবে ব্রহ্মের হেন হবে তেন হবে এভাবে পারমার্থিক,ব্যবহারিক সব গুলিয়ে ফেললে বড় সমস্যা।

ভ্রম কার? আপনার এই প্রশ্ন দেখেই বুঝা যাচ্ছে ব্যবহারিকের সাথে পারমার্থিকের ভালো খিচুড়ী পাকিয়েছেন।

ভ্রম জীবের। ব্যবহারিক দশাতে যত কল্পনা,ভ্রম,সত্তা,ঈশ্বর,জীব ইত্যাদি এসব। পরমার্থে ব্রহ্ম ব্যতীত কিছুই নেই।তাই এত ভয়ের কিছু নেই।

এরপরের যে পীড়ার কথা বলেছেন যারা পরিণামবাদ স্বীকার করে বা অংশাঅংশী স্বীকার করে বা পারমার্থিক অবিদ্যা স্বীকার করে এসব তাদের এসব প্রশ্ন করেন। 

এখন অনেকের মাথায় এ প্রশ্ন আসতে পারে যেমনটি ব্লগারটির মাথায়ও এসেছে


দাবী

যদি বলা হয় ব্রহ্ম,নিজ ব্রহ্মবিষয় অজ্ঞান হইয়া অর্থাৎ আপনার স্বরূপকে আপনিই ভুলিয়া যান তাহলে তাঁহার ভ্রম হইবার নিমিত্ত কারন অবিদ্যা..!!??


সহজ ভাষায় সে প্রশ্নটি এরকম, সেটি হচ্ছে "অবিদ্যাকে যতই তুচ্ছ বলুন, ব্রহ্মে তা মিথ্যাসম্বন্ধে থাকলেও তার সেই মিথ্যাসম্বন্ধই বা কেন?  শুদ্ধব্রহ্মে প্রতীত হল কেন—এই প্রশ্নের উত্তর কি হতে পারে?


উত্তরঃ 


যতক্ষণ প্রতীত ততক্ষণ এই প্রশ্ন। জাগ্রতাবস্থায় যেমন স্বপ্ন বিষয়ে ‘কেন হইল' প্রশ্ন হয় না—এটাও সেরকম ভ্ৰমান্তে যেমন ‘কেন ভ্রম হল' প্রশ্ন হয় না—এটাও সেরকম। অবিদ্যা এই প্রকার স্বভাবাপন্ন। স্বভাবের উপর প্রশ্ন করলে কে কি উত্তর দিবে? অবিদ্যা এই প্রকারই বলে জানতে হবে।


“আচ্ছা, আপনার ঈশ্বর লীলাময় কেন??" —বললে আপনি কি উত্তর দিবেন? প্রশ্ন তো পাগলেও করে। আর তার কি উত্তর আছে?

 ব্রহ্মাশ্রিত অবিদ্যা এই ভাবে সংসার প্রদর্শন করে এবং ব্রহ্মজ্ঞানে তা বিলুপ্ত হয়; তার বীজ ছিল না এবং বিনাশেও কিছু থাকিবে না—এটাই তাহার স্বভাব; এটা এজন্য অনির্বচনীয়। এতাদৃশ অবিদ্যাদ্বারা ব্রহ্ম সবিশেষ কিরূপে হবেন? যেরূপ সত্তা স্বীকার করিয়া ব্রহ্মে এটা‘কেন প্রতীত হল’ জিজ্ঞাসা করছেন, তাতে ব্রহ্মে এটা প্রতীত হয় নাই বলতেও পারা যায়।”


যারা অদ্বৈতবেদান্তী পণ্ডিত তারা এ নিয়ে আরো ভালো বলতে পারবে। শিবের নাম করে যা অল্প জানি তা থেকেই দিলাম ভুলত্রুটির জন্য অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।


হর হর মহাদেব

ওঁ নমঃ শিবায়



Tuesday, April 5, 2022

পরমেশ্বর শিব কি কারো উপাসনা করেন?

 ইদানিংকালে কিছু শিব বিদ্বেষীদের দাবী যে মহাদেব নাকি বিষ্ণুর ধ্যান করেন, আবার কিছু কিছু উগ্র রামায়েতের দাবী মহাদেব পঞ্চমুখে রাম নাম করেন, কিছু কৃৈষ্ণবদের দাবী মহাদেব নাকি পঞ্চমুখে হরি নাম করেন। যদিও কোন বৈদিক রেফারেন্স দেখাতে বললে এরা জোড়াতালি মারে বা গালাগালিতে নেমে আসে। 

