Friday, May 29, 2026

প্রাচীন ভারতের আয়ুধজীবী সংগঠন, যৌধেয় গণসঙ্ঘ এবং অর্জুনায়ন গোষ্ঠী নিয়ে বিস্তারিত

প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে মগধ, মৌর্য বা গুপ্ত সাম্রাজ্যের মতো বিশাল একনায়কতান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। কিন্তু সমান্তরালভাবে সেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি -রাজতান্ত্রিক বা গণতান্ত্রিক শাসনকাঠামোও বিদ্যমান ছিল, যাকে প্রাচীন পরিভাষায় 'গণ'  বা 'সঙ্ঘ'  বলা হতো।

ইতিহাসবিদ কে. পি. জয়সোয়াল তাঁর যুগান্তকারী গবেষণাগ্রন্থ Hindu Polity (1924)- প্রমাণ করেছেন যে, প্রাচীন ভারতের এই গণরাজ্যগুলো গ্রিস বা রোমের প্রাচীন প্রজাতন্ত্রগুলোর চেয়ে কোনো অংশে কম শক্তিশালী বা সুসংগঠিত ছিল না। এই গণরাজ্যগুলোর মূল ভিত্তি ছিল সমতা, যৌথ নেতৃত্ব এবং সামরিক স্বনির্ভরতা। এই ধারারই তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলঃ 

আয়ুধজীবী সংগঠন (যাদের শাসনপদ্ধতি অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল), যৌধেয় গণসঙ্ঘ (সবচেয়ে দীর্ঘজীবী যোদ্ধাদের প্রজাতন্ত্র) এবং অর্জুনায়ন গোষ্ঠী।

 

. আয়ুধজীবী সংগঠন

'আয়ুধজীবী' শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো "যারা অস্ত্রের (আয়ুধ) সাহায্যে জীবন ধারণ বা জীবিকা নির্বাহ করে" প্রাচীন ব্যাকরণবিদ পাণিনি (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক) তাঁর বিখ্যাত ব্যাকরণ গ্রন্থ অষ্টাধ্যায়ী তে এই ধরনের সংগঠনের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন

পাণিনির সূত্র অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং পাঞ্জাব অঞ্চলে এমন কিছু গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল, যাদের প্রতিটি নাগরিকই ছিল এক একজন প্রশিক্ষিত যোদ্ধা। তারা কোনো স্থায়ী রাজার অধীনে বেতনভোগী সৈন্য ছিল না; বরং তারা ছিল স্বাধীন স্বশাসিত সমাজ, যারা যুদ্ধের সময় সম্পূর্ণ গোষ্ঠী মিলে অস্ত্র ধারণ করতপাণিনি এই স্বাধীন যোদ্ধা গোষ্ঠীগুলোকে সাধারণ রাজতন্ত্র থেকে আলাদা করতে তাঁর গ্রন্থে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সূত্র বা নিয়ম রচনা করেছেন। ঐতিহাসিক ভি. এস. আগরওয়াল তাঁর India as Known to Panini (1953) গ্রন্থে এই সূত্রগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। প্রধান সূত্রগুলো নিচে দেওয়া হলো:

সূত্র ৫/৩/১১৪: এই সূত্র অনুযায়ী, 'বাহীক' বা উত্তর-পশ্চিম ভারতের (পাঞ্জাব অঞ্চল) যে সমস্ত সঙ্ঘ অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে, তাদের নামের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রত্যয় যুক্ত হবে। তবে এই নিয়মটি ব্রাহ্মণ এবং রাজন্য (ক্ষত্রিয় শাসক শ্রেণী) দ্বারা শাসিত গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। এটি প্রমাণ করে যে, আয়ুধজীবী সঙ্ঘের সাধারণ নাগরিকরাই ছিলেন যোদ্ধা, সেখানে কোনো নির্দিষ্ট রাজবংশ ছিল না।

সূত্র ৪/৩/৯১:  পাণিনি এখানে সঙ্ঘগুলোর যুদ্ধদেবতা বা কুলদেবতার প্রতি আনুগত্যের ব্যাকরণগত নিয়ম দেখিয়েছেন, যা পরবর্তীকালে যৌধেয়দের কার্তিকেয় উপাসনার সাথে মিলে যায়।

পাণিনি আয়ুধজীবী সঙ্ঘগুলোকে প্রধানত দুটি অঞ্চলে ভাগ করেছেন:

১.বাহীক সঙ্ঘ: পাঞ্জাবের রাভি ও বিয়াস নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলের গোষ্ঠী (যেমন: মালব ও ক্ষুদ্রক)।

২. পার্বত্য সঙ্ঘ: বর্তমান হিমাচল ও আফগানিস্তান সীমান্তের পাহাড়ি যোদ্ধা গোষ্ঠী (যেমন: ত্রিগর্ত)।

পাণিনির 'আয়ুধজীবী' শব্দটিকে পরবর্তীকালে আচার্য কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্র (১১তম অধিকরণ)-এ 'শস্তোপজীবী সঙ্ঘ'  হিসেবে অভিহিত করেছেন। কৌটিল্য সঙ্ঘগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করেছিলেন:
বার্তা-শস্তোপজীবী সঙ্ঘ: যারা একই সাথে কৃষি, বাণিজ্য (বার্তা) এবং যুদ্ধের (শস্ত্র) মাধ্যমে জীবন ধারণ করে। যেমন—কম্বোজ ও সুরাষ্ট্র গোষ্ঠী।
রাজশব্দোপজীবী সঙ্ঘ: যাদের প্রধানরা যৌথভাবে 'রাজা' উপাধি ব্যবহার করতেন (যেমন—লিচ্ছবি। মল্ল গোষ্ঠী ও বৃজি। 


খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকে যখন গ্রিক বীর আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেন, তখন তিনি এই আয়ুধজীবী সংগঠনগুলোর তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। গ্রিক ঐতিহাসিক এরিয়ান , ডিওডোরাস  এবং কার্টিয়াস  তাঁদের বিবরণীতে এই গোষ্ঠীগুলোর বীরত্বের কথা উল্লেখ করেছেন।

  • মালব এবং ক্ষুদ্রক : এরা ছিল পাঞ্জাব অঞ্চলের বিখ্যাত আয়ুধজীবী সঙ্ঘ। আলেকজান্ডার মালবদের দুর্গ আক্রমণ করতে গিয়ে মারাত্মক ভাবে আহত হয়েছিলেন। গ্রিক লেখকদের মতে, এই প্রজাতন্ত্রগুলো এতই সামরিকভাবে সজাগ ছিল যে, জরুরি অবস্থায় তারা মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার পদাতিক অশ্বারোহী বাহিনী খাড়া করতে পারত।

 

. যৌধেয় গণসঙ্ঘ

যৌধেয়রা ছিল প্রাচীন ভারতের অন্যতম দীর্ঘজীবী এবং পরাক্রমশালী যোদ্ধা গণরাজ্য 'যৌধেয়' শব্দটি এসেছে 'যুদ্ধ' বা 'যোদ্ধা' শব্দ থেকে মহাভারতের আদিপর্ব এবং দ্রোণপর্বে এদের উল্লেখ রয়েছে ঐতিহাসিক জন অ্যালান তাঁর Catalogue of the Coins of Ancient India (1936) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, যৌধেয়দের মূল শাসনকেন্দ্র ছিল বর্তমান হরিয়ানা (রোহতক) এবং দক্ষিণ-পূর্ব পাঞ্জাব অঞ্চলে।

যৌধেয়দের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং নির্ভরযোগ্য উৎস হলো তাদের আবিষ্কৃত বিপুল পরিমাণ তাম্র ব্রোঞ্জ মুদ্রা প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের মাধ্যমে রোহতক এবং সুনীতি অঞ্চল থেকে তাদের মুদ্রা তৈরির ছাঁচ পাওয়া গেছে

তাদের মুদ্রার কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল যেমনঃ

  • বিজয় সূচক লিপি: তাদের মুদ্রায় ব্রাহ্মী লিপিতে খোদাই করা থাকত"যৌধেয় গণস্য জয়"  যার অর্থ "যৌধেয় প্রজাতন্ত্রের জয় হোক" এটি প্রমাণ করে যে সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তির হাতে ছিল না, ছিল পুরো 'গণ' বা সঙ্ঘের হাতে
  • দেবতা কার্তিকেয়ের ছবি: যৌধেয়রা যুদ্ধ শক্তির দেবতা কার্তিকেয় (স্কন্দ)-এর উপাসক ছিল তাদের মুদ্রায় একহাতে বর্শা ধারণ করা কার্তিকেয় এবং তাঁর বাহন ময়ূরের ছবি স্পষ্ট অঙ্কিত থাকত

যৌধেয়দের সামরিক শক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে তৎকালীন বড় বড় সাম্রাজ্যও তাদের সমীহ করত।

  • রুদ্রদামনের জুনাগড় শিলালিপি (১৫০ খ্রিস্টাব্দ): শক মহাক্ষত্রপ রুদ্রদামন তাঁর এই লিপিতে গর্ব করে বলেছেন যে, তিনি যৌধেয়দের পরাস্ত করেছিলেন একই সাথে তিনি যৌধেয়দের প্রশংসায় লিখেছেন যে, তারা সমস্ত ক্ষত্রিয়দের মধ্যে তাদের বীরত্বের জন্য বিখ্যাত ছিল ("সর্বক্ষত্রত্রাবিষ্কৃত-বীরশব্দজাতোৎসেকাধুজানাং যৌধেয়ানাম্")
  • সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ স্তম্ভলিপি (৪র্থ শতক): গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি হরিষেণ রচিত 'প্রয়াগ প্রশস্তি'-তে যৌধেয়দের নাম উল্লেখ আছে সেখানে বলা হয়েছে, যৌধেয়রা সমুদ্রগুপ্তের আধিপত্য স্বীকার করে কর বা রাজস্ব প্রদানে বাধ্য হয়েছিল, তবে তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেছিল

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ Sora AI


 

. অর্জুনায়ন গোষ্ঠী

অর্জুনায়নরা ছিল যৌধেয়দের সমসাময়িক এবং প্রতিবেশী একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী গণরাজ্য ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ এবং . আর. সি. মজুমদার-এর মতে, এরা বর্তমান রাজস্থানের ভরতপুর, আলওয়ার এবং মথুরার মধ্যবর্তী অঞ্চলে বসবাস করত পাণিনির 'গণপাঠ'- 'আর্জুনাভ' নামে এদের প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় তারা নিজেদের পাণ্ডব বীর অর্জুনের বংশধর বলে দাবি করত

যৌধেয়দের মতো অর্জুনায়নদের ইতিহাসও মূলত তাদের মুদ্রার ওপর ভিত্তি করে পুনর্গঠিত হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ২য় বা ১ম শতকে তারা নিজস্ব মুদ্রা চালু করে

তাদের মুদ্রার লিপিতে লেখা থাকত: "অর্জুনায়নাং জয়ঃ" অর্থাৎ "অর্জুনায়নদের জয় হোক" ।এই মুদ্রাগুলোর একপিঠে ষাঁড়  এবং অন্যপিঠে দাঁড়িয়ে থাকা দেবী মূর্তির ছবি পাওয়া যায়, যা তাদের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক।

অর্জুনায়নরা একা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রায়শই যৌধেয় এবং মালবদের সাথে সামরিক জোট  গঠন করত সমুদ্রগুপ্তের আক্রমণের পর এই গোষ্ঠীটি ধীরে ধীরে মূলধারার গুপ্ত সাম্রাজ্যের সাথে একীভূত হয়ে যায়

 

তুলনামূলক বিশ্লেষণ

প্রাচীন ভারতের এই তিনটি রাজনৈতিক শক্তির তুলনামূলক রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:

বৈশিষ্ট্য

আয়ুধজীবী সংগঠন

যৌধেয় গণসঙ্ঘ

অর্জুনায়ন গোষ্ঠী

মূল প্রকৃতি

একটি সাধারণ শ্রেণীগত সংজ্ঞা (যেমন: মালব, ক্ষুদ্রক)

একটি সুনির্দিষ্ট বৃহৎ যোদ্ধা উপজাতীয় সঙ্ঘ

একটি আঞ্চলিক ক্ষুদ্র গণরাজ্য

ভৌগোলিক কেন্দ্র

উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং পাঞ্জাব

হরিয়ানা, পূর্ব পাঞ্জাব এবং উত্তর রাজস্থান

রাজস্থানের আলওয়ার ভরতপুর অঞ্চল

প্রধান উৎস

পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, গ্রিক বিবরণী

তাম্র মুদ্রা, জুনাগড় লিপি, এলাহাবাদ প্রশস্তি

নিজস্ব মুদ্রা, সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি

ধর্মীয়/সাংস্কৃতিক প্রতীক

পেশাদার যুদ্ধবিদ্যা অস্ত্রপূজা

কার্তিকেয় (স্কন্দ) এবং ময়ূর

ষাঁড় (নন্দী) লক্ষ্মী সদৃশ দেবী মূর্তি

পতনের কারণ

আলেকজান্ডারের আক্রমণ মৌর্য সাম্রাজ্যের বিস্তার

কুশানদের সাথে দীর্ঘ সংঘাত গুপ্ত সাম্রাজ্যের গ্রাস

গুপ্ত সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণের ফলে বিলুপ্তি

 

পতনের কারণ

খ্রিস্টীয় ৪র্থ থেকে ৫ম শতকের মধ্যে ভারতের বুক থেকে এই গৌরবময় গণরাজ্যগুলো চিরতরে হারিয়ে যায় [] ঐতিহাসিক . এস. আলতেকর তাঁর State and Government in Ancient India গ্রন্থে এদের পতনের প্রধান তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন:

  • আভ্যন্তরীণ কোন্দল : কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে উল্লেখ করেছিলেন যে, সঙ্ঘগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের ভেতরের একতার অভাব। গুপ্ত সম্রাটরা 'ভেদাভেদ' নীতি প্রয়োগ করে এদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য বিনষ্ট করেছিলেন।
  • কেন্দ্রীভূত রাজতন্ত্রের উত্থান: মৌর্য এবং পরবর্তীকালে গুপ্ত রাজারা একছত্র সাম্রাজ্য বিস্তারে বিশ্বাসী ছিলেন। গণরাজ্যগুলোর বিকেন্দ্রীভূত শাসনকাঠামো বিশাল পেশাদার সাম্রাজ্যবাদী সেনাবাহিনীর সামনে দীর্ঘকাল টিকতে পারেনি
  • সামরিক সামন্ততন্ত্র: শেষের দিকে এই গণরাজ্যগুলো নিজেদের গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে 'মহারাজা' বা 'মহাসেনাপতি'দের অধীনে বংশানুক্রমিক সামরিক একনায়কতন্ত্রে রূপ নিতে শুরু করেছিল, যা তাদের পতনের পথ ত্বরান্বিত করে

 

আয়ুধজীবী সংগঠন, যৌধেয় এবং অর্জুনায়নদের ইতিহাস প্রমাণ করে যে প্রাচীন ভারত কেবল রাজাদের চারণভূমি ছিল না। এখানে ব্যালট বা যৌথ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক শক্তিশালী ঐতিহ্য ছিল। যদিও গুপ্ত সাম্রাজ্যের উদয়ের পর এই প্রাচীন প্রজাতন্ত্রগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবুও ভারতের রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে এদের অবদান অনস্বীকার্য। 

 

সহায়ক গবেষণাগ্রন্থ তথ্যসূত্র:

  1. Jayaswal, K. P. – Hindu Polity: A Constitutional History of India in Hindu Times (1924).
  2. Allan, John – Catalogue of the Coins of Ancient India (1936) .
  3. Altekar, A. S. – State and Government in Ancient India .
  4. Majumdar, R. C. – The Corporate Life in Ancient India .
  5. Agrawala, V. S. – India as Known to Panini (1953).

 

 



Saturday, April 18, 2026

কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক। যে বিষয়গুলো মানুষের মনে সর্বদাই ঘুরপাক খায় তার সঠিক শাস্ত্রীয় উত্তর।



১। সনাতন ধর্মে কি পশুহিংসা বৈধ করা হয়েছে?

উত্তর: হ্যাঁ। 

‘পিতৃকাৰ্য, দেবপূজা ও অতিথিসৎকারে পশুহিংসা করিতে পারিবে। মনু বলিয়াছেন; মধুপর্ক, যজ্ঞ, পিতৃকাৰ্য্য ও দেবকাৰ্য- ইহাতেই পশুহিংসা করিবে......’ (বশিষ্ঠ সংহিতা ৪র্থ অধ্যায়)।

ব্রহ্মা, স্বয়ং যজ্ঞের নিমিত্ত সকল প্রকার বলির সৃষ্টি করিয়াছেন; এই নিমিত্ত আমি তোমাকে (পশু) বধ করি, এই জন্যে যজ্ঞে পশুবধ হিংসার মধ্যে গণ্য নয়। (কালিকাপুরাণ ৫৫/১০)


২। ইহা কী পূর্বে থেকেই চলে আসছে?

উত্তর: হ্যাঁ অবশ্যই। যেখানে শাস্ত্রেই বলা হচ্ছে পশুবলি বিষয়ে সেখানে আর না থাকার কী বিষয় থাকতে পারে! পূর্বে ছিল কিনা এর নির্ণয় করা যায় ইতিহাস শাস্ত্র থেকে। বেদের ব্রাহ্মণ, অরণ্যক এবং মহাভারত রামায়ণ। 

মহাভারতে শান্তনু রাজার সময়ে ‘তখন দেবতা, ঋষি ও পিতৃলোকের অর্চনার জন্যই প্রাণী বধ হইতো; কিন্তু অধর্ম অনুসারে কোন প্রাণীই বধ হইত না।’ (মহাভারত আদি পর্ব ৯৪/১৭)। 

এছাড়াও রামায়ণে পাওয়া যায়, ‘অনন্তর সেই যজ্ঞে শামিত্রকর্ম্মের সময় উপস্থিত হইলে সেই সকল ঋষি, শাস্ত্রে যে যে দেবতার যে যে বলি বিহিত আছে, সেই সেই দেবতার উদ্দেশ্যে সেই সেই বলি প্রদান করলেন। বহুতর জলচর, ভুজঙ্গ, পশু, পক্ষী ও সেই অশ্ব বলি প্রদত্ত হইল এবং সেই সকল যূপে সেই তিন শত পশু ও শ্রেষ্ঠ অশ্বরত্নকে বন্ধন করিলেন।’ (বাল্মীকি রামায়ণ আদিকাণ্ড ১৪/৩০-৩২)


৩। বেদে কি পশু হিংসা রয়েছে?

