Monday, June 8, 2026

'অচিন্ত্যভেদাভেদ' পদের কতিপয় যৌক্তিক অসঙ্গতি বিংশ শতাব্দীর অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি পর্যালোচনা

 

ভূমিকা

গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের কেন্দ্রীয় মতবাদ হলো 'অচিন্ত্যভেদাভেদ'। শ্রীচৈতন্যের ভাবধারা থেকে উদ্ভূত এই দার্শনিক অবস্থানটি ঈশ্বর ও জীব, ঈশ্বর ও জগৎ, শক্তি ও শক্তিমানের মধ্যে একইসঙ্গে ভেদ ও অভেদ বিদ্যমান বলে দাবি করে এবং এই সম্পর্ককে 'অচিন্ত্য' বা মানববুদ্ধির অতীত বলে ঘোষণা করে। কিন্তু এই মতবাদটি আসলে কতটা সুসংগত এবং দার্শনিক দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণযোগ্য   এই প্রশ্নটি বিংশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত অদ্বৈত বেদান্তী পণ্ডিত অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে উত্থাপন করেছেন।

পণ্ডিত নিরঞ্জনস্বরূপ ব্রহ্মচারী নবতীর্থ ন্যায়বেদান্তাচার্য   কলকাতার গভর্নমেন্ট সংস্কৃত কলেজের মহাচার্য বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক   তাঁর বাংলা গ্রন্থ 'অদ্বৈতমততিমিরভাস্কর'-এর চতুর্থ ভাগে এই মতবাদের যুক্তিগত বিচার করেছেন। গ্রন্থটি সাধনা-পথ প্রকাশন, কলকাতা থেকে প্রকাশিত। এই চতুর্থ ভাগের মূল লক্ষ্য হলো প্রমাণ করা যে শ্রীচৈতন্য সর্বতোভাবে একজন অদ্বৈতবাদী ছিলেন। সেই উদ্দেশ্যে তিনি ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করার পর 'অচিন্ত্যভেদাভেদ' মতবাদকে যুক্তির কষ্টিপাথরে পরীক্ষা করেছেন। তাঁর মূল অভিমত হলো যে এই মতবাদ যুক্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। সুদীপ্ত মুন্সি তাঁর ইংরেজি প্রবন্ধে এই যুক্তিসমূহের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেছেন।

নিরঞ্জনস্বরূপ ব্রহ্মচারীর যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে 'অচিন্ত্য' শব্দটির অর্থ নিয়ে একটি বিশ্লেষণ। তাঁর মতে এই শব্দটির অর্থ অস্পষ্ট এবং যে কোনো সম্ভাব্য অর্থ ধরেই বিচার করা হোক না কেন, মতবাদটি হয় পরস্পরবিরোধী, নয় বাহুল্যদোষযুক্ত, নয় অদ্বৈত বেদান্তেরই পুনরাবৃত্তিমাত্র। তিনি 'চিন্তা' শব্দের তিনটি সম্ভাব্য অর্থ ধরে পর্যায়ক্রমে এই বিশ্লেষণ পরিচালনা করেছেন।

প্রথম বিকল্প: 'চিন্তা' অর্থে জ্ঞানমাত্র

নিরঞ্জনস্বরূপ প্রথমে অনুমান করেন যে 'অচিন্ত্য' শব্দে 'চিন্তা' বলতে যদি জ্ঞানমাত্র  বোঝানো হয়, তাহলে 'অচিন্ত্যভেদাভেদ' পদের অর্থ দাঁড়ায় এমন একটি ভেদাভেদ সম্পর্ক (ঈশ্বর ও জীব, ঈশ্বর ও জগৎ, শক্তি ও শক্তিমান) যে সম্পর্ক কোনো জ্ঞানেরই বিষয় হতে পারে না। কিন্তু এই অর্থটি গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ জ্ঞানবিষয়তা   একটি কেবলান্বয়ী  ধর্ম   অর্থাৎ এমন একটি গুণ যার অভাব জগতে কোথাও পাওয়া যায় না। পরমেশ্বর সর্বজ্ঞ, তাই অন্তত তাঁর জ্ঞানের বিষয় হতে পারে না  এমন কিছু থাকার কথা নয়।

এখানে একটি সম্ভাব্য আপত্তি উঠতে পারে। নৈয়ায়িকরা আকাশকুসুম, শশশৃঙ্গ ও বন্ধ্যাপুত্রের মতো সত্তাগুলিকে 'অলীক' বলে গণ্য করেন এবং এদের জ্ঞানের বিষয় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেন ( শ্রী মোহন ভট্ট ও দীনেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ভারতীয় দর্শন কোষ ১৯৫৮ সালের ভলিউম-১ এর ২৬ নং দ্রষ্টব্য)। তাহলে কি ভেদাভেদকেও অলীক বলে জ্ঞানের বাইরে রাখা যায়? না, তা যায় না। কারণ নৈয়ায়িকরা নিজেরাও এই অলীক সত্তাগুলিকে সম্পূর্ণ জ্ঞানবহির্ভূত মনে করেন না   তাঁদের মতে এই সত্তাগুলির সম্পর্কেও আহার্যজ্ঞান হওয়া সম্ভব ( শ্রী মোহন ভট্ট ও দীনেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ভারতীয় দর্শন কোষ ১৯৫৮ সালের ভলিউম-১ এর ৪২ নং দ্রষ্টব্য)।