আসুন আজ এই বিষয়ে আলোকপাত করবো। আমরা জানি পরমেশ্বর মহাদেবের অনেক অবতার আর অনেক রূপ। সদা শিব বা শাম্বা শিবা কখনও কারো নাম করেন না কারণ উনিই হলে জগতের আদি কারণ এবং উনার থেকেই ব্রম্মা বিষ্ণু রুদ্রের সৃষ্টি। এবার অনেকেই এখানে পদ্মপুরাণের রেফারেন্স টেনে বলবেন যে পরমেশ্বর শিব হরি নাম করেন। আসলে ইনি শিব নন। ইনি হলেন প্রভু পরমেশ্বর শিবের কালরুদ্র রূপ। যিনি আর কেউ নন পরমেশ্বরের অবতার। 
পদ্ম পুরাণের পাতাল খন্ডের ১১৪ অধ্যায়ের ২৪৭ নং শ্লোকে এবং একই ব্যপার নারদ পুরাণের পুর্ব ভাগের৭৯ অধ্যায়ের ২০০তম শ্লোকেও পরমেশ্বর শিব বলেছেন " বাস্তবে আমি কারো উপাসনা করি না ।

যাইহোক অধিকাংশ কৃৈষ্ণব পন্ডিত আমাদের স্মৃতি বা ইতিহাস থেকে প্রমান দেখান যে মহাদেব হরি থেকে সৃষ্টি এবং উনার ললাট থেকে উৎপন্ন । এই ক্ষেত্রে মহাভারতের অনুশাসন পর্বের শ্লোকটি যা দেখানো হয় তা নিম্নে স্ক্রীনশটঃ


 

















এইবার আসুন স্মৃতি শাস্ত্র থেকেই আমরা দেখে নেই এর খন্ডন। 

মূর্খ কৃৈষ্ণবরা সবসময় অর্ধেক পড়ে বাকি অর্ধেক ছেড়ে দেয় বা লুকায়। এটা তাঁদের পুরানো স্বভাব এবং এদের তথাকথিত গুরুরাও এই কাজ করে সনাতনীদের বিভ্রান্ত করে গেছেন। কেন এই কথা বলছি আসুন একই পর্বের শুরুর দিকে তাকাই। 

মহাভারতের অনুশাসন পর্বের ১৩ নং অধ্যায়ে পিতামহের উক্তি স্ক্রিনশট


অর্থ্যাৎ প্রভু শিব শ্রীবিষ্ণুর ( হরির ) সৃষ্টিকর্তা। এবং খেয়াল করে দেখুন উনাকে অক্ষর ব্রহ্ম ( ওঁ) এর স্বরুপ বলা হচ্ছে। 

তাইতো ঋষি মার্কেন্ডেয় বলেছেন 

ওঁ ওঁ 

ওঁঙ্কারম্‌ সৃষ্টিসারম্‌ বিধিবিধি লিখিতম্‌ মোক্ষদক্ষসম্‌ সুবিক্ষম ।

গমগংগম দিব্যলিঙ্গম্‌ গজমুখ বিনুতম স্বর্ণাপূর্ণা সমক্ষসম। 

বেদার্থম্‌ ব্যাসপীঠম্‌ সুর মুনি সহিতম শান্তিকান্তমসুখান্তম। 

বিশ্বশ্বেম্‌ চিৎপ্রকাশম স্মৃতিজন বরদম কাশীনাথম নমামি। 

ওঁ ওঁ ।


এবার আসুন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ কি বলছেন দেখে নেয়া যাক ! 

মহাভারত অনুশাসন পর্ব ১৩/ ২১-২৪


এবার আসুন বৈষ্ণব পুরাণ আর স্মৃতি থেকে দেখা যাক !  


পদ্ম পুরাণ পাতাল খন্ড, ১১৪ নম্বর অধ্যায় ২৪৭ থেকে ২৫৪ নং শ্লোক দেখুন। যদিও বাংলা কোন ভার্সনে এই শ্লোক দেখা যায় না। বাংলা বৈষ্ণব ভাইজানেরা কেটে দিয়েছেন উনারা। প্রভু পরমেশ্বর শিব কারো উপাসনা করেন না। বরং উনাকেই সবাই উপাসনা করেন।





পদ্মপুরাণ/উত্তর খণ্ড/১৭৫ নং অধ্যায় । এখানে শ্রী নারায়ন দেবী লক্ষীকে বলছেন।


শ্রীভগবানুবাচ্ –

" নাহং সুমুখি নিদ্রালুর্নিজং মাহেশ্বরং বপুঃ |

দৃশাতত্ত্বানুবর্ত্তি ন্যাপশ্যাম্যংতর্নিমগ্নযা || ৭ ||

কুশাগ্রয়াধিযা দেবি যদংতর্যোগিনোহৃদি |

পশ্যন্তি যচ্চ বেদানাং সারং মীমাংসতেমৃশম্ || ৮ ||

তদেবমক্ষরং জ্যোতিরাত্মরুপমনামযম্ |

অখংডানংদ সংদোহনিষ্পাদিদ্বৈতবর্জিতম্ || ৯ ||

যদাশ্রয়া জগদ্বৃত্তির্যন্ময়াচানুভূযতে |

নযেনরহিতংকিংচিতজ্জগত্তত্বং চরাচরম্ || ১০ || "