উত্তর: অসংখ্য রয়েছে। সংহিতা, ব্রাহ্মণ, অরণ্যক সহ অনেক জায়গাতেই যজ্ঞে পশু বলির বিষয়টি খুব ভালোভাবে চোখে পড়ে। ঋগ্বেদের ঐতরেয় ব্রাহ্মণ দেখা যায়– ‘যে যজমান সোমযোগে দীক্ষিত হয়, সে সকল দেবতার নিকটে আপনাকে (পশুরূপে) আলম্ভনে প্রবৃত্ত হয়। অগ্নিই সকল দেবতা, সোমও সকল দেবতা; সেই যজমান যে অগ্নির ও সোমের উদ্দিষ্ট পশু আলম্ভন করে, তদ্দ্বারা সে সকল দেবতার নিকটেই আপনাকে নিষ্ক্রয় করে।’ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২/৬)।  এছাড়াও বেদের বহু জায়গাতে এরকম বিষয় রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তর আলোচনা অন্য সময় করা যাবে।

“এই পশুকে (ইহার বধে ) ইহার মাতা অনুমতি দিক, পিতা অনুমতি দিক, সহােদর ভ্রাতা অনুমতি দিক, সখা ও একযূথবৰ্ত্তী [ অন্য পশু ] অনুমতি দিক”—এই বাক্যে তাহার জন্মসম্পর্কযুক্ত-[ অন্য পশু ]-গণেরও অনুমতি লইয়া ইহার আলম্ভন (বধ) হয়। (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৬ষ্ঠ অধ্যায় দ্রষ্টব্য)


“ইহার ত্বক একভাবে [ অবিচ্ছিন্নভাবে ] ছিন্ন কর, ছেদনের পূর্বে নাভি হইতে বপা (মেদ) পৃথক্‌ কর, প্রশ্বাসকে ভিতরেই নিবারণ কর (শ্বাসরােধ করিয়া বধ কর )”—এই বাক্যে পশুসমূহেই প্রাণসকলের স্থাপনা হয়। (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৬ষ্ঠ অধ্যায় দ্রষ্টব্য)


“ইহার বক্ষ শ্যেনের (পক্ষীর) আকৃতিযুক্ত কর (সেইরূপে ছিন্ন কর ), বাহুদ্বয় উত্তমরূপে ছিন্ন কর, প্রকোষ্ঠদ্বয় শলাকাকার কর, অংসদ্বয় কচ্ছপাকার কর, শ্রোণিদ্বয় অচ্ছিদ্র কর, উরুদ্বয় কবষের (ঢালের) মত, ও উরুমূল করবীর পত্রের মত কর; ইহার পার্শ্বাস্থি ছাব্বিশখানি, সে গুলি পর পর পৃথক কর; সমস্ত গাত্র অবিকল [ ছিন্ন ] কর”—এই বাক্যে ইহার সমস্ত অঙ্গ ও গাত্রকে প্রীত করা হয়। (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৬ষ্ঠ অধ্যায় দ্রষ্টব্য)


৪। ধর্মের নামে পশুহিংসা কী ঠিক?

উত্তর: মানুষের কর্তব্য এবং অকর্তব্য শাস্ত্রই বড় প্রমাণ। গীতাতে সুন্দরভাবে বলা হয়েছে এই সব বিষয়ে। সঠিক না বেঠিক এর প্রমান শাস্ত্র। তাই ধর্মচর্চা করতে হলে শাস্ত্রকেই প্রথমে বেছে নিতে হবে। সমস্যা হলো আমরা নিজেদের ইমোশনকে বড় দুর্বল করে রাখি। মনু সংহিতাতে বলা হচ্ছে, যজ্ঞের জন্য অথবা অবশ্য পোষ্যগণের ভরণ পোষণের জন্য ব্রাহ্মণগণ প্রশস্ত পশু-পক্ষী বধ করিতে পারেন।..........পূর্বকালে ঋষিগণ এবং ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়গণের যজ্ঞে ভক্ষ্য পশুপক্ষীর মাংসে পুরোডাশ (পিষ্টক বিশেষ) প্রস্তুত হইতো। (মনুসংহিতা ৫/২২-২৩)


৫। মা কালীর পূজায় কেন পশু বলি দেওয়া হয়?

উত্তর: শক্তিপূজা বলি বিহীন হয় না। তান্ত্রিক পূজায় পশুবলি অবশ্যই কর্তব্য। ভগবান শিব বলছেন যে, শাস্ত্রে উক্ত হইয়াছে সাধক, মোদক দ্বারা গণপতিকে, ঘৃতদ্বারা হরিকে, নিয়মিত গীত বাদ্যদ্বারা শঙ্করকে এবং বলিদান দ্বারা চণ্ডিকাকে সর্বদা সন্তুষ্ট করিবে।’ (কালিকা পুরাণ ৫৫/১-২)। 


৬। ছাগ শব্দের অর্থ নাকি ষড়রিপু?

উত্তর: ছাগ একটি সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ ছাগল; ষড়রিপু আলাদা একটি সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ ছয়টি রিপু। অর্থাৎ, ছাগ এবং ষড়রিপু দুইটাই সংস্কৃত শব্দ। কোনোটা কোনোটার মানে নাই, দুইটিই পূর্ণ সংস্কৃত শব্দ। অতএব, ছাগ মানে ষড়রিপু এই কথাটার কোনো ভিত্তি প্রমাণ কিছু নেই। যদি ছাগ অর্থ ষড়রিপু হতো তাহলে, 

বায়ব্যং শ্বেতচ্ছাগল্মালভেত,

অর্থ এই যে, বায়ু দেবতার নিকট শ্বেত ছাগল বলি প্রদান করিবে। এখানে শ্বেত ছাগ মানে কী সাদা ষড়রিপু হতে পারে! তাছাড়াও, ছাগ বাদেও আরো বহু প্রকার বলির কথা শাস্ত্রে বলা হয়েছে।


৭। মা কী সন্তানের রক্ত চাইতে পারেন?

উত্তর: এ জগতের সকল কিছুই তো মায়ের সন্তান। তিনি সকলকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি সকলকে পালন করছেন, আবার তিনিই সকলকে ধ্বংস করছেন। এটাই তো মূলত সৃষ্টি ধ্বংস চক্র। ভগবতী স্বয়ং নিজেই বলছেন, 

‘তৎপরে দুইদিন নানাবিধ বলি, পূজা ও জাগরণাদি দ্বারা আমার পূজা করিবে। বিশেষতঃ মহাষ্টমী তে উপবাস অবলম্বন পূর্বক এবং নবমীতে বলিদান দ্বারা মহাভক্তি সহকারে আমার পূজা করিবে।’ (বৃহদ্ধর্ম পুরাণ পূর্বখণ্ড/ দ্বাবিংশ অধ্যায়)

‘শাক্ত, সৌর, শৈব, বৈষ্ণব– শারদীয় মহোৎসবে সকলেরই দেবীপূজা অবশ্য কর্তব্য। মৎস্য, মাংস, ছাগ, মহিষ, মেষ ও অন্যান্য উপহার দ্বারা জগদীশ্বরীর প্রীতি সাধন একান্তকর্তব্য। ইহাতে বিত্তশাঠ্য কর্তব্য নহে’। (মহাভাগবত পুরাণ ৪৮/১৪-১৬)।


৮। পশুবলি দিলে কি পাপ হয়?

উত্তর: শাস্ত্রীয় অনুযায়ী পশুবলিতে কোন পাপ নেই। মনুসংহিতাতে বলা হয়েছে, 

‘স্বয়ম্ভু স্বয়ং যজ্ঞকার্যের জন্য পশুসকল সৃষ্টি করিয়াছেন,-সমুদয় বিশ্বের হিতের জন্যই যজ্ঞ বিহিত; অতএব যজ্ঞে যে পশুবধ, তাহা ‘অবধ’ অর্থাৎ সেই স্থলে বধজন্য পাপ হয় না।’ (মনুসংহিতা ৫/৩৯)।

ব্রহ্মসূত্রেও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে,

‘যদি এইরূপ বলা হয় যে যজ্ঞাদি পশু ইত্যাদি বলি হয় বলিয়া উহা পাপ, আমরা বলিব না, ইহা হইতে পারে না-কারণ শাস্ত্র প্রমাণ এইরূপ আছে।’


‘যজ্ঞাদি কর্মে পশুবধজনিত পাপ হয় বলিয়া ব্রীহি যবাদি জন্ম হয়-যদি বলা হয় তবে তদুত্তরে বলা যায় যে, না, তাহা নহে, কারণ শ্রুতিতে পশুবধের বিধান আছে- এবং এই কর্মের শুধুমাত্র পুণ্য ফলই হইবে এইরূপ বলা আছে।’ (ব্রহ্মসূত্র ৩/১/২৫)


তাছাড়াও নারদ শ্রীরামকে বলছেন,

‘যাহারা মাংসভোজী তাহারা দেবীর পূজায় পশু হিংসা করিতে পারিবে এবং তজ্জন্য ছাগ অথবা বন্য বরাহের বলি প্রাই উত্তম কয়। হে অনঘ! দেবীর অগ্রে নিহিত পশুগণ অক্ষয় স্বর্গ লাভ করিয়া থাকে; অতএব পশুঘাতী ব্যক্তিগণের পশু হনন নিমিত্ত পাতক জন্মে না। দেবতাদিগের বলিকার্য্যে কৃত্যোৎসর্গ পশুগণের নিশ্চয়ই স্বর্গলাভ হয়, এজন্য সকল শাস্ত্র সিদ্ধান্তে যাজ্ঞিকী হিংসা অহিংসা বলিয়াই পরিগণিত হইয়াছে।’ (দেবীভাগবত পুরাণ ৩য় স্কন্ধ/২৬/...)


৯। শুধু কি ছাগবলিই দেওয়া যায়?

উত্তর: শাস্ত্রে আরও বহু প্রকার পশুবলির কথা বলা হয়েছে। 

‘(১) পক্ষী (২) কচ্ছপ (৩) কুম্ভীর (৪) নবপ্রকার মৃগ যথা- বরাহ, ছাগল, মহিষ, গোধা, শশক, বায়স, চমর, কৃষ্ণসার, শশ এবং (৫) সিংহ, মৎস্য (৬) স্বগোত্র-রুধির (৭) এবং ইহাদিগের অভাবে হয় এবং (৮) হস্তি এই আটপ্রকার বলি শাস্ত্রে নির্দিষ্ট হইয়াছে।’ (কালিকাপুরাণ ৫৫/৩-৪)

বিষ্ণু বলছেন,

‘নর বলিদানে সহস্রবর্ষ, মহিষ বলিদানে শত বর্ষ, ছাগ বলিদানে দশ বর্ষ, মেষ পক্ষী হরিণ ও কুষ্মাণ্ড বলিদানে একবর্ষ......... ভগবতী দুর্গাদেবী বলিদাতা পূজকের প্রতি প্রসন্না হয়ে থাকেন।’ (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ প্রকৃতি খণ্ড ৬৪/৯২-৯৩-৯৪)


১০। পশুবলির পর পশুর কী গতি হয়?

উত্তর: এই বিষয়ে শাস্ত্রে বলা হয়েছে খুব সুন্দর ভাবে। 

মহাভারতে এই বিষয়ে বলা হচ্ছে,

‘চাতুর্মাস্যযাগে প্রত্যহ পশুবধ করা হইয়া থাকে এবং অগ্নিদেব মাংস কামনা করেন, এইরূপ বেদবাক্যও শােনা যায়। ব্রাহ্মণেরাও যজ্ঞে সর্বদাই পশুবধ করিয়া থাকেন এবং সেই পশুগুলিও মন্ত্রদ্বারা সংস্কৃত হইয়া স্বর্গ লাভ করিয়া থাকে। (মহাভারত/বনপর্ব/ষট্সপ্তত্যধিকশততমোঽধ্যায় ১০-১১নং শ্লোক)


‘বলিদ্বারা মুক্তি সাধিত হয়, বলি দ্বারা স্বর্গ সাধিত হয় এবং বলিদান দ্বারা নৃপতিগণ শত্রু নৃপতিদিগকে পরাজয় করিয়া থাকেন।’ (কালিকাপুরাণ ৬৭/৬)


‘যাহারা এই মহােৎসবে মহাদেবীর পূজা করে না, মােহ বা আলস্য বশতঃ যাহারা এই সময়ে অঙ্গ দেবতার অর্চনায় রত হয়,—মহাদেবীর অর্চনা করে না, তাহারা পশুরূপী হইয়া মহাপৃষ্ঠে উৎপন্ন হইয়া থাকে। তাহাদের উদ্ধারের জন্য চণ্ডিকাদেবী পরমাদরসহকারে যজ্ঞে তাহাদিগকে বলিরূপে গ্রহণ করেন। অতএব দেবীভক্তিপরায়ণ ব্যক্তিগণ পশুবলি প্রদান করিবেন’। (মহাভাগবত পুরাণ ৪৮/১৯...)


১১। পশু বলির মাংস কি খাওয়া যায়?

উত্তর: হ্যাঁ। মনুসংহিতাতে সুন্দর ভাবে বলা হয়েছে,

‘যজ্ঞের হুতাবশিষ্ট মাংস ভক্ষণ করিতে পারে; বহু ব্রাহ্মণের অনুরােধে মাংস ভক্ষণ করিতে পারা যায়; যথাশাস্ত্র শ্রাদ্ধাদিতে নিযুক্ত মাংস ভক্ষণীয় এবং ব্যাধিহেতুক বা আহারাভাবে প্রাণ যায়, এমন অবস্থায়ও মাংস খাইতে পারে। পৃথিবীতে যে কিছু পদার্থ আছে, সে সমুদায়ই প্রজাপতি, জীবের অনুস্বরূপে সৃষ্টি করিয়াছেন; অতএব স্থাবর জঙ্গম উভয়ই জীবের ভােজ্য। অচর তৃণাদি স্থাবর-চরণশীল পশুপক্ষী প্রভৃতি জঙ্গমের ভক্ষ্য ; দন্তশালী প্রাণিগণ দন্তহীন প্রাণীদিগকে ভক্ষণ করে ; হস্তহীন মৎস্যাদি হস্তবিশিষ্ট মনুষদিগের ভক্ষ্য এবং ভীরু জীবেরা চিরকালই বীরগণের ভক্ষ্য।’ (মনুসংহিতা ৫/২৭-২৮-২৯)


‘যে লোক সর্বদা দেবতা ও পিতৃলােককে দান করিয়া মাংস ভক্ষণ করে, তাহার সে ভক্ষণে মুনিরাই বিধি দিয়াছেন।’ (মহাভারত/বনপর্ব/ষট্সপ্তত্যধিকশততমোঽধ্যায় ১৩নং শ্লোক)


‘যজ্ঞের হতাবেশিষ্ট এই সকল প্রাণী মাংস ভক্ষণ করিতে পারে।’ (কূর্মপুরাণ উপরিভাগ ১৭/৪০)


১২। পশুবলি দিলে কি হয়?

উত্তর: ‘ভগবতীর প্রীতির জন্য তদীয় মহোৎসবে সমাহিত হইয়া যথাবিধি পশুঘাত কর্তব্য। শৈব, সৌর ও বৈষ্ণব কাহারও ইহাতে দ্বেষ করা কর্তব নহে’। (মহাভাগবত পুরাণ ৪৮/১৭-১৮)


১৩। বৈষ্ণবরা কেনো বলির বিরোধীতা করে?

উত্তর: যারা সঠিক বৈষ্ণব এবং শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তারা কখনো বলির বিরোধিতা করে না এবং তারা বলির কর্ম করে না। কারণ বৈষ্ণব শাস্ত্রগুলোতেই সরাসরি বলির বিধান রয়েছে। বৈষ্ণবদের মুখ্য শাস্ত্র বিষ্ণু পুরাণে নারায়ণ বলছেন–

ভগবতীর উদ্দেশ্যে ‘সুরা, মাংস, ভক্ষ্য ও ভোজ্য দ্বারা সদায় তুমি প্রসন্ন হয়ে মনুষ্যগণের অশেষ প্রার্থিত বিষয় প্রদান করিবে।’ (বিষ্ণুপুরাণ ৫/১/৮৬)


‘ওঁ জয় ত্বং কলভূতেশে ইত্যাদি মন্ত্রে সিংহবাহিনী মহিষমর্দিনী দেবীর বলিপ্রদান করিয়া পূজা সমাপন করিবে। (গরুড় পুরাণ পূর্ব খন্ড/৩৮/১৮)


‘মহারাজ! আপনি অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি, সুতরাং এ কথা আপনার অজ্ঞাত নয় যে, যজ্ঞে দীক্ষিত হওয়ার পর কেবলমাত্র শাস্ত্র বিহিত যজ্ঞ পশু ভিন্ন অন্য কাউকে বধ করা উচিত নয়।’ (ভাগবত পুরাণ ৪র্থ স্কন্ধ ১৯/২৭)


‘কর্মবিশেষে সুরার আঘ্রাণ আহার বলিয়া বিহিত, কিন্তু পান অবৈধ; এইরূপ দেব উদ্দেশ্যেই পশুবধ বৈধ বলিয়া উল্লেখিত, কিন্তু বৃথা হিংসার বিধি নাই।’ (ভাগবত পুরাণ একাদশ স্কন্ধের পঞ্চম অধ্যায়ের দ্রষ্টব্য)

এরপরও কি বৈষ্ণবরা বলির বিরোধীতা করতে পারে?


১৪। ভগবান বিষ্ণু কি বলির আদেশ দিয়েছেন?

উত্তর: অবশ্যই। ভগবান বিষ্ণু বলেছেন- 

সুরা, মাংস, ভক্ষ্য ভোজ্যাদি উপহার দ্বারা পূজিতা হইয়া তুমি নরগণের অশেষ কাম (কামনা) প্রদান করিবে। তাহারা সকলে আমার (ভগবান বিষ্ণু) প্রসাদে কুশলযুক্ত হইবে, সন্দেহ নাই। (ব্রহ্মপুরাণ ১৮১/৫২)

বরং যজ্ঞের মাংস বিষ্ণু নিজেই গ্রহণ করেন এমনটাও শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে: 

‘মৃগমাংস, ছাগমাংস ও শসমাংস আমার অতীব সুখজনক। অতএব এ সমস্তই আমাকে নিবেদন করিবে। বিস্তৃত যজ্ঞে ছাগ ও অন্যান্য পশু প্রদান করিয়া বেদপারদর্শী ব্রাহ্মণে সমর্পণ করিলে আমি তাহার অংশভাগী হইয়া থাকি।’ (বরাহপুরাণ ১২০তম অধ্যায়)


১৫। ভগবান শিব কী বলির আদেশ দিয়েছেন?

উত্তর: ভগবান শিব তো স্বয়ং নিজেই পশু বলি দিয়ে পূজা করেছেন।

‘তারপরে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু তুষ্ট হয়ে তাঁর প্রতি শুভজনক আশীর্বাদ প্রয়োগ করলে ভগবান শঙ্কর পবিত্র ও সুস্নাত হয়ে তাদের উপদেশে ভক্তিযোগে পার্দ্য, অর্ঘ্য, আচমনীয়, নানা উপহার, পুষ্প, চন্দন, বিধিধ নৈবদ্য, ছাগ, মেষ, মহিষ ও গণ্ডাদি বলিদান, বস্ত্র, অলঙ্কার, মাল্য, পায়স, পিষ্টক, মধু, সুধা ও নানা সুপক্ব ফল দ্বারা মহাসমারোহে সেই মঙ্গল চণ্ডিকাদেবীর পূজা করেন।’ (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ প্রকৃতি খণ্ড ৪৪/১৭)


১৬। শ্রীকৃষ্ণ করেছেন তবে?