সাংখ্য, যোগ ও অদ্বৈত বেদান্ত  এই তিনটি দর্শন বিষয়টিকে আরও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করে। তাঁদের মতে অলীক সত্তাও 'বিকল্প' নামক একটি চিত্তবৃত্তির বিষয় হয়। পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্রে বলেছেন   'শব্দজ্ঞানানুপাতী বস্তুশূন্যো বিকল্পঃ' (স্বামী হরিহরানন্দের পতঞ্জলি যোগসূত্র ২০১৫ সালের পশ্চিম বঙ্গের রাজ্য পুস্তক হতে প্রকাশিত ৪৩ নং পৃষ্ঠা)। এর অর্থ হলো, কোনো অলীক বস্তুকে বোঝাতে একটি শব্দ উচ্চারণ করলে সেই শব্দ একটি মানসিক বৃত্তি তৈরি করে, যার ফলে আমরা সেই বস্তুটি সম্পর্কে একটি জ্ঞান লাভ করি, যদিও সেই বস্তুর বাস্তব অস্তিত্বের উপলব্ধি হয় না।

এ বিষয়ে একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে। মনে করুন কেউ বললেনঃ

 'এষ বন্ধ্যাসুতো যাতি খপুষ্পকৃতশেখরঃ / কূর্মরোমপটাচ্ছন্নঃ শশশৃঙ্গধনুর্ধরঃ'

অর্থাৎ 'এই বন্ধ্যার পুত্র যাচ্ছে, মাথায় আকাশফুলের মুকুট, পরনে কচ্ছপের লোমের কাপড়, হাতে খরগোশের শিংয়ের ধনুক।'

এই বাক্য শুনলে শ্রোতা হাসেন। কিন্তু কেন হাসেন? কারণ তিনি এই বিষয়টি বোঝেন এবং তার অসম্ভবতা উপলব্ধি করেন। অর্থাৎ অলীক বস্তুর জ্ঞান হয় বলেই এই হাসি সম্ভব। যদি অলীক বস্তু কোনো জ্ঞানের বিষয়ই না হত, তাহলে শ্রোতা হাসতেন না। সুতরাং ভেদাভেদকে অলীক বলা হলেও তার জ্ঞান সম্ভব, এবং তা 'জ্ঞানমাত্রের অবিষয়' এই অর্থে 'অচিন্ত্য' বিশেষণটি প্রযুক্ত হতে পারে না।

দ্বিতীয় বিকল্প: 'চিন্তা' অর্থে সাক্ষাৎকার বা প্রত্যক্ষ

দ্বিতীয় বিকল্পে ধরা যাক 'চিন্তা' মানে সাক্ষাৎকার বা প্রত্যক্ষ অনুভূতি বা সাক্ষাৎনুভূতি। তাহলে 'অচিন্ত্যভেদাভেদ' বলতে বোঝাবে এমন একটি ভেদাভেদ সম্পর্ক যা প্রত্যক্ষের বিষয় নয় ।

কিন্তু এ অর্থটিও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ঘট ও পটের পার্থক্য এবং অনুরূপ দুটি ঘটের সাদৃশ্য এই উভয় ভেদ ও অভেদই প্রত্যক্ষে গম্য (মহামোহপাধ্যায় যোগেন্দ্রনাথ বাগচির সাংখ্যমত সমীক্ষা যা ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত এর ৩৯ থেকে ৪১ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। অতএব ভেদাভেদকে সামগ্রিকভাবে 'প্রত্যক্ষের অবিষয়' বলা চলে না।

এখন যদি বলা হয় যে এই বিশেষণটি ঈশ্বরের অন্তরঙ্গা ও বহিরঙ্গা শক্তির সাথে ঈশ্বরের ভেদাভেদ সম্পর্কে প্রযুক্ত যা সত্যিই লৌকিক প্রত্যক্ষে অগম্য  তাহলেও বিশেষণটি নতুন কিছু প্রতিষ্ঠা করে না। কারণ স্বর্গ বা অন্য যেকোনো অলৌকিক বিষয় লৌকিক প্রত্যক্ষের বিষয় নয় এটি সকলেই স্বীকার করেন। এতে কোনো নতুন দার্শনিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না, ফলে 'অচিন্ত্যভেদাভেদ' নামে কোনো স্বতন্ত্র মতবাদ প্রতিষ্ঠার যুক্তি থাকে না  এটি স্পষ্ট বাহুল্যদোষ।