বঙ্গানুবাদ –

উত্তরে ভগবান বিষ্ণু বলেন – হে সুমুখি! আমি কদাপি শয়ন করি না। আমি ধ্যান নেত্রে (নিজেরই অন্তরস্থ) আত্মস্বরূপ মহেশ্বরকে অনুভব করে থাকি। হে দেবি! কুশাগ্রের ন্যায় (তীক্ষ্ণ) (দৃষ্টিসম্পন্ন) যোগীগণ নিজের হৃদয়ে সেই মহেশ্বরকেই অনুভব করে থাকেন। (সকলের হৃদয়ে অবস্থিত সেই অখণ্ড চৈতন্য) সমগ্র বেদের সার এবং মীমাংসা স্বরূপ। সেই দেব (মহেশ্বর) অক্ষর, জ্যোতিরূপ, অরূপ এবং অনামেয়।তিনি অখণ্ড, অনন্ত এবং অদ্বৈত(অদ্বিতীয় পরমেশ্বর)। যার আশ্রয়ে সমগ্র জগৎ, যাকে আমিও(শ্রীবিষ্ণু) অনুভব করে থাকি (ধ্যাননেত্রে), যার বিনা এ জগত-চরাচরের কোনো অস্তিত্বই নেই।












পদ্ম পুরাণে এরপর দেবী লক্ষী-নারায়ণের আরও কথোপকথন আছে। চলুন দেখে নেই। 

লক্ষ্মীদেবী বললেন, আপনিই তো জগতের প্রভু তথা সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহার কর্তা। তো আপনার চেয়েও পরমতম তত্ত্ব আর কিই বা আছে? হে অচ্যুত! যদি কেউ থেকেও থাকে তবে তার সম্পর্কে জানতে আমি কৌতুহলী। 

তখন  ভগবান বিষ্ণুদেব বললেন , আমার এই দেহ মায়ার তৈরি। সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের মায়াজালে আবদ্ধ আমার দেহ(বিষ্ণুরূপীদেহ)।কিন্তু আমার আত্মরূপ (অর্থাৎ আত্মা)এই মায়াদেহ হতে পৃথক, সেটি অদ্বৈত, বিকাররহিত, আদি-অন্ত শূণ্য এবং ভাব-অভাব এবং অদ্বৈত এরও উপরে। সেই আত্মা শুদ্ধ সম্বিত্ স্বরূপ(পরাচৈতন্য), পরমানন্দময় এবং সুন্দর। আত্মস্বরূপ সেই ঈশ্বরই (পরমেশ্বর) গীতার(ভগবদ্গীতা) দ্বারা ব্যক্ত হয়েছে।

একই কথা কিন্তু আদিগুরু শংকরও বলেছেন 

কাজেই এইটা পরিস্কার যে শ্রী হরির শরীর জড় এবং উনি তা নিজ মুখেই মাতা লক্ষীকে বলেছেন। 



এবার আসি কৃৈষ্ণবদের প্রাণভোমরা ভাগবত নিয়ে ।। 


ভাগবত মহাপুরাণের চতুর্থ স্কন্ধের ষষ্ঠোহধ্যায়ের ৪২ নং শ্লোকে প্রজাপতি ব্রহ্মা বলেন -


জানে ত্বামীশং বিশ্বস্য জগতো যোনিবীজয়োঃ । 

শক্তেঃ শিবস্য চ পরং যত্তদব্রহ্ম নিরন্তরম ।। 


অর্থ - ব্রহ্মা বললেন হে মহাদেব! আমি জানি আপনি সমগ্র বিশ্বের অধীশ্বর, কারণ জগতের যোনিস্বরূপ যে শক্তি (প্রকৃতি) এবং বীজস্বরূপ যে শিব (পুরুষ) তা আপনিই এবং আপনিই অতীত নির্বিকার একরস পরব্রহ্ম স্বরূপ ।।
















এখানেই শেষ না আরও আছে ফ্রবু !! 



এবার মহাভারতের দিকে তাকাই? আসুন সেখানে প্রভু পরমেশ্বর শিবকে নিয়ে কি বলা আছে দেখা যাক ! 