উত্তর: ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই যজ্ঞের জন্য পশু বধ করেছেন। তার প্রমাণ ভাগবতেই রয়েছে। নারদ দেখিলেন ‘শ্রীকৃষ্ণ যদুশ্রেষ্ঠগণে বেষ্টিত হইয়া কোথাও বা সিন্ধুদেশীয় অশ্বে আরোহণ করিয়া মৃগয়া করিতে করিতে যজ্ঞিয় পশুসকল সংহার করতেছেন।’ (ভাগবত পুরাণ দশম স্কন্ধ ৬৯/৩৫)


১৭। শ্রীরাম করছেন তবে?

উত্তর: নারদ শ্রীরাম কে বলছেন- ‘পবিত্র ও প্রশস্ত পশুদ্বারা দেবীর বলি প্রদান ও জপ এবং জপের দশাংশ হােম করিলে নিশ্চয়ই সীতার সমুদ্ধারে সমর্থ হইবেন।’ (দেবীভাগবত পুরাণ ৩য় স্কন্ধ/৩০/২০)

এছাড়াও রামায়ণে স্পষ্টতই পাওয়া যায়:

এরপর গৃহের বাস্তুযোগ করার জন্য লক্ষণকে বলেন- ‘সুমিত্রানন্দন।! বহুকাল জ্ঞীবিতেচ্ছু ব্যক্তিদিগের বাস্তুযোগ অবশ্য কর্তব্য ; অতএব আইস, আমরা মৃগমাংস আহরণ পূর্বক এই পর্ণশালার উদ্দেশ্যে যাগ করি। শাস্ত্রোবোধিত বিধি অনুষ্ঠান করা অবশ্য কর্তব্য। অতএব শীঘ্র মৃগ হনন করিয়া আনয়ন কর।’

রামের বাক্য শুনে লক্ষ্মণ তখন রামের আদেশ অনুসারে মৃগ হত্যা করে মাংস আনলেন। তখন রাম বললেন- ‘অদ্য ধ্রুবনক্ষত্র সমন্বিত এই মুহূর্তও অতি শুভদায়ক, অতএব তুমি শীঘ্র এই মৃগমাংস রন্ধন কর; এখনই আমরা এই পর্ণশালার উদ্দেশে যাগ করিব।’

পরে লক্ষ্মণ পবিত্র কৃষ্ণমৃগ (হরিণ) বধ করিয়া প্রজ্বলিত অগ্নিমধ্যে নিক্ষেপ করলেন। পরে সেই মাংস উপযুক্ত পক্ক (পোড়ানো) হইলে তিনি রামকে বললেন- ‘দেব ! আমি এই সর্ব কার্যকর সর্বাঙ্গসম্পন্ন হরিণের মাংস ভর্জন করিয়াছি ; আপনি যাগকার্যে কুশল, সুতরাং এক্ষণে দেবগণের উদ্দেশে যাগ করুন।’

এরপর রাম সেইপ্রকারে তা সম্পন্ন করলো। 


১৮। ইসকনেরা তবে পশুবলির নিন্দা করে কেনো?

উত্তর: নিন্দা করে জন্যই তাদেরকে সঠিক বলা যায় না। তাদের প্রতিষ্ঠাতা ও তাদের প্রধান গুরুদেব শ্রীল প্রভুপাদ নিজেই পশুগুলির বিষয়ে খুব স্পষ্টভাবেই সম্মতি দিয়েছেন। এবং তিনি স্বীকারও করেছেন পশু বলি শাস্ত্রীয়।


ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা গুরু শ্রীল প্রভুপাদের ভাষ্যের গীতা যথাযথ–

সাংখ্যযোগের ৩১নং শ্লোকের ব্যাখ্যায় গিয়ে বলেন-


‘রাজনীতির ক্ষেত্রে অহিংসার পথ অবলম্বন করা কূটনীতি হতে পারে, কিন্তু তা কখনই নীতিগত পন্থা নয়। নীতিশাস্ত্রে আছে–

আহবেষু মিথােহন্যোন্যং জিঘাংসন্তো মহীক্ষিতঃ

যুদ্ধমানাঃ পরং শক্ত্যা স্বর্গং যান্ত্যপরাঙ্মুখাঃ।

যজ্ঞেযু পশবাে ব্রহ্মন্ হন্যন্তে সততং দ্বিজৈঃ

সংস্কৃতাঃ কিল মন্ত্রৈশ্চ তেহপি স্বর্গমবাপ্নুবন্।।


“কোন রাজা অথবা ক্ষত্রিয় যখন যুদ্ধক্ষেত্রে ঈর্ষান্বিত শত্রুর সঙ্গে সংগ্রামে রত হন, মৃত্যুর পর তিনি স্বর্গলােকে গমন করেন, তেমনই ব্রাহ্মণ যজ্ঞে পশুবলি দিলে স্বর্গ লাভ করেন।” তাই, যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে হত্যা করা এবং যজ্ঞে পশু বলি দেওয়াকে হিংসাত্মক কার্য বলে গণ্য করা হয় না, কারণ এই ধর্ম অনুষ্ঠানের ফলে সকলেই লাভবান হয়। যজ্ঞে উৎসর্গীকৃত পশু জৈব বিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে উন্নত থেকে উন্নততর জীব দেহ ধারণ না করে, সরাসরিভাবে মনুষ্যশরীর প্রাপ্ত হয় এবং সেই যজ্ঞের ফলে দেবতারা তুষ্ট হয়ে মর্ত্যবাসীদের ধনৈশ্বর্য দান করেন। সুতরাং, ধর্মাচরণ করলে এভাবে সকলেই লাভবান হয়।’


কর্মযোগের ১২নাম্বার শ্লোকের ব্যাখ্যায় গিয়ে বলেন–

‘যারা মাংসাশী তাদের জড়া প্রকৃতির বীভৎস-রূপী কালীর পূজা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং কালীর কাছে পশুবলি দেওয়ার বিধান দেওয়া হয়েছে।’


এবার তিনি শেষমেশ পশুবলি সমর্থন করেন গীতার মোক্ষযোগের ৪৭নং শ্লোকের ব্যাখ্যায়–

‘এমন কি ব্রাহ্মণদেরও নানা রকমের যজ্ঞ অনুষ্ঠান করতে হলে কখন কখন পশুহত্যা করতে হয়, কারণ যজ্ঞে পশু বলি দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে৷ তেমনই, ক্ষত্রিয় যদি স্বধর্মে নিরত হয়ে শত্রুকে হত্যা করে, তাতে কোন পাপ হয় না।’


১৯। অগ্নিবীর নামে বৈদিক সংগঠন গুলোও পশুবলির বিরোধীতা করে কেনো?

উত্তর: তাদের মতাদর্শনের বিরুদ্ধে তাই। কিন্তু তাদের গুরু দয়ানন্দের ভাষ্য বেদেই স্বয়ং পশু হিংসা রয়েছে। প্রমাণ গুলো দেখে নিন।

আর্যসমাজ কর্তৃক যর্জুবেদ বাংলা অনুবাদ:

ইমং মা হিংসীর্ দ্বিপাদং পশুং সহস্রাক্ষো মেধায় চীয়মানঃ। ময়ুং পশুং মেধম্ অগ্নে জুষস্ব তেন চিন্বানস্ তন্বো নি ষীদ। ময়ুং তে শুগ্ ঋচ্ছতু যং দ্বিষ্মস্ তং তে শুগ্ ঋচ্ছতু॥ (শুক্লযজুর্বেদ ১৩/৪৭)

অনুবাদ– দুই চরণ বিশিষ্ট মনুষ্য এবং আমাদের উপকারী চতুষ্পাৎ পশুদের আমরা হিংসা করব না। তাদের পালন করব। তাদের উপকার গ্রহণ করব। কিন্তু বন্য শস্যনাশক পশুদের হত্যা করা কর্তব্য।


ইমং মা হিসীরেকশফং পশুং কনিক্রদং বাজিনং বাজিনেষু। গৌরম্ আরণ্যম্ অনু তে দিশামি তেন চিন্বানস্ তন্বো নি ষীদ। গৌরং তে শুগ্ ঋচ্ছতু যং দ্বিষ্মস্ তং তে শুগ্ ঋচ্ছতু॥ (শুক্লযজুর্বেদ ১৩/৪৮)

অনুবাদ– যুদ্ধে ব্যবহারের যোগ্য ঘোড়া প্রভৃতি এক খুর বিশিষ্ট পশুদেরকে, কনিক্রদ অর্থাৎ যারা ব্যথা পেয়েছে এমন পশুদেরকে হিংসা করবে না। যে জংলী শ্বেত বর্ণ পশুদের বিষয়ে আমি (ঈশ্বর) তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি সেই পশুদেরকে হিংসা করবে না। গৌরবর্ণ হিংস্র পশুদেরকে এবং আমরা যাদের প্রতি দ্বেষ করি তাদেরকে হিংসা করবে।


ইমং সাহস্রং শতধারম্ উত্সং ব্যচ্যমানং সরিরস্য মধ্যে। ঘৃতং দুহানাম্ অদিতিং জনায়াগ্নে মা হিসীঃ পরমে ব্যোমন্। গবয়ম্ আরণ্যম্ অনু তে দিশামি তেন চিন্বানস্ তন্বো নি ষীদ। গবয়ং তে শুগ্ ঋচ্ছতু যং দ্বিষ্মস্ তং তে শুগ্ ঋচ্ছতু॥ (শুক্লযজুর্বেদ ১৩/৪৯)

অনুবাদ– কৃষিকাজে প্রযুক্ত ষাঁড় প্রভৃতি এবং দুগ্ধপ্রদাতা গরু প্রভৃতিকে হিংসা করবে না। কিন্তু জংলী নীলগাই প্রমুখ পশুদের হত্যা করার জন্য আমি (ঈশ্বর) তোমাদেরকে উপদেশ করছি। আমরা যাদের প্রতি দ্বেষ করি তাদেরকে হিংসা করবে।


ইমমূর্ণায়ুং বরুণস্য নাভিং ত্বচং পশূনাং দ্বিপদাং চতুষ্পদাম্। ত্বষ্টুঃ প্রজানাং প্রথমং জনিত্রম্ অগ্নে মা হিংসীঃ পরমে ব্যোমন্। উষ্ট্রম্ আরণ্যম্ অনু তে দিশামি তেন চিন্বানস্তন্বো নি ষীদ। উষ্ট্রং তে শুগ্ ঋচ্ছতু যং দ্বিষ্মস্ তং তে শুগ্ ঋচ্ছতু॥ (শুক্লযজুর্বেদ ১৩/৫০)

অনুবাদ– ভেড়া প্রভৃতি যাদের লোম এবং চামড়া তোমাদের কাজে লাগে তাদেরকে হত্যা করবে না। যে উট ভার বহনের কাজে লাগে সেগুলিকে হত্যা করবে না। কিন্তু জংলী উটকে হিংসা করবে এবং যাদের প্রতি আমরা দ্বেষ করি তাদেরকে হিংসা করবে।


অজো হ্যগ্নেরজনিষ্ট শোকাৎ সোঽঅপশ্যজ্ জনিতারম্ অগ্রে। তেন দেবা দেবতাম্ অগ্রম্ আয়ংস্তেন রোহম্ আয়ন্নুপ মেধ্যাসঃ।

শরভম্ আরণ্যম্ অনু তে দিশামি তেন চিন্বানস্তন্বো নি ষীদ। শরভং তে শুগ্ ঋচ্ছতু যং দ্বিষ্মস্ তং তে শুগ্ ঋচ্ছতু॥ (শুক্লযজুর্বেদ ১৩/৫১)

অনুবাদ– ছাগল অগ্নি থেকে উৎপন্ন এবং বর্ধমান। তার দ্বারা বিদ্বানরা দিব্যগুণ প্রাপ্ত করেন এবং বৃদ্ধি করেন। তাদেরকে হিংসা করবে না। কিন্তু, জংলী শজারুদেরকে হত্যা করার জন্য আমি (ঈশ্বর) তোমাদেরকে উপদেশ করছি। তারা তোমাদের দ্বারা শোক প্রাপ্ত হোক। যাদের প্রতি আমরা দ্বেষ করি তারা শোক থেকে অধিক শোক প্রাপ্ত করুক।


এরপরেও আর মনে হয় না এর পরেও অধিক আলোচনার প্রয়োজন। এরকম আরো অসংখ্য প্রমাণ শাস্ত্র হতে দেওয়া যাবে। যারা জেগে থেকে ঘুমায় তাদের কখনো জাগানো সম্ভব না। যারা পরনিন্দাতে ব্যস্ত তাদের নিজের অবস্থান দেখার সময় থাকে না। বর্তমান সনাতন সমাজের মূল বিষয়ে এটাই। আসুন আমরা সবাই সামনে ভগবতীর পূজাতে শাস্ত্রীয় অনুযায়ী পশু বলি দিয়ে মাকে তুষ্ট করি। সঠিক শাস্ত্রকে আমরা বেছে নেই এবং কুসংস্কারকে দূরে রাখি। ভগবতী বলেছেন, ‘বলি প্রদান, পূজা, অগ্নিকাৰ্য্য ও মহােৎসব এই সকল ঘটনায় আমার এই চরিত্র সম্পূর্ণরূপে পাঠ ও শ্রবণ করিবে। জানিয়াই হউক বা না জানিয়াই হউক, যে ব্যক্তি আমার এই চরিতপাঠসহকারে ভক্তিভরে বলি, পূজা, বহ্নিহোম ও মহােৎসবাদি করিবে, আমি প্রীতিসহকারে তৎসমস্ত প্রতিগ্ৰহ করিব।’ (মার্কণ্ড পুরাণ ৯২/৯-১০) ‘বিধিজ্ঞ, অবিধিজ্ঞ যেই হউক, আমার এই মাহাত্ম্য পাঠপূর্বক বলি, পূজা এবং হোমাদি করিলে তাহা আমি অতি প্রীতি সহকারে গ্রহণ করিয়া থাকি।’ (চণ্ডী মাহাত্ম্য দ্রষ্টব্য), ‘বলিদান, পূজা, যজ্ঞাদি এবং পুত্রজন্মাদি মহোৎসবে আমার এই সমস্ত মাহাত্ম্য পাঠ এবং শ্রবণ করিবে।’ (চণ্ডী মাহাত্ম্য দ্রষ্টব্য)।


জয় মা বলিপ্রিয়ে!

।। বৈষ্ণব শাস্ত্রে পশুবলির প্রাধান্য ।।


সর্বপ্রথম দেখি বৈষ্ণবদের প্রধান শাস্ত্র ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ কি বলে বলি নিয়ে :-

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ :-

বিষ্ণু বলছেন,

‘নর বলিদানে সহস্রবর্ষ, মহিষ বলিদানে শত বর্ষ, ছাগ বলিদানে দশ বর্ষ, মেষ পক্ষী হরিণ ও কুষ্মাণ্ড বলিদানে একবর্ষ......... ভগবতী দুর্গাদেবী বলিদাতা পূজকের প্রতি প্রসন্না হয়ে থাকেন।’ (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ প্রকৃতি খণ্ড ৬৪/৯২-৯৩-৯৪)

হে নারদ, আষাঢ়ী সংক্রান্তিতে যে ব্যক্তি ভক্তি পরায়ণ হয়ে যত্ন সহকারে মনসাদেবীর আবাহন করিয়া তাঁহার পূজা করে ও যে ব্যক্তি পঞ্চমীতে সেই দেবীর উদ্দেশ্য বলি প্রদান করে সেই সেই ব্যক্তি ধনবান্, পুত্রবান্ ও কীর্তিমান্ হয়।’ (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ প্রকৃতি খণ্ড ৪৬/৮-৯)

তারপরে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু তুষ্ট হয়ে তাঁর প্রতি শুভজনক আশীর্বাদ প্রয়োগ করলে ভগবান শঙ্কর পবিত্র ও সুস্নাত হয়ে তাদের উপদেশে ভক্তিযোগে পার্দ্য, অর্ঘ্য, আচমনীয়, নানা উপহার, পুষ্প, চন্দন, বিধিধ নৈবদ্য, ছাগ, মেষ, মহিষ ও গণ্ডাদি বলিদান, বস্ত্র, অলঙ্কার, মাল্য, পায়স, পিষ্টক, মধু, সুধা ও নানা সুপক্ব ফল দ্বারা মহাসমারোহে সেই মঙ্গল চণ্ডিকাদেবীর পূজা করেন।’ (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ প্রকৃতি খণ্ড ৪৪/১৭)

এইবার দেখি বিষ্ণুপুরাণ কি বলছে;

বিষ্ণু পুরাণ–

ভগবতীর উদ্দেশ্যে ‘সুরা, মাংস, ভক্ষ্য ও ভোজ্য দ্বারা সদায় তুমি প্রসন্ন হয়ে মনুষ্যগণের অশেষ প্রার্থিত বিষয় প্রদান করিবে।’ (বিষ্ণুপুরাণ ৫/১/৮৬)

এইবার চলুন দেখি মহাপুরাণ ভাগবত কি বলে;

ভাগবত পুরাণ–

‘মহারাজ! আপনি অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি, সুতরাং এ কথা আপনার অজ্ঞাত নয় যে, যজ্ঞে দীক্ষিত হওয়ার পর কেবলমাত্র শাস্ত্র বিহিত যজ্ঞ পশু ভিন্ন অন্য কাউকে বধ করা উচিত নয়।’ (ভাগবত পুরাণ ৪র্থ স্কন্দ ১৯/২৭)

কর্মবিশেষে সুরার আঘ্রাণ আহার বলিয়া বিহিত, কিন্তু পান অবৈধ; এইরূপ দেব উদ্দেশ্যেই পশুবধ বৈধ বলিয়া উল্লেখিত, কিন্তু বৃথা হিংসার বিধি নাই।’ (ভাগবত পুরাণ একাদশ স্কন্দের পঞ্চম অধ্যায়ের দ্রষ্টব্য)

নারদ দেখিলেন ‘শ্রীকৃষ্ণ যদুশ্রেষ্ঠগণে বেষ্টিত হইয়া কোথাও বা সিন্ধুদেশীয় অশ্বে আরোহণ করিয়া মৃগয়া করিতে করিতে যজ্ঞিয় পশুসকল সংহার করতেছেন।’ (ভাগবত পুরাণ দশম স্কন্দ ৬৯/৩৫)

গরুড় পুরাণ কি বলছে ?

গরুড় পুরাণ :–

‘ওঁ জয় ত্বং কলভূতেশে ইত্যাদি মন্ত্রে সিংহবাহিনী মহিষমর্দিনী দেবীর বলিপ্রদান করিয়া পূজা সমাপন করিবে। (গরুড় পুরাণ পূর্ব খন্ড/৩৮/১৮)

কূর্ম পুরাণ কি বলছে ? 

কূর্মপুরাণ–

‘যজ্ঞের হতাবেশিষ্ট এই সকল প্রাণী মাংস ভক্ষণ করিতে পারে।’ (কূর্মপুরাণ উপরিভাগ ১৭/৪০)

বরাহপুরাণ কি বলছে ? 