এই প্রসঙ্গে মহাভারতের ভীষ্মপর্বের একটি বচন উল্লেখযোগ্য   'অচিন্ত্যাঃ খলু যে ভাবাঃ ন তাংস্তর্কেণ যোজয়েৎ।' জীব গোস্বামী তাঁর তত্ত্বসন্দর্ভে ১১ নং অধ্যায়ে এই শ্লোকটি উদ্ধৃত করেছেন (অশোক কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এর ২০১৫ সালে সম্পাদিত শ্রীভাগবতসন্দর্ভে প্রথমঃ সন্দর্ভঃ যা বলদেব বিদ্যাভূষণ ও রাধামোহন গোস্বামী ভট্টাচার্যর সংস্কৃত টীকা এবং নিত্যস্বরূপ ব্রহ্মচারীর বাংলা অনুবাদসহ সম্পাদিত সেখানের ৩১তম পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। কিন্তু এই বচনের 'অচিন্ত্য' শব্দের অর্থ যদি নিরূপিত না হয়, তাহলে সমগ্র বচনটির অর্থই অনির্ধারিত থেকে যায়। বচনের আশ্রয়ে মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে আগে তাতে ব্যবহৃত মূল শব্দের সুনির্দিষ্ট অর্থ নির্ধারণ করা আবশ্যক।


ছবি কৃতজ্ঞতা জেমিনি এ আই


তৃতীয় বিকল্প: 'চিন্তা' অর্থে শব্দেতর প্রমাণজনিত জ্ঞান

তৃতীয় বিকল্পে ধরা যাক 'অচিন্ত্য' অর্থ হলো এমন বিষয় যা শাস্ত্রীয় প্রমাণ ব্যতীত অন্য কোনো প্রমাণ প্রত্যক্ষ বা অনুমান দ্বারা জানা সম্ভব নয়। এই অর্থে স্বর্গ, বৈকুণ্ঠ, গোলোক, কৃষ্ণ, বিষ্ণু, তাঁদের বিগ্রহ ও শক্তি  এ সব কিছুই 'অচিন্ত্য' হবে। এবং মহাভারতের উক্ত বচন অনুযায়ী এই সব বিষয়ে তর্ক প্রয়োগ নিষিদ্ধ হবে।

কিন্তু এই অর্থেও মতবাদটি বিশেষ কিছু প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। কারণ অদ্বৈত বেদান্তীরাও বেদকে স্বতঃপ্রামাণ্য বলে মান্য করেন এবং শাস্ত্রপ্রতিষ্ঠিত বিষয় অনুভববিরুদ্ধ হলেও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন। সুতরাং এই অর্থে 'অচিন্ত্যভেদাভেদ' বললে বৈষ্ণব দর্শনের কোনো নিজস্ব বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় না এটি অদ্বৈত মতেরই পুনরাবৃত্তি।

এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে   শাস্ত্রে পরস্পরবিরোধী বাক্য থাকলে কী করা উচিত? নিরঞ্জনস্বরূপ বলেন, তখন তর্ক অপরিহার্য হয়ে পড়ে। শাস্ত্রের তাৎপর্য বা অভিপ্রায় নির্ধারণ করতে তর্ক নিষিদ্ধ নয়; নিষিদ্ধ কেবল শাস্ত্রের অভিপ্রায়ের বিপরীতে তর্ক প্রয়োগ। মনুসংহিতা এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলেছে   'আর্ষং ধর্মোপদেশঞ্চ বেদশাস্ত্রাবিরোধিনা / যস্তর্কেণানুসন্ধত্তে স ধর্মং বেদ নেতরঃ' ( মানবেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়,, সম্পাদিত ও অনুবাদকৃত ২০০৪ সালের মনুসংহিতার ৫৬১ পৃষ্ঠা )। অর্থাৎ যিনি বেদের অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তর্ক দ্বারা ধর্মের বিচার করেন, তিনিই ধর্মজ্ঞ   অন্যরা নন।

ব্রহ্মসূত্রেও (২/১/১১) ব্যাসদেব বলেছেন 'তর্কাপ্রতিষ্ঠানাদপ্যন্যথানুমেয়মিতি চেদেবমপ্যবিমোক্ষপ্রসঙ্গঃ।' এই সূত্রের শঙ্করাচার্যের ভাষ্য এবং গোবিন্দানন্দের ভাষ্যরত্নপ্রভা, আনন্দগিরির ন্যায়নির্ণয় ও বাচস্পতি মিশ্রের ভামতী উপভাষ্যে (জগদীশ লাল শাস্ত্রী সম্পাদিত ২০১০ সালের ব্রহ্মসূত্র শাংকরভাষ্যম যা গোবিন্দানন্দের ‘ভাষ্যরত্নপ্রভা’, আনন্দগিরির ‘ন্যায়নির্ণয়’ এবং বাচস্পতি মিশ্রের ‘ভামতী’ উপ-টীকা সহ দিল্লি মোতিলাল বেনারসীদাস হতে প্রকাশিত সেই গ্রন্থের ৩৬৬ থেকে ৩৬৯ পৃষ্টা দ্রষ্টব্য) এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে।

অদ্বৈত দৃষ্টিতে শাস্ত্রের অভিপ্রায় ও 'অচিন্ত্য'-র প্রকৃত অর্থ

তাহলে শাস্ত্রের প্রকৃত অভিপ্রায় কী? নিরঞ্জনস্বরূপ বলেন, 'যতো বা ইমানি ভূতানি', 'সদেব সোম্যেদমগ্র আসীৎ, একমেবাদ্বিতীয়ম্' প্রভৃতি উপনিষদ্‌বাক্যের সারকথা হলো   সৃষ্টির পূর্বে পরমাত্মা এক ও দ্বিতীয়বর্জিত ছিলেন, এবং তাঁর আলোকেই এই বিচিত্র জগৎ প্রতীয়মান হয়। এই জগৎ আদিতে ছিল না, অন্তে থাকবে না, সুতরাং মধ্যেও প্রকৃত অর্থে নেই   যদিও অনুভূত হচ্ছে, তবু তা বাধ্য  এবং অতএব মায়িক বা মিথ্যা।