এখানে  স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বলছেন প্রভু পরমেশ্বর শিব হলেন সবার আরাধ্য ! 

তবে এখানে কেউ কেউ কৃষ্ণকে ছোট করতে গিয়ে মহাদেবকে বড় করছি এমন যাতে না ভাবেন সেখানে আমার আরও কিছু প্রমাণ। কারণ দ্বৈতবাদী কৃৈষ্ণবরা অসুর হলেও আমরা শৈবরা ভেদ মানি না।

এখানে অন্যতম পান্ডব শ্রী অর্জুন কি বলছেন দেখুন। মহাদেবকে পুজা করে উনি প্রভুর মাহাত্ম্য বর্ণনায় বলেছেন । যিনিই বিষ্ণু তিনিই শিব আবার যিনি শিব তিনিই বিষ্ণু। এরা অভেদ এবং এদের মাঝে কোন



 ভেদ নেই। 


শেষ করছি কিছু শ্রুতি প্রমাণ দিয়ে।  

অজাত ইত্যেবং কশ্চিদ্ভীরুঃ প্রপদ্যতে।
রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখং তেন মাং পাহি নিত্যম্ ।। (শ্বেতশ্বতর-৪/২১)
অর্থাৎ : হে রুদ্র, তুমি মৃত্যুঞ্জয়। যে জন্মাদি মৃত্যুভয়ে ভীত সেই তোমার শরণ নেয়। তোমার প্রসন্ন মুখ আমার দিকে ফেরাও এবং নিয়ত আমাকে রক্ষা কর।


একো হি রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্থূঃ য ইমান্ লোকান্ ঈশত ঈশনীভিঃ।
প্রত্যক্ জনান্ তিষ্ঠতে সঞ্চুকোপান্তকালে সংসৃজ্য বিশ্বাঃ ভুবনানি গোপাঃ।। (শ্বেতাশ্বতর-৩/২)

অর্থাৎ : এক সেই পরমেশ্বর কে, যাঁর দ্বিতীয় কেউ নেই ? তিনি হলেন রুদ্র। প্রতি জীব-হৃদয়ে তাঁর অবস্থান– তাই পরমাত্মা। তিনিই তাঁর সেই ঐশ্বরিক শক্তি-বুদ্ধি দিয়ে জগৎকে শাসন করছেন। সেই শক্তির কোন ব্যাখ্যা চলে না। ব্রহ্মাণ্ডকে সৃষ্টি করে প্রতিটি মানুষের অন্তরে তিনি অবস্থান করছেন, আবার গোপা অর্থাৎ রক্ষাও করছেন। আবার অন্তিমকালে এলে সংহার-মূর্তিতে তিনিই সব সংহার করছেন।


সর্বাননশিরোগ্রীবঃ সর্বভূতগুহাশয়ঃ।
সর্বব্যাপী স ভগবান্ তস্মাৎ সর্বগতঃ শিবঃ।। (শ্বেতাশ্বতর-৩/১১)
অর্থাৎ : তিনি সর্বানন– জগতের সব মুখই তাঁর মুখ। জগতের প্রাণীমাত্রেরই মাথা, গলা– তাঁরই শির-গ্রীবা। প্রাণীর ভেতরে সেই গুহা, যার নাম বুদ্ধি, তিনি আছেন সেই গুহায়। সর্বব্যাপী এবং সর্বগত শিবস্বরূপ মঙ্গলময় তিনি ভগবান।


--- সর্বভূতে সমগ্র জীবেদের মুখ, গলা, ঘাড় রূপে সেই সর্বব্যাপী শিবই আছেন এবং তিনিই প্রত্যেকের হৃদয়গুহায় প্রত্যগাত্মারূপে বিরাজিত।

সব শেষে পবিত্র অথর্ব্বশির থেকে একটি স্ক্রিনশট! 
বোঝাই যাচ্ছেন প্রভু পরমেশ্বর শিব হলেন অদ্বিতীয় পরমেশ্বর যার থেকে আমি আপনি এমনকি সকল অবতারের সৃষ্টি। 



সকল কৃৈষ্ণবের মানসিক সুস্থতা কামনা করছি প্রভু পরমেশ্বরের কাছে। 
নমঃ শিবায়।। 









'অচিন্ত্যভেদাভেদ' পদের কতিপয় যৌক্তিক অসঙ্গতি বিংশ শতাব্দীর অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি পর্যালোচনা

  ভূমিকা গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের কেন্দ্রীয় মতবাদ হলো 'অচিন্ত্যভেদাভেদ'। শ্রীচৈতন্যের ভাবধারা থেকে উদ্ভূত এই দার্শনিক অবস্থানটি ঈশ্...

Popular Posts