বরাহপুরাণ–

বরাহরূপী বিষ্ণু বলছেন,

‘মৃগমাংস, ছাগমাংস ও শসমাংস আমার অতীব সুখজনক। অতএব এ সমস্তই আমাকে নিবেদন করিবে। বিস্তৃত যজ্ঞে ছাগ ও অন্যান্য পশু প্রদান করিয়া বেদপারদর্শী ব্রাহ্মণে সমর্পণ করিলে আমি তাহার অংশভাগী হইয়া থাকি।’ (বরাহপুরাণ ১২০তম অধ্যায়)

মহাভারতেও কিন্তু বলির প্রাধান্য আছে :-

শান্তনু রাজার সময়ে ‘তখন দেবতা, ঋষি ও পিতৃলোকের অর্চনার জন্যই প্রাণী বধ হইতো; কিন্তু অধর্ম অনুসারে কোন প্রাণীই বধ হইত না।’ (মহাভারত আদি পর্ব ৯৪/১৭)

হরিবংশ পুরাণ–

‘মহিষাদি যে সকল পশুর মাংস আমরা ব্যবহার করিয়া থাকি, সেই সকল পশু বলিদান করা যাক। এখন সমস্ত গোপসমাজ সমবেত হইয়া গিরিযজ্ঞের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হউন।’ (হরিবংশ পুরাণ)

‘সর্বদা মহিষরক্ত প্রিয়ে......... আপনাকে নমস্কার’ (মহাভারত ভীষ্মপর্ব ২৩/৮)

আমন্ত্রিতন্ত্রঃ যঃ শ্রাদ্ধে দৈবে বা মাংসসমুৎসৃজেৎ ।

যাবন্তি পশুরোমাণি ট্যাবতো নরকান্‌ ব্রজেৎ ।।

( কূর্মপুরাণ... উপরিভাগ...সপ্তদশ অধ্যায়... ৪১)

অর্থাৎ- যে ব্যাক্তি শ্রাদ্ধে নিমন্ত্রিত বা দৈবকর্মে নিযুক্ত হয়ে মাংস না খায়- সে ঐ পশুর শরীরে যত লোম আছে তত বছর নরক ভোগ করে।

লক্ষ্য করুন মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাস ঋষি সঙ্কীর্ণমনা ছিলেন না। পুরাণে আমাদের মাংস খাবারও অধিকার দিয়ে গেছেন। 

অজগর যাকে গ্রাস করেছে সে যেমন অন্যকে রক্ষা করতে পারে না, তেমনি কাল, কর্ম ও ত্রিগুণের অধীন পাঞ্চভৌতিক এই দেহের পক্ষে অন্য কাউকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। ভগবানই সকলের উপযুক্ত জীবিকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। হাতযুক্ত মানুষ হাত নেই এমন প্রাণীদের খায়, পা যুক্ত পশুরা পা নেই এমন খাদ্য অর্থাৎ ঘাস-লতাপাতা খায়। এভাবে বড় প্রাণীরা ছোট প্রাণীদের হত্যা করে। জীবই জীবের জীবিকা - এই নিয়ম। এ জগৎ ভগবানই। তিনিই সর্বজীবের আত্মা, অথচ অদ্বিতীয়, ঐভাবে স্বপ্রকাশ। তিনিই অন্তরস্থ, তিনিই বহিঃস্থ। এক ঈশ্বরকে মায়া প্রভাবে দেব,মানুষ প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপে উপস্থিত দেখ।"

( শ্রীমদ্ভাগবত: প্রথম স্কন্ধ, ১৩ অধ্যায়, ৪৫-৪৯ নম্বর শ্লোক )

Thursday, October 16, 2025

রাম নাকি মাংস খেতো না? তাহলে এটা কি....?

▪️শ্রী উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এর অনুবাদ....


তৎকালে, রাম জনকনন্দিনী সীতাকে গিরিনদী মন্দাকিনী দর্শন করাইয়া, এবং মাংসবিশেষ প্রদর্শনে সীতার প্রীতি উৎপাদন করিয়া পর্বতের একটি শিলার উপরে বসিয়াছিলেন। তিনি বলিতে লাগিলেন, জানকি ! এই মাংস অতি পবিত্র, এই মাংস অতি স্বাদু এবং এই মাংস অগ্নিতে উত্তমরূপে পাক করা হইয়াছে । 

[ বাল্মিকী রামায়ণ, অযোধ্যা-কান্ড, ৯৬ সর্গ, ১-২ শ্লোক; অনুবাদক:- উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়; প্রকাশনী:- বসুমতি-সাহিত্য-মন্দির, কলকাতা; সম্পাদক:- শ্রীযুত শ্যামাকান্ত তর্কপঞ্চানন। ]


PDF link.....

https://archive.org/details/in.ernet.dli.2015.357761/page/n341/mode/1up?view=theater


▪️শ্রী হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য এর অনুবাদ....


অনন্তর রাম পর্বতশৃঙ্গে উপবিষ্ট হইয়া, সীতাকে কহি- লেন, প্রিয়ে! দেখ, এই মৃগমাংস অত্যন্ত স্বাদু ও পবিত্র, এবং ইহা অগ্নিতে সংস্কার করা হইয়াছে।


[ বাল্মিকী রামায়ণ, অযোধ্যা কান্ড, ৯৬ সর্গ, ১-২ শ্লোক; অনুবাদক:- শ্রী হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য; কলকাতা থেকে প্রকাশিত ]


PDF link......

https://archive.org/details/in.ernet.dli.2015.338083/page/n422/mode/1up?view=theater&q=%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B8+


▪️জি.পি. বসু এন্ড ব্রাদার্স এর অনুবাদ....







অনন্তর রাম এ গিরিশৃঙ্গে একশিলাতলে উপবেশন করিয়া সীতাকে কহিলেন,_-অয়ি প্রিয়ে! দেখ, এই মাংস অতি পবিত্র, স্বাদু ও অগ্নিতে সংস্কার করা হইয়াছে। 

[ বাল্মিকী রামায়ণ, অযোধ্যা কান্ড, ৯৬ সর্গ, ১-২ শ্লোক; অনুবাদ:- জি.পি. বসু এন্ড ব্রাদার্স; প্রকাশনা:- মহাভারত কার্যালয়, কলিকাতা ]


PDF link......

https://archive.org/details/dli.bengal.10689.1908/page/n379/mode/1up?view=theater&q=%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B8+

Tuesday, September 23, 2025

মাধ্ব দর্শনে রামানুজাচার্যের দানবীকরণ ২ বৈষ্ণব ও ক্রাইষ্ণবের চুলোচুলি

ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে মাধ্বাচার্য (১২৩৮–১৩১৭ খ্রি.) দ্বৈত দর্শনের প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত। তিনি তাঁর মতবাদ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শঙ্করাচার্য, রামানুজাচার্য, ভাস্করাচার্য প্রমুখ মাধ্ব-পূর্ব ভাষ্যকারদের তীব্র সমালোচনা করেন। তবে এই সমালোচনা শুধু দর্শনীয় পর্যায়েই সীমিত থাকেনি; তাঁদেরকে প্রকাশ্যে দৈত্য/অসুর আখ্যা দিয়ে এবং তাঁদের রচনাকে কু-ভাষ্য বলে দানবীকরণ করেছেন। পরবর্তীকালে মাধ্ব অনুসারী পণ্ডিতরাও একই রীতি বজায় রেখেছেন।

মহাভারত তাৎপর্য নির্ণয়

মাধ্বাচার্য তাঁর মহাভারত তাত্পর্য নির্ণয় গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন—দ্বাপর যুগে ভীম সৌগন্ধিক বনে মনিমান প্রভৃতি দৈত্যকে হত্যা করেছিলেন। এরা ছিল প্রবল শক্তিশালী ও ক্রোধবশ দানব। পরে এরা কলি যুগে পুনর্জন্ম নিয়ে মিথ্যা দর্শন প্রচার করে, যার মধ্যে অদ্বৈত দর্শনও অন্তর্ভুক্ত। মাধ্বের মতে, ভ্রান্ত মত প্রচারকারীরা মৃত্যুর পর অন্ধতমস নামে নরকে পতিত হয়।

অন্যত্র তিনি উল্লেখ করেন—কিছু লোক প্রচার করেছিল, “জগৎ মিথ্যা, ঈশ্বর নেই; আমি সিদ্ধ, আমি ঈশ্বর।” ভীম তাঁদের বিতর্কে পরাস্ত করেন এবং হত্যা করেন এই ঘোষণা দিয়ে—“বিষ্ণুই সর্বোচ্চ।”

ভাগবত তাৎপর্য নির্ণয়

এখানে মাধ্বাচার্য একটি পুরাণ উদ্ধৃত করেছেন—যারা “অহং ব্রহ্মাস্মি” মত প্রচার করে, তারা আসলে অসুর ও রাক্ষস। তারা কলি যুগে ফিরে এসে মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে। এই দলের প্রধান হিসেবে মনিমানকে উল্লেখ করা হয়েছে। ইঙ্গিত করা হয়েছে, শঙ্কর, রামানুজ প্রমুখ মাধ্ব-পূর্ব ভাষ্যকাররাও এই অসুরদলের অন্তর্ভুক্ত।


মাধ্ব বিজয়

নারায়ণ পণ্ডিতের মাধ্ব বিজয় গ্রন্থে বলা হয়েছে, মাধ্ব-পূর্ব সব ব্রহ্মসূত্র ভাষ্য কু-ভাষ্য। লেখক মোট ২১ জন ভাষ্যকারের নাম দিয়েছেন। এ তালিকায় রামানুজ, শঙ্কর, ভাস্কর, যাদবপ্রকাশ প্রমুখ অন্তর্ভুক্ত। মাধ্ব মতে, ভীম যেসব দৈত্যকে হত্যা করেছিলেন, তারাই কলি যুগে জন্ম নিয়ে এসব ভাষ্যের রচয়িতা হয়েছে।

হারিকথামৃতসার

জগন্নাথদাস রচিত কন্নড় গ্রন্থ হারিকথামৃতসার শুরু হয় এই বক্তব্য দিয়ে—২১ জন দুরাত্মা ব্রহ্মসূত্রের কু-ভাষ্য লিখেছে, আর মাধ্ব তাঁদের খণ্ডন করার জন্য এসেছেন। এখানে রামানুজাচার্যের নামও রয়েছে। তাঁর শ্রীভাষ্য কু-ভাষ্য হিসেবে অভিহিত হয়েছে।

শ্রী হয়বদন পুরাণিক তাঁর টীকায় উল্লেখ করেছেন—২১টি ভাষ্যের মধ্যে বর্তমানে শঙ্কর, ভাস্কর ও রামানুজের ভাষ্য টিকে আছে, এবং এই তিনটিই শেষ পর্যন্ত বিষ্ণু-বিদ্বেষে পরিণত হয়েছে।

বিষ্ণু-বিদ্বেষের রূপ

মাধ্ব গ্রন্থে বিষ্ণু-বিদ্বেষের (Viṣṇu-dveṣa) নয়টি রূপ বর্ণিত হয়েছে:
১. জীবার সঙ্গে ঈশ্বরের অভেদ মানা।
২. ঈশ্বরকে নির্গুণ বা নিরাকার ভাবা।
৩. ঈশ্বরের গুণে ত্রুটি ধরা।
৪. অন্য কারো তাঁহার সমান মনে করা।
৫. অন্য কারো তাঁহার ঊর্ধ্বে ভাবা।
৬. তাঁর দেহ, গুণ, কর্ম বা অবতারত্বে ভেদ খোঁজা।
৭. অবতার সম্পর্কে ভুল ধারণা রাখা।
৮. বিষ্ণু-ভক্তদের ঘৃণা করা।
৯. বিষ্ণু-সংক্রান্ত শাস্ত্রকে নিন্দা করা।

মাধ্ব মতে, শঙ্কর, ভাস্কর ও রামানুজের মতবাদ এই রূপগুলির অন্তর্ভুক্ত। তাই তাঁদের ভাষ্য কু-ভাষ্য এবং তাঁরা দুরাত্মা।

আধুনিক মাধ্ব পণ্ডিতদের মত

আধুনিক মাধ্ব পণ্ডিত বালগারু শ্রীনিবাসাচার্য তাঁর মণি মঞ্জরী বৈভবম (২০০৭)-এ উল্লেখ করেছেন—

  • একজন সত্যিকারের মাধ্বানুগামী হতে হলে মাধ্ব ব্যতীত অন্য সব দার্শনিককে দানব মনে করতে হবে।

  • যারা মাধ্বাচার্যের সমালোচনা করে, তারা অবৈধ জন্মের।

  • রামানুজ, শঙ্কর, ভাস্কর ও তাঁদের অনুসারীরা দানব এবং অবৈধভাবে জন্ম নিয়েছে।


মাধ্বাচার্য ও তাঁর অনুসারীদের লেখনী থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, তাঁরা রামানুজ, শঙ্কর ও অন্যান্য ভাষ্যকারদের শুধু ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁদেরকে দানব বা অসুর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁদের রচনা কু-ভাষ্য হিসেবে নিন্দিত হয়েছে।

অতএব, মাধ্ব দর্শনে এক বিশেষ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়—নিজ মতবাদকে সুরক্ষিত রাখতে অন্য সব মতবাদকে শুধু ভুল বা ভ্রান্ত বলা নয়, বরং আধ্যাত্মিকভাবে অবৈধ ও দানবীয় শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা।

রেফারেন্স

  • মহাভারত তাৎপর্য নির্ণয় (২২.২৮৪, ২২.২৯৫–২৯৭)

  • ভাগবত তাৎপর্য নির্ণয় (২৪.২৯)

  • মাধ্ব বিজয়, নারায়ণ পণ্ডিত

  • হারিকথামৃতসার, জগন্নাথদাস (ভাষ্য: হয়বদন পুরাণিক)

  • বালগারু শ্রীনিবাসাচার্য, মণি মঞ্জরী বৈভবম (২০০৭)

Sunday, June 8, 2025

শিবতত্ত্বে সৃষ্টি, সংহার ও রক্ষা – শ্রীকণ্ঠ ও পুরাণসমূহের আলোক

শৈব দর্শনে শিব কেবল একজন উপাস্য দেবতা নন—তিনি নিজেই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান ও পরম ব্রহ্ম। তিনিই এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারের মূল কেন্দ্র। শ্রীকণ্ঠাচার্য তাঁর ব্রহ্মসূত্র ভাষ্যে একথাই প্রমাণ করেন এবং পুরাণসমূহও এই তত্ত্বকে পূর্ণ সমর্থন দেয়। এই প্রবন্ধে আমরা শৈব দর্শনে সৃষ্টিতত্ত্ব, সংহারতত্ত্ব ও রক্ষাতত্ত্বের এক গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরব।

✦ শিব: কারণ ও কার্য উভয়ের আধার

◼ শ্রীকণ্ঠাচার্যের অভিমত

ব্রহ্মসূত্র ভাষ্যে (১.১.২) শ্রীকণ্ঠাচার্য বলেন:

"জগতকারণং শম্ভুরেভ"
(এই জগতের একমাত্র কারণ শম্ভু বা শিব।)

এই একটি বাক্যই শৈব দর্শনের মূলমন্ত্র—শিব কেবল কার্যকারণ নন, তিনিই উপাদান কারণ, নিমিত্ত কারণ এবং উপনির্মাতা। তিনি ছাড়া আর কেউ সৃষ্টির মালিক হতে পারে না।

◼ ব্যাখ্যা

শ্রীকণ্ঠ বলেন, শিব আত্মতত্ত্ব, বস্তুতত্ত্ব ও চেতনাতত্ত্ব—এই তিন ক্ষেত্রেই সর্বত্র বিস্তৃত। ত্রিমূর্তিতত্ত্বকে তিনি অব্যক্ত, ব্যক্ত এবং প্রব্যক্ত এই তিন অভিব্যক্তির মাধ্যমে বোঝাতে চান।

✦ পুরাণসমূহে শিবের ত্র্যর্থরূপ

◼ লিঙ্গ পুরাণ (১.৬৯.৬৪)

“শিবাত্ প্রজাস্রষ্টা ব্রহ্মা, শিবাত্ পালনহরি:।
শিবাত্ সংহারকারী রুদ্রঃ, শিব: সর্বং প্রপঞ্চতে॥”

বাংলা অনুবাদ:
“শিব হতেই সৃষ্টি করেন ব্রহ্মা, শিব হতেই পালন করেন হরি, শিব হতেই সংহার করেন রুদ্র। শিবই সর্বভৌতিক জগতের মূল।”

এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, তিন দেবতা আসলে তিনটি কার্যরূপ মাত্র, মূলতত্ত্ব হলেন এক ও অদ্বিতীয় শিব।

◼ শিবপুরাণ: সর্বেশ্বরতত্ত্ব

শিবপুরাণে বলা হয়েছে:

"ন ত্বদ্ব্যতিতমস্ত্যন্যৎ, জগতঃ কারণং পরম্।"
(তোমার বাইরে এই জগতের আর কোনো কারণ নেই।)

এখানে শিবকে তত্ত্বগত “সর্বেশ্বর” হিসেবে দেখানো হয়েছে—তিনিই অনাদি ও অনন্ত, চৈতন্য ও স্থিতির উৎস।

AI created 


✦ ঈশ্বর গীতায় শিবতত্ত্বের আত্মপ্রকাশ

ঈশ্বর গীতা, যা কূর্ম পুরাণের অন্তর্গত, তাতে শিব নিজেই নিজের সর্বজ্ঞ ও সর্বব্যাপক রূপ তুলে ধরেন:

“অহং বিশ্বস্য কারণং, সৃষ্টিস্থিতিলয়ক্রিয়াঃ।
মম দ্বারা প্রসরন্তি, না অন্যঃ কারণমুচ্যতে॥”

অনুবাদ:
"আমি বিশ্বজগতের কারণ। সৃষ্টি, রক্ষা ও সংহার—এই কর্মসমূহ আমার দ্বারাই ঘটে; অন্য কোন কারণ নেই।"

এই শ্লোকটির ভাষ্য অনুসারে, শিবের ইচ্ছা বা ‘সঙ্কল্প’ থেকেই সৃষ্টি হয়, এবং তাঁর ‘নিশ্চয়’ থেকেই সংহার সংঘটিত হয়।

✦ শিবসূত্র: অভ্যন্তরীণ সৃষ্টি ও লয়ের ব্যাখ্যা

শিবসূত্রে (১.১):

“চিত্তং মন্ত্রঃ”
(“চৈতন্যই মন্ত্র।”)

শিবসূত্র (৩.১):

“জ্ঞানং বন্ধঃ।”
(“জ্ঞানই বন্ধন, যদি তা মুক্তিচেতনায় অভিজ্ঞ না হয়।”)

এখানে ‘সৃষ্টি’ বলা হয়েছে চেতনার অঙ্কুরোদ্গম, ‘সংহার’ বলা হয়েছে চেতনার নির্লিপ্ত অবস্থা, এবং ‘স্থিতি’ হচ্ছে ধারাবাহিক সত্তার অভিজ্ঞান।