এই বহুবিধ জগৎ কীভাবে উৎপন্ন হলো? এর উত্তর হলো মায়ার মাধ্যমে। যেমন চাঁদ একটি হলেও বিভিন্ন জলাশয়ে তার প্রতিফলনের কারণে বহু বলে মনে হয়, বা যেমন কোনো উপাদান ব্যবহার না করেও জাদুকর অনেক কিছু সৃষ্টি করতে পারেন, তেমনি পরমেশ্বরের মায়ার প্রভাবে এই জগৎ প্রতীয়মান হচ্ছে। এই মায়া 'অচিন্ত্য' এবং অসম্ভবকেও সম্ভব করার ক্ষমতাসম্পন্ন ।

এখন প্রশ্ন হলো   মায়া কি বাস্তব না অবাস্তব? নিরঞ্জনস্বরূপের উত্তর হলো, মায়া বাস্তব নয়, অবাস্তব। কারণ শ্রুতি ও স্মৃতিতে জগৎকে অবাস্তব বলা হয়েছে এবং মায়া সেই জগতের কারণ। কার্য যদি অবাস্তব হয়, তাহলে কারণও অবাস্তব হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তাহলে মায়াকে ঈশ্বরের শক্তি বলা হচ্ছে কেন? বাস্তব ঈশ্বরের শক্তি অবাস্তব হয় কীভাবে? শ্বেতাশ্বতরোপনিষদে মায়াকে ঈশ্বরের শক্তি বলা হয়েছে ( মহামহোপাধ্যায় দুর্গাচরণ সাঙ্খ্যবেদান্ততীর্থ, সম্পাদিত শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ শঙ্করাচার্যের ভাষ্যসহ ১৪৪-১৪৫ পৃষ্ঠা)। এর কারণ হলো, জগৎ সৃষ্টির কর্তা ঈশ্বর   জীব নয়। তবে ঈশ্বর বাস্তব হলেও তাঁর শক্তি মায়া অবাস্তব, কারণ মায়ার কার্যসমূহ অবাস্তব।

তাহলে মায়া কি ঈশ্বর থেকে ভিন্ন, নাকি অভিন্ন? এই প্রশ্নের উত্তরে একটি দার্শনিক দ্বিধার মুখে পড়তে হয়। যদি মায়াকে ঈশ্বর থেকে ভিন্ন বলা হয়, তাহলে মায়া স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে বাস্তব হয়ে পড়ে   কিন্তু বেদে সর্বত্র মায়ার কার্য জগৎকে অবাস্তব বলা হয়েছে, সুতরাং মায়াকে বাস্তব বলা বেদবিরুদ্ধ। তদুপরি মায়া বাস্তব হলে এটি ঈশ্বরের 'একমেবাদ্বিতীয়ম্'   সজাতীয়ভেদ, বিজাতীয়ভেদ ও স্বগতভেদ বর্জিত   স্বভাবকেই খণ্ডন করে।

অন্যদিকে যদি মায়াকে ঈশ্বর থেকে অভিন্ন বলা হয়, তাহলে মায়াকে চেতন  মানতে হবে   কারণ ঈশ্বর চেতন। কিন্তু মায়া জড়জগতের কারণ, এবং কারণ ও কার্য সমধর্মী হওয়া স্বাভাবিক। জড় কার্যের কারণ হিসেবে মায়াকেও জড়  বলতে হয়। এই একই সমস্যা কেবল ঈশ্বর ও তাঁর শক্তির মধ্যে নয়, অগ্নি ও তার দাহিকা শক্তির মতো সাধারণ দৃষ্টান্তেও বিদ্যমান।

এই উভয়সঙ্কট থেকে নিষ্কৃতির একমাত্র উপায় হলো মায়াকে ভেদ ও অভেদ   উভয়ের বাইরে একটি অনির্বচনীয়  সত্তা হিসেবে স্বীকার করা। যা বাস্তব বা অবাস্তব   কোনো শ্রেণিতেই পড়ে না, তাকে কোনো সুনির্দিষ্ট শব্দে সম্পূর্ণভাবে বর্ণনা করা যায় না। এই অনির্বচনীয়তাই 'অচিন্ত্য' শব্দের প্রকৃত অর্থ। এই অর্থে এবং কেবল এই অর্থেই বলা যায় যে ঈশ্বরের অন্তরঙ্গা ও বহিরঙ্গা শক্তি তাঁর সাথে একইসঙ্গে ভিন্ন ও অভিন্ন।