✦ উপনিষদীয় আলোকে: গণপতি অথর্বশীর 

গণপতি অথর্বশীর উপনিষদে বলা হয়েছে:

“ত্বং ভূমিরাপোऽনলোনিলোনাভঃ।
ত্বং চত্বারী বাক্ পদানি॥”

অনুবাদ:
“তুমি ভূমি, জল, অগ্নি, বায়ু ও আকাশ—তুমি বাণীর চার রূপ।”

এখানে শিবরূপ গনেশকে বলা হয়েছে উপাদান ও উপনির্মাতা—এবং ভাষা বা শব্দতত্ত্বের উৎস।

✦ শৈব ত্র্যর্থতত্ত্ব বনাম ত্রিমূর্তি দর্শন

প্রচলিত ত্রিমূর্তি:

  • ব্রহ্মা – সৃষ্টি

  • বিষ্ণু – রক্ষা

  • রুদ্র – সংহার

শৈব বিকল্প:

এই তিন রূপই আসলে একক পরমতত্ত্ব শিব–এর তিনটি গুণপ্রকাশ (সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ)। তাই তিনজন আলাদা ঈশ্বর নন, বরং এক শিব তিনভাবে প্রকাশমান।

লিঙ্গপুরাণে বলা হয়:
“ত্রিধা ভবতি শম্ভু:—ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও ঈশ্বর।”

✦ সৃষ্টি, রক্ষা ও সংহার: দার্শনিক ব্যাখ্যা

সৃষ্টি:

শিবের “ইচ্ছা শক্তি” (ইচ্ছে), “জ্ঞান শক্তি” (জ্ঞাতা) ও “ক্রিয়া শক্তি” (কর্তা)—এই ত্রিশক্তি থেকেই জগতের উৎপত্তি।

রক্ষা:

রক্ষাকর্ম হচ্ছে সেই সৃষ্টির নিয়ম রক্ষা করা। এই ধারাবাহিকতার জন্য শিব স্বয়ং নিজেকে ‘ধর্ম’ বলে ঘোষণা দেন ঈশ্বর গীতায়।

সংহার:

সংহার মানে ধ্বংস নয়, বরং মূলত্বে প্রত্যাবর্তন। সব সৃষ্টি যখন পরিপূর্ণ হয়ে উঠে তখন তা তার উৎসে মিলিয়ে যায়—এই ধারণাই হল সংহারতত্ত্ব।

✦ আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ: আত্মসৃষ্টি ও আত্মসংহার

মানব চেতনায় এই তিনটি কর্ম প্রতিফলিত হয়:

  • সৃষ্টি – জ্ঞান ও ধারণার উদ্ভব

  • রক্ষা – চর্চা ও অভ্যাস

  • সংহার – অহংকার ও ভ্রান্ত ধারণার বিলয়

এই প্রসঙ্গে শিবরূপ হলেন আত্মজ্ঞান, সত্ত্ব ও নির্গুণতত্ত্বের পূর্ণ প্রতীক

✦ উপসংহার

শিব কেবল সৃষ্টি ও ধ্বংসের দেবতা নন—তিনিই সৃষ্টি, তিনিই ধ্বংস, তিনিই ধ্রুবতা।
তিনি কোনো নির্দিষ্ট কালের বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ঈশ্বর নন—তিনি হলেন সর্বজনীন চেতনা
শিবতত্ত্বের এই সৃষ্টি-স্থিতি-লয় চক্র শুধু পৌরাণিক আখ্যান নয়, বরং সমগ্র জীবনচক্র, জ্ঞানচক্র ও চৈতন্যচক্রের চিত্র

রেফারেন্স তালিকা:

  1. ব্রহ্মসূত্র ভাষ্য – শ্রীকণ্ঠাচার্য (১.১.২, ২.১.১৪)

  2. লিঙ্গপুরাণ – অধ্যায় ১, ৬৯, ৭৫

  3. শিবপুরাণ – বিদ্যেশ্বর সংহিতা

  4. গণপতি অথর্বশীর্ষ উপনিষদ – শ্লোক ৫, ৮

  5. শিবসূত্র – সূত্র ১.১, ৩.১, ৩.৫

  6. ঈশ্বরগীতা – অধ্যায় ১, শ্লোক ১০-১৫

  7. স্কন্ধপুরাণ – কৈলাসখণ্ড, শিবগীতা অংশ

  8. দর্শন ও চৈতন্যতত্ত্ব – স্বামী চিন্ময়ানন্দের পাঠ্যভাষ্য

  9. Modern Physics & Advaita Comparison – Dr. Kapil Kapoor

Saturday, June 7, 2025

শৈবত্বের লক্ষণ ও শিবভক্ত চিনিবার উপায় — আগম ও পুরাণের আলোকে অষ্টবর্ণ ভিত্তিক বিশ্লেষণ

পরমেশ্বর ভগবান, আদিদেব, সকল দেবতা ও জাতির একমাত্র আরাধ্য—সাম্ব সদাশিব। যাঁর চরণাশ্রিত হয়েছেন, তিনি মাহেশ্বর; এবং যিনি মাহেশ্বর, তাঁকে চেনার একমাত্র পন্থা হলো "অষ্টবর্ণ"। এই আটটি মূল লক্ষণ একজন প্রকৃত শৈব ভক্তকে চিহ্নিত করে।

১. অষ্টবর্ণের শ্লোক ও ব্যাখ্যা

মূল শ্লোক:

অষ্টবর্ণং প্রপঞ্চয়েদ্যঃ শৈবঃ স্যাদধিগম্যতাম্।

গুরুলিঙ্গং চ জঙ্গমং ভস্ম মন্ত্রং রুদ্রাক্ষমেব চ।

পাদোদকং নির্মাল্যং চ—এতান্যষ্টবর্ণমুচ্যতে॥

অষ্টবর্ণং বিহীনস্য শৈবস্য নাস্তি কদাচন।

যঃ প্রপঞ্চয়েদষ্টবর্ণং স এব শৈব ইতি স্মৃতঃ॥

সূত্র: শৈব আগম, স্বচ্ছন্দ তন্ত্র, পূর্বখণ্ড ১.১


বাংলা অনুবাদ:

যিনি গুরুরূপ, লিঙ্গ, জঙ্গম, ভস্ম, মন্ত্র, রুদ্রাক্ষ, পাদোদক ও নির্মাল্য—এই আটটি গুণ দৈনন্দিন জীবনে মূর্ত করে তোলেন, তিনিই প্রকৃত শৈব; অন্যথায় শৈবতা অসম্পূর্ণ।


২. গুরু (Guru) — শিবের জীবন্ত প্রতিমূর্তি

শ্লোক ১:

শ্রীগুরুচরণপদ্মে সেবা কুরুতে সदा।

শিবায় তস্য নাস্তি ক্ষতির্নাম কদাচন॥

শ্লোক ২:

শ্রীগুরুরূপে শিবং বিজ্ঞায় সেবতে যত্নতঃ।

শৈবত্বং প্রপঞ্চয়েদ্যঃ সর্বকালেশ্বর ইতি স্মৃতঃ॥

শ্লোক ৩:

শ্রীগুরুচরণাম্ভোজে সেবা কুরুতে সदा যঃ।

তস্য শিবসমো ভাবঃ সর্বদা নির্মলঃ স্মৃতঃ॥

সূত্র: স্বচ্ছন্দ তন্ত্র, পূর্বখণ্ড ৮.১৬.১–৩


ব্যাখ্যা:

যিনি শ্রীগুরুর পদপদ্মে নিরন্তর সেবা করেন, তিনি কখনোই শিবের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। যে গুরুরূপে শিবকে উপলব্ধি করে সেবা করেন, তিনিই প্রকৃত শৈব, তাঁর হৃদয় নির্মল ও শিবসমান হয়ে ওঠে।


৩. লিঙ্গ (Liṅga) — শিবভক্তির বহিরপ্রকাশ

শ্লোক ১:

মূর্ধ্নি হৃদয়ে বাহৌ বা যঃ লিঙ্গং ধারয়ন্তি।

তেষাং কালঃ করোতি স্পর্ধামপি ভয়ঙ্করাম॥

সূত্র: গুরু গীতা, শ্লোক ১৬৪


শ্লোক ২:

যেষাং দেহে ন লিঙ্গস্পর্শঃ, তে শ্মশানসংস্থিতাঃ॥

ব্যাখ্যা:

যে ব্যক্তি শরীরে, হৃদয়ে বা মস্তকে শিবলিঙ্গ ধারণ করে, মৃত্যুও তার সামনে ভীত হয়। যাদের দেহে শিবলিঙ্গ নেই, তারা শ্মশানের মতো অপবিত্র বলে বিবেচিত।


৪. জঙ্গম (Jaṅgama) — শিবের সচল রূপ

শ্লোক:

যে জঙ্গমভাবনাভ্রষ্টাঃ কামনায় আসক্তাঃ।

ন তেষাং হৃদয়ে কদাচিদপি ত্রিপুরারী অবস্থিতঃ॥

সূত্র: রুদ্র যামল তন্ত্র, অধ্যায় ৮, শ্লোক ২২


ব্যাখ্যা:

যারা সাধুসঙ্গ বা জঙ্গম ভাবনা থেকে বিচ্যুত, তাদের হৃদয়ে কখনোই শিব বাস করেন না।





৫. ভস্ম (Bhasma) — শিবের চিহ্নস্বরূপ বিভূতি

শ্লোক ১:

যস্য দেহে ভস্মলেপনং নাস্তি, স যমদ্বারং প্রতি গচ্ছতি॥

শ্লোক ২:

ভস্মলেপনমিদং দেহমাশ্রিত্য, পশ্যতি কালঃ—ভয়াত্ত্রস্যতি॥

সূত্র: শিব মহাপুরাণ, রুদ্র সংহিতা, অধ্যায় ১৮

ব্যাখ্যা:

যে ব্যক্তি দেহে ভস্ম (ত্রিপুণ্ড্র) লেপন করেন না, মৃত্যু তার জন্য অবধারিত। আর যে এই ভস্ম ধারণ করে, তাকে মৃত্যু পর্যন্ত ভয় করে।


৬. মন্ত্র (Mantra) — পঞ্চাক্ষরী 'নমঃ শিবায়'

শ্লোক:

যস্য মুখে নাস্তি “নমঃ শিবায়” ইতি পঞ্চাক্ষরং।

তস্য মুখং শাপিতং শুষ্কমরুভূমিসমং স্মৃতং॥

সূত্র: গুরু গীতা, শ্লোক ৯৮


ব্যাখ্যা:

যে ব্যক্তির মুখে ‘নমঃ শিবায়’ ধ্বনিত হয় না, সেই মুখ অভিশপ্ত ও শুষ্ক মরুভূমির মতো নির্জীব।


৭. রুদ্রাক্ষ (Rudrākṣa) — ভক্তির অনিবার্য প্রতীক

শ্লোক ১:

যস্য সর্বাঙ্গে রুদ্রাক্ষঃ সন্নিবদ্ধঃ সदा।

ন তং হন্তি কো’পি, সম্পূর্ণং ত্রিলোক্যেষু চ॥

শ্লোক ২:

যঃ রুদ্রাক্ষবিদ্বেষী, স ত্রিলোকেষু ন রক্ষিতঃ॥

সূত্র: পদ্ম পুরাণ, উত্তর খণ্ড, শ্লোক ৫৪.৮৮


ব্যাখ্যা:

যিনি সর্বাঙ্গে রুদ্রাক্ষ ধারণ করেন, তাঁকে ত্রিলোকে কেউই ক্ষতি করতে পারে না। আর যারা রুদ্রাক্ষ অবজ্ঞা করে, তারা রক্ষাহীন হয়ে পড়ে।


৮. পাদোদক ও নির্মাল্য (Pādodaka & Nirmālya)

শ্লোক (পাদোদক):

যে আচার্যচরণাম্বুজাৎ নির্গতামৃতং পিবন্তি।

ন তং অজ্ঞানরূপং তমঃ স্পৃশতি কদাচন॥

সূত্র: গুরু গীতা, শ্লোক ২৮৫


শ্লোক (নির্মাল্য):

যে নির্মাল্যাত্পরিত্যক্তাঃ, শুষ্কাঃ তে মরুভূমিসমা ইতি।

যে দূরস্থাত্ অপি নির্মাল্যং প্রণমন্তি, তু তে শিবত্বং লভন্তে॥

 সূত্র: কুলার্ণব তন্ত্র, অধ্যায় ১২


ব্যাখ্যা:

যিনি গুরুর চরণামৃত পান করেন, তাঁকে অজ্ঞান ছুঁতে পারে না। আর যে ব্যক্তি দূর থেকেও নির্মাল্যকে প্রণাম করে, সেও শিবত্ব লাভ করেন।



এই অষ্টবর্ণ—গুরুসেবা, লিঙ্গধারণ, জঙ্গমসঙ্গ, ভস্মলেপন, পঞ্চাক্ষরী মন্ত্রজপ, রুদ্রাক্ষধারণ, পাদোদক পান ও নির্মাল্য প্রণাম—শিবভক্তির মূল চিহ্ন। এগুলো যার জীবনে দৃঢ়ভাবে বিরাজমান, তিনিই প্রকৃত শৈব এবং তিনি অদ্বিতীয় শৈবত্বে প্রতিষ্ঠিত হন।


Friday, June 6, 2025

শিবই পরম ব্রহ্ম – শ্রীকণ্ঠাচার্যের দর্শনের আলোকে

 

ভূমিকা

হিন্দু দর্শনে “পরম ব্রহ্ম” ধারণাটি হলো সেই চূড়ান্ত বাস্তবতা, যেখান থেকে সব সৃষ্টি উৎপন্ন, যার মধ্যে সবকিছু অবস্থান করছে এবং যার মধ্যেই সবকিছু বিলীন হয়। বেদান্ত দর্শনের মূল গ্রন্থ ব্রহ্মসূত্র এই ব্রহ্মতত্ত্বকে বিশ্লেষণ করে। শঙ্করাচার্য নির্গুণ নিরাকার ব্রহ্মরূপে তাঁর ব্যাখ্যা দেন। রামানুজাচার্য বিষ্ণুকে সগুণ পরম ব্রহ্মরূপে স্থাপন করেন।

কিন্তু অনেকেই জানেন না, দক্ষিণ ভারতের মহান শৈব দার্শনিক শ্রীকণ্ঠাচার্য এই ব্রহ্মসূত্রকেই ব্যাখ্যা করে শিবকে সর্বোচ্চ ব্রহ্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই প্রবন্ধে আমরা দেখব – কিভাবে শ্রীকণ্ঠের দর্শনে শিব পরম ব্রহ্ম, এবং এই মত কিভাবে শাস্ত্রসম্মত।

শ্রীকণ্ঠাচার্যের শৈব-বিষিষ্টাদ্বৈত দর্শন

শ্রীকণ্ঠাচার্য "শৈব- বিষিষ্টাদ্বৈত" নামক একটি দার্শনিক অবস্থান প্রস্তাব করেন, যেখানে তিনি নিম্নোক্ত ধারণাগুলো স্পষ্ট করেন:

  • শিবই পরম ব্রহ্ম: ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যে তিনি বলেন –

    “शिव एव परं ब्रह्म।”
    অর্থাৎ, শিবই পরম ব্রহ্ম।

  • জীব ও জগত শিবের গুণস্বরূপ: জীবাত্মা ও জড় প্রকৃতি, উভয়ই শিবের অধীন – তবে শিবের মত স্বয়ম্ভূ নয়।

  • সগুণ-নিগুণ সমন্বয়: শিবের এক দিকে নির্গুণ – কারণ তিনি অতীত, অনন্ত, রূপ-রহিত। কিন্তু তাঁর ইচ্ছাশক্তি, করুণাশক্তি, অনুগ্রহ ইত্যাদির কারণে তিনি সগুণ রূপেও প্রকাশিত।

এখানে, শিব কেবল “সৃষ্টিকর্তা” নন, বরং তিনিই সর্বব্যাপী, সর্বশক্তিমান, পরম সত্তা

ব্রহ্মসূত্র ভাষ্যে শিব

ব্রহ্মসূত্রের প্রথম সূত্র –

“अथातो ब्रह्मजिज्ञासा।”
অর্থাৎ, “এবার ব্রহ্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা শুরু হোক।”

এখানে শ্রীকণ্ঠ বলেন –

"ब्रह्म शब्देन शिवपरमेश्वर उच्यते"
অর্থাৎ, “ব্রহ্ম শব্দে শিব পরমেশ্বরই বোঝানো হয়েছে।”

তিনি ব্রহ্মসূত্র ১.১.২-এ (জন্মাদ্যস্য যাতঃ) মন্তব্য করেন:

"यस्मात् शिवात् सर्वस्य उत्पत्तिरादिः"
"শিব হইতে সমস্ত জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়।"

এখানে ব্রহ্মতত্ত্বের তিনটি গুণ – সৃষ্টি, রক্ষণ, লয় – শিবের মধ্যে উপস্থিত, যা তাঁকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর ও ব্রহ্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে।




শাস্ত্রসমূহে শিবতত্ত্ব

১. ঈশ্বরগীতা (কূর্মপুরাণ)

"अहं ब्रह्म परमं, नान्यत् किञ्चित् अस्ति ततः।"
“আমি পরম ব্রহ্ম — এর বাইরে কিছুই নেই”

শিব নিজেই এই ঘোষণা দেন ঈশ্বরগীতায়। এখানে দ্ব্যর্থহীনভাবে শিবকে “পরম ব্রহ্ম” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

২. গণপতি অথর্বশীর্ষ উপনিষদ

"त्वं ब्रह्मा त्वं विष्णुस्त्वं रुद्रस्त्वं इन्द्रः..."
তুমি ব্রহ্মা, তুমি বিষ্ণু, তুমি রুদ্র, তুমি ইন্দ্র...

এখানে গণপতির রূপে মূলত রুদ্রতত্ত্বকেই ব্রহ্মরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে — যিনি সব দেবতার মধ্যমূলে বিরাজমান।

৩. লিঙ্গ পুরাণ

"शिवो निरगुणः शान्तः साक्षात् परब्रह्म परः।"
শিবই নিগুণ, শান্ত ও পরব্রহ্ম।

এটি পরিস্কারভাবে শিবকে সেই চূড়ান্ত, নির্গুণ পরম ব্রহ্ম বলে স্বীকৃতি দেয়।

৪. শিব পুরাণ

"शिवात् परं नास्ति किंचित्"
“শিবের ঊর্ধ্বে আর কিছুই নেই”

এটি শিবের সর্বোচ্চতা তুলে ধরে এবং তাঁকে চূড়ান্ত পরম সত্তা হিসেবে স্থাপন করে।

৫. স্কন্ধ পুরাণ – লিঙ্গোৎপত্তি খণ্ড

শিবলিঙ্গের উত্থানের কাহিনী যেখানে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু অনন্ত আলোর রূপ খুঁজে পান না, সেখানে বলা হয়:

"नास्ति तत् परं किंचिद् – यत् तद् लिङ्गं महेश्वरम्।"
এই লিঙ্গরূপই পরম — এর ঊর্ধ্বে কিছুই নেই।

এটি প্রমাণ করে, শিবলিঙ্গই সেই চূড়ান্ত রূপ – যা পরব্রহ্ম স্বরূপ।

দর্শনমূলক বিশ্লেষণ

শিব বনাম নির্গুণ ব্রহ্ম

শঙ্করাচার্যের ব্রহ্ম নির্গুণ, নিরাকার, অনুভবের বাইরে — কিন্তু শ্রীকণ্ঠ বলেন, ব্রহ্ম যদি সম্পূর্ণ নির্গুণ হয়, তবে তিনি কিভাবে সৃষ্টি, সংহার বা করুণা করেন? তাই তিনি বলেন:

"ब्रह्म सत्-चित्-आनन्द स्वरूपं — तथा इच्छाशक्तियुतम् शिवम्।"

অর্থাৎ, পরম ব্রহ্ম শিব, যিনি সচ্চিদানন্দস্বরূপ ও ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন।

পরমেশ্বরের ব্যক্তিগততা

শ্রীকণ্ঠের দর্শনে শিব কেবল নিরপেক্ষ তত্ত্ব নয়, তিনি করুণাময়, উপাস্য, এবং মুক্তিদাতা। এই দৃষ্টিভঙ্গি যোগ ও ভক্তিমূলক সাধনার সঙ্গে সমন্বিত

 শিব তত্ত্ব – আমাদের জীবনে

শিবকে কেবল “তাণ্ডবনৃত্যকারী দেবতা” হিসেবে দেখা নয়, বরং তাঁকে আমাদের নিজের অস্তিত্বের মূলে থাকা চেতনা হিসেবে উপলব্ধি করতে হবে। শিব মানে জ্ঞান, শিব মানে ত্যাগ, শিব মানে দয়া, আবার শিব মানে চিরন্তন শক্তি।

উপনিষদের সহিত সাযুজ্য

"एको रुद्रो न द्वितीयाय तस्थुः।" (শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৩.২)
“রুদ্র একাই আছেন — তাঁর দ্বিতীয় কেউ নেই।”

এই দৃষ্টিভঙ্গি শৈব অদ্বৈতবাদের মূলে। যেখানে শিবই জগত, জীব, কর্ম ও মুক্তির কেন্দ্রবিন্দু।

উপসংহার

শ্রীকণ্ঠাচার্যের দর্শন আমাদের একটি বিকল্প ও শক্তিশালী পথ দেখায় – যেখানে শিব পরম ব্রহ্ম, নিগুণ-সগুণের এককতায় অভিন্ন, এবং শাস্ত্রসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত।

এই দার্শনিক রূপরেখা শুধুমাত্র তাত্ত্বিক নয়, এটি উপাসক হৃদয়ে গভীর উপলব্ধির জন্ম দেয়। শিব শুধু দেবতা নন – তিনি চেতনার চূড়ান্ত স্তর, তিনি সেই পরম এক, যাঁর দ্বারা ও যাঁর মধ্যে সবকিছু।

শ্লোক স্মরণে রাখুন

"सच्चिदानन्द रूपाय, शिवाय ब्रह्मणे नमः।"
“সচ্চিদানন্দরূপ শিব, যিনি ব্রহ্ম — তাঁকেই প্রণাম।”


Sunday, December 8, 2024

সাকার উপাসনার কিছু রেফারেন্স

 নিরাকারবাদী এবং একদল বিধর্মীদের দাবি বেদাদি শাস্ত্রে প্রতিমা পূজা এবং সাকার উপাসনার উল্লেখ নেই। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বেদবিরুদ্ধ মূর্তিপূজা করে। আর সঠিক শাস্ত্রজ্ঞানের অভাবে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিশোর ও যুবক বয়সীরা এই কথায় বিশ্বাস করে বিভ্রান্ত হয় এবং ধর্মান্তরিত হয়। হ্যাঁ, বেদে প্রত্যক্ষভাবে সাকার রূপের উল্লেখ নেই ঠিকই। সাকার প্রতীকোপসনা মূলত পুরাণ ও তন্ত্র শাস্ত্র কে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। কিন্তু বেদ ও বৈদিক শাস্ত্র সমূহেও অসংখ্য জায়গায় ঈশ্বরের সাকার উপাসনা এবং সাকার রূপের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে এবং সাকার উপাসনার বিরোধিতা, নিষেধাজ্ঞাও কোথাও দেওয়া নেই। বেদ ও প্রামাণ্য বৈদিক শাস্ত্র থেকে রেফারেন্স সহ সাকার উপাসনা এবং প্রতিমা পূজার উল্লেখ দিয়ে বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার নিরোধই এই পোস্টের উদ্দেশ্য।


১.ছান্দোগ্য উপনিষদ ( ৭/১/৪০)
নামৈবৈতৎ, নামোপাসস্ব, ব্রহ্মেতি ব্রহ্মবুদ্ধ্যা, যথা প্রতিমায়াং বিষ্ণুবুদ্ধ্যা উপাস্তে তদ্বৎ।।

শাঙ্কর ভাষ্যঃ নামরূপে প্রসিদ্ধ ঋগ্বেদ, যজুর্ব্বেদ প্রভৃতি, এ সমস্ত নামই, প্রতিমাকে যেরূপ বিষ্ণুজ্ঞানে উপাসনা করে, তদ্রূপ উক্ত নামকেও ব্রহ্মরূপে অর্থাৎ ব্রহ্মবুদ্ধিতে উপাসনা কর।

২. বৃহদারণ্যক উপনিষদ ( ১/১/১)
কাল-লোক-দেবতাত্বাধ্যারোপণঞ্চ প্রজাপতিত্বকরণং
পশোঃ। এবংরূপো হি প্রজাপতিঃ; বিষ্ণুত্বাদিকরণমিব প্রতিমাদৌ। সূর্য্যশ্চক্ষুঃ, শিরসোহনস্তরত্বাৎ সূৰ্য্যাধিদৈবতত্বাচ্চ; বাতঃ প্রাণঃ

শাঙ্কর ভাষ্যঃ প্রজাপতিও কালাদির সমষ্টিস্বরূপ; সেইজন্য প্রতিমা প্রভৃতিতে যেরূপ বিষ্ণুত্বাদি সম্পাদন করা হয়, তদ্রূপ কাল, লোক ও দেবভাব সমারোপণ দ্বারা যজ্ঞীয় পশুরও প্রাজাপত্যত্ব অর্থাৎ প্রজাপতিদৈবতভাব সম্পাদন করা হইয়া থাকে।

৩.  বৃহদারণ্যক উপনিষদ ( ১/৩/১)
ভেদেন হি ব্রহ্মণো নামাদিবস্তু-প্রতিপন্নস্থ্য নামাদৌ বিধীয়তে ব্রহ্মদৃষ্টিঃ-প্রতিমাদাবিব বিষ্ণুদৃষ্টিঃ। আলম্বনতেন হি নামাদি-প্রতিপত্তিঃ, প্রতিমাদিবদেব, ন তু নামাস্তেব ব্রহ্মেতি।

শাঙ্কর ভাষ্যঃ যাহারা নামপ্রভৃতিকে ব্রহ্ম হইতে পৃথক্ বস্তু বলিয়া অবগত আছেন, তাহাদের সম্বন্ধেই নাম প্রভৃতিতে ব্রহ্মদৃষ্টির বিধান করা হইয়া থাকে-অর্থাৎ প্রতিমাপ্রভৃতিতে যেরূপ ব্রহ্মদৃষ্টির বিধান করা হইয়া থাকে, ইহাও ঠিক তদ্রূপই। আর নামপ্রভৃতিতে যে ব্রহ্মদৃষ্টি, তাহাও ঠিক প্রতিমাপ্রভৃতি আলম্বনে ব্রহ্মদৃষ্টির ন্যায় আলম্বনরূপেই (চিন্তার বিষয়রূপেই) বিহিত হইয়া থাকে।

৪. ব্রহ্মসূত্র ( ১/১/২০)
স্যাৎ পরমেশ্বরস্য অপি ইচ্ছাবশাৎ মায়াময়ং রূপং সাধকানু গ্রহাথম।
শাঙ্কর ভাষ্যঃ সাধককে অনুগ্রহ করিবার জন্য পরমেশ্বরেরও ইচ্ছাবশতঃ মায়াময়রূপ হয় সম্ভব।

৫.ব্রহ্মসূত্র ( ১/৩/৩৩)
অস্তি হি ঐশ্বর্য্যযোগাৎ দেব- তানাং জ্যোতিরাজ্যাত্মভিশ্চ অবস্থাতুং, যথেষ্টং চ তং তং বিগ্রহং গ্রহীতুং সামর্থ্যম্ ।

শাঙ্কর ভাষ্যঃ ঐশ্বর্য্যের যোগবশতঃ (-নানাপ্রকার শরীর ধারণ করিবার সামর্থ্যরূপ বিভূতিযুক্ত হন বলিয়া) দেবগণের জ্যোতির্মগুলাদিরূপে অবস্থান করিবার এবং ইচ্ছানুযায়ী তত্তৎ শরীর গ্রহণ করিবার সামর্থ্য আছে।

৬. ঈশোপনিষদ ( ১৫ নং মন্ত্র)

হিরন্ময়েন পাত্রেন সত্যস্যাপিহিতং মুখম্ তৎ ত্বং পুষন্নপাবৃনু সত্যধর্মায় দৃষ্টয়ে।
- হিরন্ময় পাত্র দ্বারা সত্যের ( পুরুষোত্তম বস্তুর) মুখ আচ্ছাদিত রয়েছে ( যোগমায়া সমাবৃত)। হে পোষণকারী দেবতা, সত্যধর্ম আমার দৃষ্টির জন্য, উপলব্ধির জন্য তাহা অপসারণ করো।

৭. বিষ্ণু সংহিতা ( পঞ্চষষ্টিতম অধ্যায়)

অথাতঃ সুন্নাত: সুপ্রক্ষালিতপাণিপাদঃ স্বাচান্তো
দেবতার্চ্চায়াৎ স্থলে  বা ভগবন্তমনাদিনিধনং বাসুদেব- মভ্যর্জয়েৎ। ১। অশ্বিনোঃ প্রাণন্তেীত ইতি জীবা- দানং দত্ত্বা যুঞ্জতে মনঃ ইত্যম্বুবাকেনাবাহনং রুহা জানুভ্যাং পাণিভ্যাং শিরসা চ নমস্কারং কুষ্যাৎ। ২। আপোহিষ্ঠেতি তিস্বভিরাং নিবেদয়েৎ। ৩।

অর্থাৎ, অনন্তর উত্তমরূপে স্নান, তদন্তে উত্তমরূপে হস্ত- পদ প্রক্ষালন ও তৎপরে উত্তমরূপে আচমন করিয়া, দেবপ্রতিমাতে কিংবা স্থলে (অর্থাৎ ঘটা- দিতে) জন্ম-মৃত্যুরহিত ভগবান্ বাসুদেবের পুজা করিবে। "আশ্বনোঃ প্রাণাস্তোত” এই মন্ত্র দ্বারা জীব দান করিয়া-"যুঞ্জতে মনঃ' এই অনুবাক দ্বারা আহবান করবে। " আপোহিষ্ঠাঃ " ইত্যাদি মন্ত্র দ্বারা অর্ঘ্য প্রদান করবে।
এখানে দ্রষ্টব্য যে এই " যুঞ্জতে মনঃ " মন্ত্রটি শুক্ল যজুর্বেদে পাওয়া যায়, যার প্রয়োগ করে সংহিতা'য় সাকার উপাসনা করার নির্দেশ দিচ্ছে। যথাঃ
যুঞ্জতে মন উত যুঞ্জতে ধিয়ো বিপ্রা বিপ্রস্য বৃহতো বিপশ্চিতঃ। বি হোত্রা দধে বয়নাবিদেক ইন্মহী দেবস্য সবিতুঃ পরিষ্টুতিঃ ॥ 8 ॥ -( শুক্ল যজুর্বেদ)
আবার ঋগ্বেদেও এই মন্ত্রটির উল্লেখ পাওয়া যায়।
৮১ সূক্ত
[দেবতা: সবিতা। ঋষি: অত্রির অপত্য শ্যাবাশ্ব। ছন্দ: জগতী)

যুঞ্জতে মন উত যুঞ্জতে ধিয়ো বিপ্রা বিপ্রস্য বৃহতো বিপশ্চিতঃ। বি হোত্রা দধে বয়নাবিদেক ইন্মহী দেবস্য সবিতুঃ পরিষ্টুতিঃ। ১॥

আবার, " আপোহিষ্ঠাঃ " এই মন্ত্রটিও শুক্র যজুর্বেদে পাওয়া যায়, যার প্রয়োগ করে সংহিতা'য় বিষ্ণুমূর্তির পূজার নির্দেশ আছে।! যথাঃ
আপো হি ষ্ঠা ময়োভুবস্তা ন উর্জে দধাতন। মহে রণায় চক্ষসে ॥ ১৪॥

৮. বিষ্ণু সংহিতা -২
তম্বোপ্যর ন্যাসেৎ স্বর্ণপাত্রে দেবং সুরেশ্বরম্। সুবর্ণনিষ্কষটুকেন নিৰ্ম্মিতং বজ্রবারিণম্। ১৭ যজেৎ পুরুষসূক্তেন বাসবং বিশ্বরূপিণম্।.
- তদুপরি স্বর্ণপাত্র রাখিয়া তাহাতে ছয় নিষ্ক পরিমিত সুবর্ণ দ্বারা নিৰ্ম্মিত বজ্রহস্ত দেবরাজ-প্রতিমা স্থাপন করিয়া বিশ্বরূপী ইন্দ্রদেবকে পুরুষসূক্ত মন্ত্র দ্বারা  পূজা করবে। 
এখানেও ঋগ্বেদোক্ত পুরুষ সূক্ত দ্বারা ইন্দ্রের সাকার মূর্তির পূজার বিধান দেওয়া হচ্ছে। 

৯. শাতাতপঃ সংহিতা
নিষ্কহপম্রা তু কর্তব্যো দেবঃ শ্রীবৎসলাঞ্ছনঃ
পট্টবস্ত্রেণ সংবেষ্ট্য পূজয়েৎ তং বিধানত
- নিষ্কপরিমিত সুবর্ণ দ্বারা শ্রীবৎস লাঞ্ছন শ্রীকৃষ্ণের প্রতিমূর্তি নির্মাণ করে পট্টবস্ত্র দ্বারা ঐ মূর্তি বেষ্টিত করে উক্ত দেবের যথাবিধি পূজা করবে।
এছাড়াও গৃহ্যসূত্রাদিতে সাকার উপাসনার ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। 

১০. শুক্ল যজুর্বেদ -( ১৬শ অধ্যায়)
নমস্তে রুদ্র মন্যব উতো ত ইষবে নমঃ। বাহুভ্যামুত তে নমঃ।
 - হে রুদ্রদেব, আপনার ক্রোধের উদ্দেশ্যে আমি নমস্কার করি। আপনার বাণের উদ্দেশ্যে এবং আপনার বাহুযুগলের উদ্দেশ্যে আমি নমস্কার করি।
নমস্তে নীলগ্রীবায় সহস্রাক্ষায় মীঢুষে ( ৮ নং মন্ত্র)
 - তিনি নীলবর্ণের কণ্ঠবিশিষ্ট। সহস্র অক্ষিযুক্ত  তাঁকে আমি প্রণাম জানাই।
হস্তে বভূব তে ধনুঃ ( ১১ নং মন্ত্র) 
 - তিনি হস্তে ধনু ধারণ করেছেন। 




এভাবেই বেদে পরোক্ষভাবে দেবতার সাকার রূপের অসংখ্য বর্ণনা পাওয়া যায়। 
অনেকের দাবি বাল্মিকী রামায়ণে সাকার উপাসনা বা প্রতিমাপূজার উল্লেখ নেই।  কিন্তু মূল বাল্মিকী রামায়ণেও পরোক্ষভাবে সাকার উপাসনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 

স তত্র ব্রহ্মণঃ স্থানমগ্নেঃ স্থানং তথৈব চ ৷
বিষ্ণোঃ স্থানং মহেন্দ্রস্য স্থানং চৈব বিবস্বতঃ ॥১৭
 সোমস্থানং ভগস্থানং স্থানং কৌবেরমেব চ।
 ধাতুর্বিধাতুঃ স্থানে চ বায়োঃ স্থানং তথৈব চ ॥১৮
 নাগরাজস্য চ স্থানমনন্তস্য মহাত্মনঃ ॥
স্থানং তথৈব গায়ত্রা বসূনাং স্থানমেব চ ॥১৯
 স্থানং চ পাশহস্তস্য বরুণস্য মহাত্মনঃ ॥
কার্তিকেয়স্য চ স্থানং ধর্মস্থানং চ পশ্যতি ॥২০ ॥

গোবিন্দ রাজ স্বামীর ভাষ্য অনুসারে এর অনুবাদ:-

শ্রীরামচন্দ্র সীতা দেবী ও লক্ষ্মণের সাথে অগস্ত্য মুনির আশ্রমে প্রবেশ করে অনেক দেবপূজাগৃহাদি দর্শন করলেন। চতুর্মুখ ব্রহ্মার মন্দির বা পূজা স্থান, অগ্নি, বিষ্ণু, ইন্দ্র, চন্দ্র, ভগ, কুবের, ধাতা ও বিধাতা, বায়ু, নাগরাজ অনন্তশেষ, শষ, গায়ত্রী, বসু ও পাশহস্ত বরুণ দেবের বিগ্রহ সেবিত মন্দির, কার্তিকেয় ও ধর্মরক্ষক যমের মন্দির দর্শন করলেন।

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, মূল শ্লোকে পাশহস্ত বরুণের উল্লেখ আছে। অর্থাৎ এখানে বরুণ অর্থে বেদের নিরাকার শক্তি নন। হাতে পাশ ধারণ করে আছেন এমন সাকার প্রতিমূর্তি বরুণদেবের উল্লেখ পাই। 
এভাবেই বেদ, উপনিষদ, উনবিংশ সংহিতা, বাল্মিকী রামায়ণ সহ অন্যান্য বৈদিক শাস্ত্রে প্রতিমা পূজার মাধ্যমে সাকার উপাসনার উল্লেখ পাওয়া যায়।

Saturday, November 23, 2024

ব্রাহ্মণের নয়গুন সমন্বিত যজ্ঞোপবীত


 আমরা সকলেই ব্রাহ্মণের গলায় একটা নয় প্যাচ যুক্ত পৈতা বা যজ্ঞোপবীত দেখতে পাই, যা প্রমাণ করে যে সে একজন ব্রাহ্মণ। আর এই পৈতা বা যজ্ঞোপবীত এক বিপ্র বালক এমনি এমনি পায় না; তাকে এটা দেয়ার জন্য উপনয়ন সংস্কার প্রচলিত আছে, এই উপনয়ন সংস্কারের মাধ্যমেই এক বিপ্রবালক সয়ংসম্পূর্ণ দ্বিজ এবং বিপ্র হয়ে উঠে। 

কিন্তু আমরা অনেক ব্রাহ্মণ এবং অনেকেই এই যজ্ঞোপবীতের নয়টি গুন কি কি তা জানি না! এই যজ্ঞোপবীতের নয়টি গুন সম্পর্কে শ্রীমদ্ভগবতগীতা বলছে.....

শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ।

জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম॥

~ [শ্রীমদ্ভগবতগীতা - ১৮/৪২]

অর্থ: শম, দম, তপঃ, শৌচ, ক্ষান্তি, আর্য, জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং আস্তিক্য এই সব হলো ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত (পূর্বজন্মের স্বীকৃতি প্রাপ্ত) কর্ম।

আমরা গীতার এই শ্লোক দ্বারা এইটা বুঝতে পারি যে এইসব (শম,দম,তপ ইত্যাদি) হলো ব্রাহ্মণের যজ্ঞোপবীতের এক একটি গুন সমন্বিত কর্ম, ব্রাহ্মণের এক একটি পৈতার প্যাচে এই এক একটি গুন আছে; কিন্তু আমরা এই গুলো জানলেও উপরে দেয়া গুন গুলোর চলিত ভাষায় অর্থ জানি না, আজকে আমরা সেটিই জানবো.......

ব্রাহ্মণের পৈতা বা যজ্ঞোপবীতের প্রথম গুনটি হলো~

শম:- শম অর্থ হলো অন্তর ইন্দ্রিয়ের বা মনের সংযম। আমাদের মধ্যে সবার মধ্যেই যে মন আছে তা নিয়ন্ত্রণে রাখাই হলো শম, আর ব্রাহ্মণ সবসময় তার মন নিয়ন্ত্রণে রাখে, তাই তার প্রথম গুন শম।

[এই পৈতার প্রথম গন্ডির দেবতা হলো পরমাত্মা বা ॐ]

ব্রাহ্মণের পৈতা বা যজ্ঞোপবীতের দ্বিতীয় গুনটি হলো~

 দম:- দম অর্থ হলো বহিঃ ইন্দ্রিয়ের সংযম, আমাদের শরীরে যে একাদশ ইন্দ্রিয় এবং প্রধান পাচ ইন্দ্রিয় (নাক, কান, চোখ, ত্বক এবং জিহ্বা) আছে তা নিয়ন্ত্রণে রাখাই হলো দম, ব্রাহ্মণ সবসময় চেষ্টা করে এই বহিঃ ইন্দ্রিয় সংযমে রাখার, তাই তার দ্বিতীয় গুন দম।

[এই পৈতার দ্বিতীয় গণ্ডীর দেবতা হলো অগ্নিদেব]

ব্রাহ্মণের পৈতা বা যজ্ঞোপবীতের তৃতীয় গুনটি হলো~

তপ:- তপ অর্থ হলো তপস্যা করা, কিন্তু কলিযুগে তপস্যা না থাকায় এখানে তপস্যা শব্দের অর্থ ঈশ্বরের চিন্তা করা; আর ব্রাহ্মণ সবসময় ঈশ্বরের চিন্তা বা ঈশ্বরের কর্ম করে, তাই তার তৃতীয় গুন হচ্ছে তপ।

[এই পৈতার তৃতীয় গণ্ডীর দেবতা হলেন অনন্তনাগ]

ব্রাহ্মণের পৈতা বা যজ্ঞোপবীতের চতুর্থ গুনটি হলো~

শৌচ:- শৌচ অর্থ হলো পবিত্রতা, ব্রাহ্মণ সবসময় পবিত্র; তাই ব্রাহ্মণের আরেক গুন হলো শৌচ।

[এই পৈতার চতুর্থ গণ্ডীর দেবতা হলেন চন্দ্রঁদেব]

ব্রাহ্মণের পৈতা বা যজ্ঞোপবীতের পঞ্চম গুনটি হলো~

ক্ষান্তি:- ক্ষান্তি অর্থ হলো ক্ষমা করা, ব্রাহ্মন সবসময় ক্ষমাশীল এবং সে সবসময় অন্যকে ক্ষমা করতে শিখে ছোটো হতে, তাই তার পৈতার আরেক গুন হলো ক্ষান্তি!

[এই পৈতার পঞ্চম গণ্ডীর দেবতা হলেন পিতৃপুরুষগন]

ব্রাহ্মণের পৈতা বা যজ্ঞপবীতের ষষ্ঠ গুনটি হলো~

আর্য:- আর্য শব্দের অর্থ হলো সরলতা, ব্রাহ্মণ সবসময় শুভচিন্তক, তাই ব্রাহ্মণ সরল প্রকৃতির; এইজন্য‌ই ব্রাহ্মণের আরেকটি গুন হলো আর্য বা সরলতা!

[এই পৈতার ষষ্ঠ গণ্ডীর দেবতা হলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা]




ব্রাহ্মণের পৈতা বা যজ্ঞপবীতের সপ্তম গুনটি হলো~

জ্ঞান:- এখানে জ্ঞান শব্দের অর্থ শাস্ত্রজ্ঞান বোঝানো হয়েছে, ব্রাহ্মণ সবসময় শাস্ত্র অধ্যায়ন এবং অধ্যাপনা করান, তাই তার আরেক গুন হলো জ্ঞান।

[এই পৈতার সপ্তম গণ্ডীর দেবতা হলেন বায়ুদেব]

ব্রাহ্মণের পৈতা বা যজ্ঞপবীতের অষ্টম গুনটি হলো~

বিজ্ঞান:- এখানে বিজ্ঞান শব্দের অর্থ হলো আত্ম জ্ঞান; ব্রাহ্মণ সবসময় নিজের আত্মাকে জানেন এবং তাকেই পরমাত্মার অংশ‌ বলে মানেন, তাই তার আরেক গুন বিজ্ঞান।

[এই পৈতার অষ্টম গণ্ডীর দেবতা হলেন সূর্যদেব]

ব্রাহ্মণের পৈতা বা যজ্ঞোপবীতের একদম শেষের গুনটি হলো~

আস্তিক্য:- এখানে আস্তিক্য শব্দের অর্থ হলো বিশ্বাস রাখা; ব্রাহ্মণ সবসময় তার গুরু, বেদ এবং অন্যান্য শাস্ত্রে বিশ্বাসী, তাই তার আরেক গুন হলো আস্তিক্য।

[এই পৈতার শেষের গণ্ডীর দেবতা হলেন সবাই অর্থাৎ সমস্ত দেবদেবী]

এই হলো ব্রাহ্মণের পৈতা বা যজ্ঞোপবীতের নয়টি গুন এবং তার অর্থ, আজকের আলোচনা এতোটুকুই; আবার আগামী পোষ্টে নতুন কোনো টপিক নিয়ে দেখা হবে!

{অতিরিক্ত যুক্ত:- পৈতায় থাকা নয়টি গুনের দেবতা} 

নমস্কার, নমঃ শিবায় 

শিবার্পনমস্তু

Friday, November 1, 2024

বেদাদি শাস্ত্রে পশুবলির প্রমাণ

 

এষ ছাগঃ পুরো অশ্বেন বাজিনা পুষ্ণে ভাগো নীয়তে বিশ্বদেব্যঃ।


অভিপ্রিয়ং যত্ পুরোলোশমর্বতা ত্বষ্টেদেনং সোশ্রবসায় জিন্বতি।।     – ঋগবেদ ১/১৬২/৩


অর্থাৎ, সকল দেবতার উপযুক্ত ছাগ পূষারই ভাগে পড়ে, একে দ্রুতগতি অশ্বের সাথে সম্মুখে আনা হচ্ছে। অতএব ত্বষ্টা দেবতাগণের সুভোজনের নিমিত্ত অশ্বের সাথে ঐ অজ হতে সুখাদ্য পুরোডাশ প্রস্তত করুন।


যদশ্বস্য ক্রবিষো মক্ষিকাশ যদ্বা স্বরৌ স্বধিতৌ রিপ্তমস্তি।


যদ্ হস্তয়ৌঃ শামিতুর্যন্নখেষু সর্বা তা তে অপি দেবেষ্বস্তু।।    – ঋগবেদ ১/১৬২/৯


অর্থাৎ, অশ্বের অপক্ক মাংসের যে অংশ মক্ষিকা ভক্ষণ করে, ছেদনকালে বা পরিস্কার করবার সময় ছেদন ও পরিস্কার সাধন অস্ত্রে যা লিপ্ত হয় , ছেদকের হস্তদ্বয়ে এবং নখে যা লিপ্ত থাকে, সে সমস্তই দেবগণের নিকট যাক।


যদুবধ্যমুদরস্যাপবাতি য আমস্য ক্রবিষো গন্ধো অস্তি।


সুকৃতা তচ্ছমিতারঃ কৃণ্বন্তুত মেধং শৃ্তপাকং পচন্তু।।     – ঋগবেদ ১/১৬২/১০


অর্থাৎ, উদরের অজীর্ণ তৃণ বের হয়ে যায়, অপক্ক মাংসের যে লেশমাত্র থাকে, ছেদনকর্তা তা নির্দোষ করুন এবং পবিত্র মাংস দেবতাগণের উপযোগী করে পাক করুন।


যত্তে গাত্রাদগ্নিনা পচ্যমানাদভি শূলং নিহতস্যাবধাবতি।


মা তদ্ ভুম্যামা শ্রিষন্মা তৃণেষু দেবেভ্যস্তদুশদ্ভ্যো রাতমস্তু।।    – ঋগবেদ ১/১৬২/১১


অর্থাৎ, হে অশ্ব, অগ্নিতে পাক করবার সময়, তোমার গাত্র হতে যে রস বের হয় এবং যে অংশ শূলে আবদ্ধ থাকে তা যেন ভূমিতে পড়ে না থাকে এবং তৃণের সাথে মিশ্রিত না হয়। দেবতারা লালায়িত হয়েছেন, সমস্তই তাদের প্রদান করা হউক।


যে বাজিনং পরিপশ্যন্তি পক্বং যে ইমাহুঃ  সুরভির্নির্হরেতি।


যে চার্বতো মাংসভিক্ষামুপাসত উতো নেষামভিগুর্তির্ন ইন্বতু।।   – ঋগবেদ  ১/১৬২/১২


অর্থাৎ, যারা চারিদিক হতে অশ্বের পাক দর্শন করে, যারা বলে এর গন্ধ মনোহর হয়েছে, এখন নামাও এবং যারা মাংস ভিক্ষার জন্য অপেক্ষা করে, তাদের সংকল্প আমাদের সংকল্প হোক।


এভাবে ঘোড়াকে কেটে, রান্না করেও বলা হত ঘোড়া মরে নি, সে স্বর্গে দেবতাদের কাছে গিয়েছেঃ


ন বা উ এতন্ ম্রিয়সে ন রিষ্যসি দেবাং ইদেষি পথিভিঃ সুগেভিঃ    – ঋগবেদ    ১/১৬২/২১


অর্থাৎ, হে অশ্ব! তুমি মরছ না অথবা লোকে তোমার হিংসা করছে না, তুমি উত্তম পথে দেবতাগণের নিকট যাচ্ছ।


সব কিছু সমাপ্ত করে ঘোড়ার কাছে অর্থাৎ অশ্বমেধ থেকে ধন, পুত্র এবং শারীরিক বলের কামনা করা হতঃ


সুগব্যং তো বাজী স্বশ্ব্যং পুংসঃ পুত্রান্ উত বিশ্বাপুষং রয়িম্।


অনাগাস্ত্বং ত অদিতিঃ কৃণোতু ক্ষত্রং তো অশ্বা বনতাং হবিষ্মান্।।    – ঋগবেদ ১/১৬২/২২








অর্থাৎ, এ অশ্ব, আমাদের গো ও অশ্ববিশিষ্ট জগৎপোষক ধন প্রদান করুক, আমাদের পুরুষ অপত্য দান করুক। তেজস্বী অশ্ব আমাদের পাপ হতে বিরত করুক। হবির্ভূত অশ্ব আমাদের শারীরিক বল প্রদান করুক


অথ সংবৎসরে পূর্ণে তস্মিন্ প্রাপ্তে তুরংগমে।


সরয়্বাশ্চোত্তরে তীরে রাজ্ঞো যজ্ঞোহভ্যবর্তন।। ১


ঋষ্যশৃংগং পুরস্কৃত্য কর্ম চক্রুর্দ্বিজর্ষভাঃ।


অশ্বমেধে মহাযজ্ঞে রাজ্ঞোস্তস্য সুমহাত্মনঃ।। ২


নিযুক্তাস্তত্র পশাবস্তত্তদুদি্দশ্য দৈবতম্।


উরগা পক্ষিণশ্চৈব যথাশাস্ত্রং প্রচোদিতাঃ।।৩০


শামিত্রে তু হযস্তত্র তথা জলচরাশ্চ যে।


ঋষিভিঃ সর্বমেবৈতন্নিযুক্তং শাস্ত্রতস্তদা।। ৩১


পশুনাং ত্রিশতং তত্র যুপেষু নিয়তং তদা।


অশ্বরত্নোত্তমং তত্র রাজ্ঞো দশরথস্য চ।। ৩২


কৌসল্যা তং হয়ং তত্র পরিচর্য সমন্ততঃ।


কৃপাণৌর্বিশশাসৈনং ত্রিভিঃ পরময়া মুদা।। ৩৩


পত্রত্ত্রিণা তথা সার্ধং সুস্থিতেন চ চেতসা।


অবসদ্ রজনীমেকাং কৌসল্যা ধর্মকাম্যয়া।। ৩৪


হোতাধ্বর্যুস্তথোদ্গাতা হয়েন সমযোজয়ন্।


মহিষ্যা পরিবৃত্ত্যাথ বাবাতামপরাং তথা।। ৩৫


পতত্ত্রিণস্তস্য বপামুদ্ধৃত্য নিয়তেন্দ্রিয়ঃ।


ঋত্বিক্পরমসম্পন্নঃ শ্রপয়ামাস শাস্ত্রতঃ।। ৩৬


ধুমগন্ধং বপায়াস্তু জিঘ্রতি স্ম নরাধিপ।


যথাকালং যথান্যায়ং নির্ণুদন্ পাপমাত্মনঃ।। ৩৭


হয়স্য যানি চাংগানি তানি সর্বাণি ব্রাহ্মণাঃ।


অগ্নৌ প্রাপ্স্যন্তি বিধিবত্ সমস্তাঃ ষোড়শর্ত্বিজঃ।। ৩৮ 


(বালকাণ্ড, সর্গ ১৪)


তারপরে এক বছর সম্পন্ন হলে ঘোড়া ফিরে এল এবং সরযূ নদীর উত্তর তীরে রাজার যজ্ঞ আরম্ভ হল। (১) মহাত্মা রাজা (দশরথ)র  অশ্বমেধ নামক মহাযজ্ঞে শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণগণ ঋষ্যশৃঙ্গ কে নিজেদের প্রধান বানিয়ে যজ্ঞকর্ম করতে লাগলেন। (২) … পশু, পক্ষী এবং সাপ, যাদের রাখার অনুমতি শাস্ত্র দেয় তাদের অধিষ্ঠাতা দেবতাদের নামে সেখানে রাখা হল। (৩০) ঋষিরা যজ্ঞে বধ করার জন্য ঘোড়া এবং জলচর প্রাণীদের যূপের সাথে বাধলেন। (৩১) সেই যজ্ঞে তিনশত পশু যূপের সাথে বাঁধা হয়েছিল।রাজা দশরথের সেই শ্রেষ্ঠ ঘোড়াকেও ( যে পৃথিবীর সর্বত্র ঘুরে এসেছিল) বাঁধা হয়েছিল। কৌশল্যা খুশিমনে অশ্বের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে  তলোয়ারের তিন কোপে তাকে হত্যা করেছিলেন। (৩৩) কৌশল্যা ঐ মৃত ঘোড়ার পাশে সাবধানচিত্ত হয়ে ধর্মের কামনা করে এক রাত অবস্থান করেছিলেন। (৩৪) তারপর হোতা, অধ্বর্যু এবং উদগাতা মহিষী (যে রানির রাজার সাথে রাজ্যাভিষেক হয়েছিল), পরিবৃত্তি (রাজার শূদ্র জাতীয় পত্নী) এবং বাবাতা (রাজার বৈশ্য জাতীয় পত্নী) এই তিন শ্রেণীর রানিদের ঘোড়ার সাথে যুক্ত করেছিলেন। (৩৫) জিতেন্দ্রিয় এবং শ্রৌতকর্মে কুশল ঋত্বিক (পুরোহিত) ঐ ঘোড়ার চর্বি বের করেছিল এবং শাস্ত্রানুসারে তা রান্না করেছিল। (৩৬) রাজা দশরথ সেই হবনকৃত চর্বির গন্ধ উপযুক্ত সময়ে বিধান অনুসারে শুঁকেছিলেন, যার ফলে তার পাপ দূর হয়ে গিয়েছিল। (৩৭) ষোল জন ঋত্বিক ব্রাহ্মণেরা মিলে ওই ঘোড়ার যত অঙ্গ ছিল, সব গুলোকে অগ্নিতে হবন করেছিলেন।


যজস্ব বাজিমেধেন বিধিবত্ দক্ষিণাবতা।। ১৫


অশ্বমেধো হি রাজেন্দ্র পাবনঃ সর্বপাপ্মনাম্।


তেনেষ্ট্বা ত্বং বিপাপ্মা বৈ ভবিতা নাত্র সংশয়ঃ।। ১৬  (অশ্বমেধিকপর্ব, অধ্যায় ৭১)


অর্থাৎ, ব্যাস বলেছেন, “ হে যুধিষ্ঠির, বিধি পূর্বক দক্ষিণা দিয়ে অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান কর। রাজেন্দ্র, অশ্বমেধ যজ্ঞ সমস্ত পাপ নাশ করে যজমানকে পবিত্র করে। এর অনুষ্ঠান করে তুমি পাপমুক্ত হবে, এতে সংশয় নেই।“


ততো নিযুক্তাঃ পশবো যথাশাস্ত্রং মনীষিভিঃ।


তং তং দেবং সমুদ্দিশ্য পক্ষিণঃ পশবশ্ব যে।।


ঋষভাঃ শাস্ত্রপঠিতাস্তথা জলচরাশ্চ যে।


সর্বাস্তানভ্যযুংজংস্তে তত্রাগ্নিচযকর্মণি।।


যুপেষু নিয়তা চাসীত্ পশুনাং ত্রিশতী তথা।


অশ্বরত্নোত্তরা যজ্ঞে কৌন্তেয়স্য মহাত্মনঃ।।   (অশ্বমেধিকপর্ব  ৮৮/৩৩-৩৫)


অর্থাৎ, এরপর মনিষী ঋত্বিকেরা শাস্ত্রোক্ত বিধি অনুসারে পশুদের নিযুক্ত করলেন। ভিন্নভিন্ন দেবতাদের উদ্দেশ্যে পশু, পাখি এবং শাস্ত্রকথিত বৃষভ এবং জলচর জন্তু-  এদের অগ্নিস্থাপন কার্যে যাজকেরা ব্যবহার করলেন। কুন্তীনন্দন মহাত্মা যুধিষ্ঠির এই যজ্ঞে যে সব যূপ দাঁড় করানো হয়েছিল, তাতে তিনশত পশু বাঁধা হয়েছিল। এসবের মধ্যে প্রধান সেই অশ্বরত্ন ছিল।