সব শেষে নিরঞ্জনস্বরূপ ব্রহ্মচারীর সমগ্র বিশ্লেষণের সারমর্ম হলো এই যে 'অচিন্ত্য' শব্দটির যে কোনো সংগত অর্থ ধরা হোক না কেন   জ্ঞানমাত্র, সাক্ষাৎকার বা শব্দেতর প্রমাণজনিত জ্ঞান   প্রতিটি ক্ষেত্রেই 'অচিন্ত্যভেদাভেদ' মতবাদ হয় স্ববিরোধী, নয় বাহুল্যদোষযুক্ত, নয় অদ্বৈত বেদান্তেরই পুনরাবৃত্তিমাত্র।

প্রথম অর্থে ভেদাভেদকে জ্ঞানের সম্পূর্ণ বাইরে রাখা যায় না, কারণ অলীক বিষয়েরও বিকল্পবৃত্তির মাধ্যমে জ্ঞান হয়। দ্বিতীয় অর্থে বলা হলে লৌকিক প্রত্যক্ষে অলৌকিক বিষয় অগম্য   এটি সর্বস্বীকৃত সত্য, তাই এতে নতুন কোনো মত প্রতিষ্ঠিত হয় না। তৃতীয় অর্থে বলা হলে অদ্বৈত বেদান্তীরাও শাস্ত্রের স্বতঃপ্রামাণ্য মেনে চলেন, সুতরাং এটিও বৈষ্ণব মতের কোনো বিশেষত্ব প্রতিষ্ঠা করে না।

সবশেষে নিরঞ্জনস্বরূপ দেখান যে 'অচিন্ত্য' শব্দের একমাত্র দার্শনিকভাবে সুসংগত অর্থ হলো 'অনির্বচনীয়তা'   অর্থাৎ ভেদ ও অভেদ উভয়ের বাইরে এমন একটি সম্পর্ক যাকে ভাষায় সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু এই অর্থটি আসলে অদ্বৈত বেদান্তের বিবর্তবাদের মায়াতত্ত্বেরই প্রকাশ। মায়া ঈশ্বর থেকে ভিন্নও নয়, অভিন্নও নয়   এই অনির্বচনীয়তাই অদ্বৈত মতের মূল বক্তব্য। অতএব 'অচিন্ত্যভেদাভেদ' একটি স্বতন্ত্র দার্শনিক মত হিসেবে নয়, বরং অদ্বৈত বেদান্তের অনির্বচনীয়তাবাদের একটি ভিন্ন নামকরণমাত্র।

নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি

Āraṇya, Swāmī Hariharānanda, tr. & comm. [Bengali] 2015. Pātañjala Yogadarśana. Kolkata: Paścimabaṅga Rājya Pustaka Parṣat.

Bagchi, Mahāmahopādhyāya Yogendrānātha. 1997 [reprint]. Sāṅkhyamatasamīkṣā [in Bengali]. Calcutta: Darśana o Samāja Trust.

Bandyopādhyāya, Manabendu, ed. & tr. [Bengali] 2004. Manusaṃhitā. Calcutta: Śrī Balarāma Prakāśanī.

Bandyopādhyāya, Aśokakumāra, ed. 2015. Tattvasandarbhaḥ with the Sanskrit commentaries of Baladeva Vidyābhūṣaṇa and Rādhāmohana Gosvāmi Bhaṭṭācārya. Kolkata: Sadeśa.

Bhaṭṭācārya, Śrīmohana & Dineśacandra Bhaṭṭācārya. 1958. Bhāratīya Darśana Kośa. Vol. I. Calcutta: Sanskrit College.

Brahmacārī, Śrī Nirañjanasvarūpa. Advaitamatatimirabhāskara. Calcutta: Sādhana-patha Prakāśana.

Sāṅkhyavedāntatīrtha, Mahāmahopādhyāya Durgācaraṇa, ed. & tr. [Beng.] 1931. Śvetāśvataropaniṣad with the commentary of Śaṅkarācārya. Calcutta: Kṣīrodacandra Majumadāra.

Shastri, J. L. ed. 2010 [reprint]. Brahmasūtra Śāṅkarabhāṣyam with the sub-commentaries Bhāṣyaratnaprabhā of Govindānanda, Nyāyanirṇaya of Ānandagiri and Bhāmatī of Vācaspati Miśra. Delhi: Motilal Banarsidass.

Friday, May 29, 2026

প্রাচীন ভারতের আয়ুধজীবী সংগঠন, যৌধেয় গণসঙ্ঘ এবং অর্জুনায়ন গোষ্ঠী নিয়ে বিস্তারিত

প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে মগধ, মৌর্য বা গুপ্ত সাম্রাজ্যের মতো বিশাল একনায়কতান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। কিন্তু সমান্তরালভাবে সেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি -রাজতান্ত্রিক বা গণতান্ত্রিক শাসনকাঠামোও বিদ্যমান ছিল, যাকে প্রাচীন পরিভাষায় 'গণ'  বা 'সঙ্ঘ'  বলা হতো।

ইতিহাসবিদ কে. পি. জয়সোয়াল তাঁর যুগান্তকারী গবেষণাগ্রন্থ Hindu Polity (1924)- প্রমাণ করেছেন যে, প্রাচীন ভারতের এই গণরাজ্যগুলো গ্রিস বা রোমের প্রাচীন প্রজাতন্ত্রগুলোর চেয়ে কোনো অংশে কম শক্তিশালী বা সুসংগঠিত ছিল না। এই গণরাজ্যগুলোর মূল ভিত্তি ছিল সমতা, যৌথ নেতৃত্ব এবং সামরিক স্বনির্ভরতা। এই ধারারই তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলঃ 

আয়ুধজীবী সংগঠন (যাদের শাসনপদ্ধতি অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল), যৌধেয় গণসঙ্ঘ (সবচেয়ে দীর্ঘজীবী যোদ্ধাদের প্রজাতন্ত্র) এবং অর্জুনায়ন গোষ্ঠী।

 

. আয়ুধজীবী সংগঠন

'আয়ুধজীবী' শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো "যারা অস্ত্রের (আয়ুধ) সাহায্যে জীবন ধারণ বা জীবিকা নির্বাহ করে" প্রাচীন ব্যাকরণবিদ পাণিনি (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক) তাঁর বিখ্যাত ব্যাকরণ গ্রন্থ অষ্টাধ্যায়ী তে এই ধরনের সংগঠনের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন

পাণিনির সূত্র অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং পাঞ্জাব অঞ্চলে এমন কিছু গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল, যাদের প্রতিটি নাগরিকই ছিল এক একজন প্রশিক্ষিত যোদ্ধা। তারা কোনো স্থায়ী রাজার অধীনে বেতনভোগী সৈন্য ছিল না; বরং তারা ছিল স্বাধীন স্বশাসিত সমাজ, যারা যুদ্ধের সময় সম্পূর্ণ গোষ্ঠী মিলে অস্ত্র ধারণ করতপাণিনি এই স্বাধীন যোদ্ধা গোষ্ঠীগুলোকে সাধারণ রাজতন্ত্র থেকে আলাদা করতে তাঁর গ্রন্থে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সূত্র বা নিয়ম রচনা করেছেন। ঐতিহাসিক ভি. এস. আগরওয়াল তাঁর India as Known to Panini (1953) গ্রন্থে এই সূত্রগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। প্রধান সূত্রগুলো নিচে দেওয়া হলো:

সূত্র ৫/৩/১১৪: এই সূত্র অনুযায়ী, 'বাহীক' বা উত্তর-পশ্চিম ভারতের (পাঞ্জাব অঞ্চল) যে সমস্ত সঙ্ঘ অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে, তাদের নামের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রত্যয় যুক্ত হবে। তবে এই নিয়মটি ব্রাহ্মণ এবং রাজন্য (ক্ষত্রিয় শাসক শ্রেণী) দ্বারা শাসিত গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। এটি প্রমাণ করে যে, আয়ুধজীবী সঙ্ঘের সাধারণ নাগরিকরাই ছিলেন যোদ্ধা, সেখানে কোনো নির্দিষ্ট রাজবংশ ছিল না।

সূত্র ৪/৩/৯১:  পাণিনি এখানে সঙ্ঘগুলোর যুদ্ধদেবতা বা কুলদেবতার প্রতি আনুগত্যের ব্যাকরণগত নিয়ম দেখিয়েছেন, যা পরবর্তীকালে যৌধেয়দের কার্তিকেয় উপাসনার সাথে মিলে যায়।

পাণিনি আয়ুধজীবী সঙ্ঘগুলোকে প্রধানত দুটি অঞ্চলে ভাগ করেছেন:

১.বাহীক সঙ্ঘ: পাঞ্জাবের রাভি ও বিয়াস নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলের গোষ্ঠী (যেমন: মালব ও ক্ষুদ্রক)।

২. পার্বত্য সঙ্ঘ: বর্তমান হিমাচল ও আফগানিস্তান সীমান্তের পাহাড়ি যোদ্ধা গোষ্ঠী (যেমন: ত্রিগর্ত)।

পাণিনির 'আয়ুধজীবী' শব্দটিকে পরবর্তীকালে আচার্য কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্র (১১তম অধিকরণ)-এ 'শস্তোপজীবী সঙ্ঘ'  হিসেবে অভিহিত করেছেন। কৌটিল্য সঙ্ঘগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করেছিলেন:
বার্তা-শস্তোপজীবী সঙ্ঘ: যারা একই সাথে কৃষি, বাণিজ্য (বার্তা) এবং যুদ্ধের (শস্ত্র) মাধ্যমে জীবন ধারণ করে। যেমন—কম্বোজ ও সুরাষ্ট্র গোষ্ঠী।
রাজশব্দোপজীবী সঙ্ঘ: যাদের প্রধানরা যৌথভাবে 'রাজা' উপাধি ব্যবহার করতেন (যেমন—লিচ্ছবি। মল্ল গোষ্ঠী ও বৃজি। 


খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকে যখন গ্রিক বীর আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেন, তখন তিনি এই আয়ুধজীবী সংগঠনগুলোর তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। গ্রিক ঐতিহাসিক এরিয়ান , ডিওডোরাস  এবং কার্টিয়াস  তাঁদের বিবরণীতে এই গোষ্ঠীগুলোর বীরত্বের কথা উল্লেখ করেছেন।

  • মালব এবং ক্ষুদ্রক : এরা ছিল পাঞ্জাব অঞ্চলের বিখ্যাত আয়ুধজীবী সঙ্ঘ। আলেকজান্ডার মালবদের দুর্গ আক্রমণ করতে গিয়ে মারাত্মক ভাবে আহত হয়েছিলেন। গ্রিক লেখকদের মতে, এই প্রজাতন্ত্রগুলো এতই সামরিকভাবে সজাগ ছিল যে, জরুরি অবস্থায় তারা মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার পদাতিক অশ্বারোহী বাহিনী খাড়া করতে পারত।

 

. যৌধেয় গণসঙ্ঘ

যৌধেয়রা ছিল প্রাচীন ভারতের অন্যতম দীর্ঘজীবী এবং পরাক্রমশালী যোদ্ধা গণরাজ্য 'যৌধেয়' শব্দটি এসেছে 'যুদ্ধ' বা 'যোদ্ধা' শব্দ থেকে মহাভারতের আদিপর্ব এবং দ্রোণপর্বে এদের উল্লেখ রয়েছে ঐতিহাসিক জন অ্যালান তাঁর Catalogue of the Coins of Ancient India (1936) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, যৌধেয়দের মূল শাসনকেন্দ্র ছিল বর্তমান হরিয়ানা (রোহতক) এবং দক্ষিণ-পূর্ব পাঞ্জাব অঞ্চলে।

যৌধেয়দের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং নির্ভরযোগ্য উৎস হলো তাদের আবিষ্কৃত বিপুল পরিমাণ তাম্র ব্রোঞ্জ মুদ্রা প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের মাধ্যমে রোহতক এবং সুনীতি অঞ্চল থেকে তাদের মুদ্রা তৈরির ছাঁচ পাওয়া গেছে

তাদের মুদ্রার কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল যেমনঃ

  • বিজয় সূচক লিপি: তাদের মুদ্রায় ব্রাহ্মী লিপিতে খোদাই করা থাকত"যৌধেয় গণস্য জয়"  যার অর্থ "যৌধেয় প্রজাতন্ত্রের জয় হোক" এটি প্রমাণ করে যে সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তির হাতে ছিল না, ছিল পুরো 'গণ' বা সঙ্ঘের হাতে
  • দেবতা কার্তিকেয়ের ছবি: যৌধেয়রা যুদ্ধ শক্তির দেবতা কার্তিকেয় (স্কন্দ)-এর উপাসক ছিল তাদের মুদ্রায় একহাতে বর্শা ধারণ করা কার্তিকেয় এবং তাঁর বাহন ময়ূরের ছবি স্পষ্ট অঙ্কিত থাকত

যৌধেয়দের সামরিক শক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে তৎকালীন বড় বড় সাম্রাজ্যও তাদের সমীহ করত।

  • রুদ্রদামনের জুনাগড় শিলালিপি (১৫০ খ্রিস্টাব্দ): শক মহাক্ষত্রপ রুদ্রদামন তাঁর এই লিপিতে গর্ব করে বলেছেন যে, তিনি যৌধেয়দের পরাস্ত করেছিলেন একই সাথে তিনি যৌধেয়দের প্রশংসায় লিখেছেন যে, তারা সমস্ত ক্ষত্রিয়দের মধ্যে তাদের বীরত্বের জন্য বিখ্যাত ছিল ("সর্বক্ষত্রত্রাবিষ্কৃত-বীরশব্দজাতোৎসেকাধুজানাং যৌধেয়ানাম্")
  • সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ স্তম্ভলিপি (৪র্থ শতক): গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি হরিষেণ রচিত 'প্রয়াগ প্রশস্তি'-তে যৌধেয়দের নাম উল্লেখ আছে সেখানে বলা হয়েছে, যৌধেয়রা সমুদ্রগুপ্তের আধিপত্য স্বীকার করে কর বা রাজস্ব প্রদানে বাধ্য হয়েছিল, তবে তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেছিল

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ Sora AI


 

. অর্জুনায়ন গোষ্ঠী

অর্জুনায়নরা ছিল যৌধেয়দের সমসাময়িক এবং প্রতিবেশী একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী গণরাজ্য ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ এবং . আর. সি. মজুমদার-এর মতে, এরা বর্তমান রাজস্থানের ভরতপুর, আলওয়ার এবং মথুরার মধ্যবর্তী অঞ্চলে বসবাস করত পাণিনির 'গণপাঠ'- 'আর্জুনাভ' নামে এদের প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় তারা নিজেদের পাণ্ডব বীর অর্জুনের বংশধর বলে দাবি করত

যৌধেয়দের মতো অর্জুনায়নদের ইতিহাসও মূলত তাদের মুদ্রার ওপর ভিত্তি করে পুনর্গঠিত হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ২য় বা ১ম শতকে তারা নিজস্ব মুদ্রা চালু করে

তাদের মুদ্রার লিপিতে লেখা থাকত: "অর্জুনায়নাং জয়ঃ" অর্থাৎ "অর্জুনায়নদের জয় হোক" ।এই মুদ্রাগুলোর একপিঠে ষাঁড়  এবং অন্যপিঠে দাঁড়িয়ে থাকা দেবী মূর্তির ছবি পাওয়া যায়, যা তাদের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক।

অর্জুনায়নরা একা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রায়শই যৌধেয় এবং মালবদের সাথে সামরিক জোট  গঠন করত সমুদ্রগুপ্তের আক্রমণের পর এই গোষ্ঠীটি ধীরে ধীরে মূলধারার গুপ্ত সাম্রাজ্যের সাথে একীভূত হয়ে যায়

 

তুলনামূলক বিশ্লেষণ

প্রাচীন ভারতের এই তিনটি রাজনৈতিক শক্তির তুলনামূলক রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:

বৈশিষ্ট্য

আয়ুধজীবী সংগঠন

যৌধেয় গণসঙ্ঘ

অর্জুনায়ন গোষ্ঠী

মূল প্রকৃতি

একটি সাধারণ শ্রেণীগত সংজ্ঞা (যেমন: মালব, ক্ষুদ্রক)

একটি সুনির্দিষ্ট বৃহৎ যোদ্ধা উপজাতীয় সঙ্ঘ

একটি আঞ্চলিক ক্ষুদ্র গণরাজ্য

ভৌগোলিক কেন্দ্র

উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং পাঞ্জাব

হরিয়ানা, পূর্ব পাঞ্জাব এবং উত্তর রাজস্থান

রাজস্থানের আলওয়ার ভরতপুর অঞ্চল

প্রধান উৎস

পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, গ্রিক বিবরণী

তাম্র মুদ্রা, জুনাগড় লিপি, এলাহাবাদ প্রশস্তি

নিজস্ব মুদ্রা, সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি

ধর্মীয়/সাংস্কৃতিক প্রতীক

পেশাদার যুদ্ধবিদ্যা অস্ত্রপূজা

কার্তিকেয় (স্কন্দ) এবং ময়ূর

ষাঁড় (নন্দী) লক্ষ্মী সদৃশ দেবী মূর্তি

পতনের কারণ

আলেকজান্ডারের আক্রমণ মৌর্য সাম্রাজ্যের বিস্তার

কুশানদের সাথে দীর্ঘ সংঘাত গুপ্ত সাম্রাজ্যের গ্রাস

গুপ্ত সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণের ফলে বিলুপ্তি

 

পতনের কারণ

খ্রিস্টীয় ৪র্থ থেকে ৫ম শতকের মধ্যে ভারতের বুক থেকে এই গৌরবময় গণরাজ্যগুলো চিরতরে হারিয়ে যায় [] ঐতিহাসিক . এস. আলতেকর তাঁর State and Government in Ancient India গ্রন্থে এদের পতনের প্রধান তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন:

  • আভ্যন্তরীণ কোন্দল : কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে উল্লেখ করেছিলেন যে, সঙ্ঘগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের ভেতরের একতার অভাব। গুপ্ত সম্রাটরা 'ভেদাভেদ' নীতি প্রয়োগ করে এদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য বিনষ্ট করেছিলেন।
  • কেন্দ্রীভূত রাজতন্ত্রের উত্থান: মৌর্য এবং পরবর্তীকালে গুপ্ত রাজারা একছত্র সাম্রাজ্য বিস্তারে বিশ্বাসী ছিলেন। গণরাজ্যগুলোর বিকেন্দ্রীভূত শাসনকাঠামো বিশাল পেশাদার সাম্রাজ্যবাদী সেনাবাহিনীর সামনে দীর্ঘকাল টিকতে পারেনি
  • সামরিক সামন্ততন্ত্র: শেষের দিকে এই গণরাজ্যগুলো নিজেদের গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে 'মহারাজা' বা 'মহাসেনাপতি'দের অধীনে বংশানুক্রমিক সামরিক একনায়কতন্ত্রে রূপ নিতে শুরু করেছিল, যা তাদের পতনের পথ ত্বরান্বিত করে

 

আয়ুধজীবী সংগঠন, যৌধেয় এবং অর্জুনায়নদের ইতিহাস প্রমাণ করে যে প্রাচীন ভারত কেবল রাজাদের চারণভূমি ছিল না। এখানে ব্যালট বা যৌথ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক শক্তিশালী ঐতিহ্য ছিল। যদিও গুপ্ত সাম্রাজ্যের উদয়ের পর এই প্রাচীন প্রজাতন্ত্রগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবুও ভারতের রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে এদের অবদান অনস্বীকার্য। 

 

সহায়ক গবেষণাগ্রন্থ তথ্যসূত্র:

  1. Jayaswal, K. P. – Hindu Polity: A Constitutional History of India in Hindu Times (1924).
  2. Allan, John – Catalogue of the Coins of Ancient India (1936) .
  3. Altekar, A. S. – State and Government in Ancient India .
  4. Majumdar, R. C. – The Corporate Life in Ancient India .
  5. Agrawala, V. S. – India as Known to Panini (1953).

 

 



'অচিন্ত্যভেদাভেদ' পদের কতিপয় যৌক্তিক অসঙ্গতি বিংশ শতাব্দীর অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি পর্যালোচনা

  ভূমিকা গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের কেন্দ্রীয় মতবাদ হলো 'অচিন্ত্যভেদাভেদ'। শ্রীচৈতন্যের ভাবধারা থেকে উদ্ভূত এই দার্শনিক অবস্থানটি ঈশ্...

Popular Posts