(মহাভারত, খণ্ড ৬, গীতাপ্রেস, গোরক্ষপুর, হিন্দি অনুবাদ সহিত, পৃষ্ঠা ৬২৯০)


শ্রপয়িত্বা পশুনন্যান্ বিধিবদ্ দ্বিজসত্তমাঃ।


তং তুরংগং যথাশাস্ত্রমালভন্ত দ্বিজাতয়ঃ।। ১


ততঃ সংশ্রপ্য তুরংগং বিধিবদ্ যাজকাস্তদা।


উপসংবেশয়ন্ রাজংস্ততস্তাং দ্রুপদাত্মজাম্।। ২


উদ্ধৃত্য তু বপাং তস্য যথাশাস্ত্রং দ্বিজাতয়ঃ।। ৩


শ্রপয়ামাসুরব্যগ্রা বিধিবদ্ ভরতর্ষভ।


তং বপাধুমগন্ধং তু ধর্মরাজঃ সহানুজৈঃ।। ৪


উপাজিঘ্রদ্ যথাশাস্ত্রং সর্বপাপাহং তদা।


শিষ্টান্যংগানি যান্যাসংস্তস্যাশ্বস্য নরাধিপ।। ৫


তান্যগ্নৌ জুহুবুর্ধীরাঃ সমস্তাঃ ষোড়শর্ত্বিজঃ।। ৬     ( অশ্বমেধিক পর্ব ৮৯ )


অর্থাৎ, সেই শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণেরা অন্যান্য পশুদের বিধিপূর্বক রান্না করে ওই অশ্বকেও শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে বধ করলেন। (১) রাজন, তারপর যাজকেরা বিধিপূর্বক অশ্বকে রান্না করে তার কাছে দ্রৌপদীকে শাস্ত্রোক্ত বিধি অনুসারে বসালেন। (২)  হে ভরতশ্রেষ্ঠ, তারপর ব্রাহ্মণেরা শান্তচিত্ত হয়ে সেই অশ্বের চর্বি বের করে তাকে বিধিপূর্বক রন্ধন করা শুরু করলেন। (৩) ভাইদের সাথে যুধিষ্ঠির শাস্ত্রোক্ত আজ্ঞা অনুসারে সমস্ত পাপনাশক সেই চর্বির ধোয়ার গন্ধ শুঁকেছিলেন। (৪) নরেশ্বর, ওই অশ্বের যে শেষ অঙ্গ ছিল তা দিয়ে শান্ত স্বভাবের সমস্ত ষোল জন ঋত্বিকেরা অগ্নিতে হোম করেছিলেন। (৫) (মহাভারত, ষষ্ঠ খণ্ড, গীতাপ্রেস, গোরখপুর, হিন্দি অনুবাদ সহিত, পৃষ্ঠা ৬২৯০-৬১৯১)


৩৯। যজ্ঞার্থং পশবঃ সৃষ্টাঃ স্বয়মেব স্বয়ম্ভুবা।


যজ্ঞস্য ভূত্যৈ সর্বস্য তস্মাদ্‌যজ্ঞে বধোহবধঃ ॥


ব্রহ্মা নিজেই যজ্ঞের জন্য পশুগণকে সৃষ্টি করেছেন। যজ্ঞ সকলের উন্নতির কারণ ; সুতরাং, যজ্ঞে পশুবধ বধ নয়।


৪০। ওষধ্যঃ পশবো বৃক্ষাস্তির্যঞ্চঃ পক্ষিণস্তথা।


যজ্ঞার্থং নিধনং প্রাপ্তাঃ প্রাপ্নুবন্ত্ত্যচ্ছ্রিতীঃ পুনঃ ॥


ওষধি (যে গাছ ফল পাকলে মরে যায়), পশুগণ, বৃক্ষসমূহ, কচ্ছপাদি তির্যগ্‌জাতি ও পক্ষিগণ যজ্ঞের জন্য নিহত হলে পুনরায় উচ্চ জন্ম লাভ করে।


৪১। মধুপর্কে চ যজ্ঞে চ পিতৃদৈবতকর্মণি।


অত্রৈব পশবো হিংস্যা নান্যত্রেত্যব্রবীন্মনুঃ ॥


মধুপর্কে২, যজ্ঞে, পিতৃকার্যে ও দৈবকার্যেই শুধু পশুহত্যা বিহিত, অন্য স্থলে নয়—এই কথা মনু বলেছেন।


৪২। এবর্থেষু পশুন্‌ হিংসন্‌ বেদতত্ত্বার্থবিদ্‌ দ্বিজঃ।


আত্মানঞ্চ পশুঞ্চৈব গময়ত্যুত্তমাং গতিম্ ॥


এই সকল উপলক্ষ্যে পশুহত্যা করে বেদতত্ত্বজ্ঞ দ্বিজ নিজেকে ও (ঐ) পশুকে সদগতি লাভ করান।


৪৩। গৃহে গুরাবরণ্যে বা নিবসন্নাত্মবান্‌ দ্বিজঃ।


নাবেদবিহিতাং হিংসামাপদ্যপি সমাচরেৎ ॥


গৃহে, গুরুগৃহে বা বনে বাস করে প্রশস্তাত্মা দ্বিজ বেদনিষিদ্ধ হিংসা বিপদ্‌কালেও করবেন না।


৪৪। যা বেদবিহিতা হিংসা নিয়তাস্মিংশ্চরাচরে।


অহিংসামেব তাং বিদ্যাদ্বেদাদ্ধর্মো হি নির্বভৌ॥


এই চরাচর জগতে যে হিংসা বেদবিহিত, তাকে অহিংসা বলেই জানবে ; কারণ, বেদ থেকে ধর্ম প্রকাশিত হয়েছিল।


মনুস্মৃতি ৫ অধ্যায় 


মনুস্মৃতির একটি শ্লোকের মধ্যেও বলা নেই যে বেদে পশুবলি নিষিদ্ধ বরং বলা হয়েছে বেদ নির্দেশিত পশুবলি অহিংসা

Thursday, October 17, 2024

"শ্রী শ্রী অশ্বিনীকুমারদ্বয় ব্রত", দুই চিকিৎসক দেবতার ইতিবৃত্ত

অশ্বিনী কুমারদ্বয়।সনাতন দেব পরম্পরার  মহত্তপূর্ণ দুইজন দেবতা।সনাতনের সবচেয়ে প্রাচীন শাস্ত্রে যে তেত্রিশ জন বা কোটী দেবতার উল্লেখ রয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম এই দুই দেব।পবিত্র বেদের সংহিতা ভাগ থেকে বেদের ব্রাহ্মণভাগ,সুপ্রাচীন বৃহদ্দেবতা থেকে পুরান মহাপুরাণ উপপুরাণ, লোককথা সব জায়গায় রয়েছে এই দুইজন দেবের মাহাত্ম্য। 


অশ্বিনী কুমারদের পরিচয় দিতে গিয়ে পৃথিবীর প্রথম লিখিত সাহিত্য গ্রন্থ পবিত্র  ঋগ্বেদ জানাচ্ছে...

"ত্বষ্টা দুহিত্রে বহতু কৃণোতীতীদং বিশ্বংভূবংসমেতি।

যমস্য মাতা পর্যহ্যমানা মহো জায়া বিবস্বতে ননাস।।

অপাগৃহন্নমৃতাং মত্যের্ভ্যুঃ কৃত্বী সর্বন্নামদদুবিবস্বতে।

উতাশ্বিনাবভরদ্যওদাসীদজহাদু দ্বা মিথুনাসকন্যঃ।।[ঋগ্বেদ ১০/১৭/১-২]


ভাবার্থ-ত্বষ্টা দেব বিশ্বকর্মা নিজ কন্যা সুরণ্য সংজ্ঞা কে বিবস্বান সূর্যের সাথে বিবাহ দিলে যম দেবের জন্ম হয়।পরবর্তীতে সঙ্ঘা অদর্শন হইলে, তার মতো এক দিব্য নারীর সৃষ্টি করা হয় যাহা হতে অশ্বিনীকুমারদ্বয় দেবগণ জন্মগ্রহণ করেন।।


বৈদিক সাহিত্যের অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থ বৃহদ্দেবতা। মহর্ষি শৌনক রচিত এই গ্রন্থের রচনা আনুমানিক ১৫০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ।অর্থাৎ আজকে থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে।  সুপ্রাচীন এই বৈদিক শাস্ত্রের মত প্রায়ই ঋগ্বেদের মতো একই। বৃহদ্দেবতাকার জানাচ্ছেন, 


"সরণ্যশ্চ বিবস্বস্তং বিদিত্বা হয়রূপিণম্। মৈথুনায়োপচক্রাম তাঞ্চ তত্রারূরোহ সঃ ॥ 

ততস্তয়োত্ত্ব বেগেন শুক্রং তদপতত্ত্ববি। 

উপাজিমুচ্চ সা তথা তদুক্ৰং গর্ভকামায়া ৷৷ আঘাতমাত্রাচ্ছক্রান্তু কুমারৌ সংবভূবতুঃ। 

নাসত্যশ্চৈব দশ্চ যৌ খ্যাতাবশ্বিনাবিতি ৷।

[বৃহদ্দেবতাঃ৭.১-৬]


অন্যদিকে মৎস,কূর্ম,বরাহ,বায়ু,স্কন্ধ, ভাগবত, মহাভারত ও রামায়ণ একই সুরে বলছে,


ততঃ স ভগবান্ গত্বা ভুলোকমমরাধিপঃ।

কাময়ামাস কামাৰ্ত্তো মুখ এব দিবাকরঃ।

অশ্বরূপেণ মহতা তেজসা চ সমাবৃতঃ।

সংজ্ঞা চ মনসা ক্ষোভম গমদ্ভয়বিহ্বলা ৷৷

নাসাপুটাভ্যামুৎসৃষ্টং পরো’য়মিতি শঙ্কয়া ।

তদ্ৰেতসম্ভৃতো জাতাবশ্বিনাবিতি নিশ্চিতম্ ৷৷

দত্রৌ দ্রুতত্বাৎ সঞ্জাতৌ নাসত্যৌনাসিকাগ্রতঃ।

[ মৎস্য পু. ১১.৩৪-৩৬]


এই যে এতোগুলো শাস্ত্রে তাঁদের পরিচয় দিচ্ছে। এই পরিচয়ের সারসংক্ষেপ হলো, সূর্যদেব ও সঙ্ঘার অশ্ব রুপকালে এই দুই দেবতার জন্ম হয়।পার্থক্য শুধু সংঙ্ঘা দেবীকে কোথাও সূরণ্য ডাকা হয়েছে। 

 

আমাদের সমাজে শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষ অশ্বিনী কুমার দ্বয় দেবতাকে -" আশ্বিন কুমারী" বলে জানেন। যা নিতান্তই ভুল।শুধু অন্যরা কেন পুরোহিত পণ্ডিত সমাজের অধিকাংশ লোক ও আমরা এই দুই দেবতার আসল নামই জানিনা। এই দুই দেবতার একজন হলেন  - নাসত্য, অন্যজনের নাম দস্র।

" দসৌ স্ত্রতত্বাৎ সঞ্জাতৌ নাসতৌ নাসিকাগ্রতঃ।।

[মৎস পুরান -১১/৩৬][বায়ু পুরান-৮৪/২৩-২৪]



তবে খুবই আশ্চর্যের কথা এঁরা দুজন দেবতার সন্তান হয়েও তাঁরা সমাজে যজ্ঞের ভাগ পেতনা। পেতনা সোমরস। দেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা ও ছিলোনা তাঁদের।  খোদ মহাভারতের মত গ্রন্থেই তাদের একবার শুদ্র দেবতা বলে ডাকা হয়েছে। পরবর্তী মহর্ষি চ্যাবনকেই দেখতে পাচ্ছি এই দুই দেবতাকে যজ্ঞের ভাগ ও সোমরস দিয়ে দেবত্বে প্রতিষ্ঠা করতে।

- অশ্বিনৌ তু স্মৃতৌ শূদ্রৌ তপস্যূগ্রে সমাস্থিতৌ। 

 [মহাভারত-১২.২০২.২৩]


অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে দেব বৈদ্য বা চিকিৎসক বলা হয়।

আমাদের ভারতবর্ষে প্রাচীন কাল থেকে মধ্যকাল পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ব্রাহ্মণরা বৈদ্য বা চিকিৎসা করত তাঁদের প্রচন্ডরকম সামাজিক বৈষম্যের শিকার হতেন।সমাজে তাঁদের সম্মানের চোখে দেখা হতো না। স্মৃতিশাস্ত্রে এমন ভুঁড়ি ভুঁড়ি উদাহারন দেওয়া যায় যেখানে বৈদ্য ও চিকিৎসকদের নিচু করে দেখানো হয়েছে সামাজিক ভাবে।আমরা এই সামাজিক অবহেলারই পূর্ব প্রতিরূপ খুঁজে পাই অশ্বিনীকুমার এবং চ্যবন ঋষির ঘঠনায়। যেখানে সোমযজ্ঞে ইন্দ্রের সমান মর্যাদা দেওয়া হচ্ছেনা এই দুই দেবকে।পরবর্তীতে তাঁরা পূর্ন দেবতার মর্যাদা হয়তো পেয়েছেন। বেদের ব্রাহ্মণ ভাগেও আমরা এই দুই দেবকে  চিকিৎসক হিসেবে দেখতে পাই.

-অশ্বিনৌ বৈ দেবানাং ভিষজৌ।।

[ঐতেরেয় ব্রাম্মণ-১ম খন্ড -১/১/১৮]


শুধু তাই নয়,পাঠক জেনে অবাক হবেন পৃথিবীর অনেক বড় বড় সভ্যতা যখন শুধুমাত্র লতাপাতা কিংবা তাবিজ-কবজ দিয়ে চিকিৎসা করাতো, তখন ভারতবর্ষের আর্যরা কৃত্রিম হাত পা লাগানোর চর্চ্চা করছে। অবাস্তব নয়, স্বয়ং ঋগ্বেদেই আমরা  অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে সর্বপ্রথম কৃত্রিম পা সংযোজন কারী অর্থোপেডিক্স সার্জারী চিকিৎসক হিসেবে দেখতে পাচ্ছি, যা বিশেষজ্ঞ মহলে বহুল আলোচিত।


ঋগ্বেদের সময়ে খেল নামে এক রাজা ছিলেন। তাঁর কুলপুরোহিত ছিলেন অগস্ত্য। খেলের স্ত্রীর নাম ছিল বিশপলা। কোনো সময় এক যুদ্ধকালে বিশপলার একটি পা কাটা যায়। তিনি নিজেই যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন কিনা, সেটা বোঝা যায় না। বিষ্পলার পায়ের জন্য অগস্ত্য ঋষি অশ্বিনীকুমারদের স্তুতি করেন। তারপর দেখা যায় অশ্বিনীকুমারেরা রাতের কালে এসে বিশ্বলার পা-টাকে লোহার পায়ে সংযুক্ত করে দিলেন।

-" সদ্যো জঙ্গামায়সীং বিশাপলায়ে।ধনেহিতৈ সর্তবে প্রতৈধতম্।।

[ঋগ্বেদ -১/১১৬/৫-২৪]


মহাভারত কালীন সময়েও, দুই দেবতার চেহারা  হিরন্ময় সূর্যের মতো উজ্জ্বল এব অল্পবয়সী তরুণের মতো ভীষণ সুন্দর বলে লোকে জানতো।তাই অশ্বিনীকুমারদের সৌন্দর্য্যের ব্যাপারটা ইতিহাস পুরাণেও বিখ্যাত হয়ে আছে। মহাভারতে দুই অশ্বিনীকুমারের তেজে পান্ডুর পত্নী মাদ্রীর গর্ভে নকুল-সহদেবের জন্ম হয়। এই যমজ ভাইয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল-তাঁরা অসাধারণ সুন্দর   দেখতে -রূপেণাপ্রতিমৌ ভুবি। তাঁদের জন্মের সময় আকাশবাণী হল- অসামান্য রূপ, উৎসাহ এবং শৌর্য্যাদিগুণযুক্ত এই দুটি বালক যথাসময়ে আপন রূপ এবং তেজে দুই অশ্বিনীকুমারকেও ছাড়িয়ে যাবে- রূপসত্ত্বগুণোপেতাবেতাবত্যশ্বিনাবিতি। ভাসতস্তেজসাত্যর্থং রূপদ্রবিণসম্পদা ।। 

[ মহভারত- ১.১১৮.১৭-১৯;  মৎস্য পৃ. ৪৬.১০; ৫০.৫০]


এখনো ভারতবর্ষের মায়ের এই দুই দেবতার মতো সুন্দর সন্তান কামনায় পুজো করেন। আর কামনা করেন যাতে এই দেবতাদের দ্বারাই তাঁর সন্তানেরা সব রোগ থেকে মুক্ত থাকে।


এছাড়া যদুবংশ ধ্বংস হবার কিছুদিন আগে ইন্দ্র প্রভৃতি বিশিষ্ট দেবতারা দ্বারকায় এসে কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করেন এবং কৃষ্ণকে তাঁর নশ্বর দেহ ত্যাগ করে বৈকুণ্ঠলোকে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। এই সময় অন্যান্য দেবতাদের সঙ্গে অশ্বিনীকুমাররাও কৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। 

[ভাগবত পু. ১১.৬.২]


অন্যদিকে, রাবনের সাথে দেবতাদের যুদ্ধ,বৃষপর্বা নামের দৈত্যের যুদ্ধের দিন ও আমরা এই দুই দেবতার প্রবল পরাক্রম দেখতে পাচ্ছি।  বৈদ্য  বা চিকিৎসক হলেই যে তিনি দূর্বল হবেন বা যুদ্ধ করতে পারেন না এমন ধারণা মিথ্যা করে দিয়ে এই অশ্বিনীকুমার রা সেদিন তাঁদের পরাক্রম দিয়ে সম্পূর্ণ দেব সমাজকেই অবাক করেছিলো।


কথিত আছে, সূর্য ও সঙ্ঘা শিবতেজ  সম্পন্ন সবচেয়ে সুন্দর রুপের পুত্র লাভার্থে দেবী ভগবতীর কাছে গেলে ভগবতী তাঁদের  দুইমুষ্টি তন্ডুল বা চাউল দিয়ে বলেন,আশ্বিন নবরাত্রি শেষে আশ্বিনের শেষদিনে তাঁরা যেনো এই চাউল রান্না করে কার্ত্তিকের প্রথমদিনে তাঁ ভক্ষন করে।তবেই তাঁদের মনের আশা পূর্ণ হবে।


পরবর্তীতে দেবীর কথামত এই নিয়ম পালন করলে অশ্বরুপে অশ্বিনীকুমার দ্বয়ের জন্ম হয়।এখোনো সনাতন সমাজের মায়েরা সন্তান লাভ বা সন্তানের মঙ্গল কামনায় এই ব্রত করেন।মা সন্তানের আশায় বা সন্তানের জন্য যেকোনো বর প্রার্থনা করলে শীঘ্রই তা পূরণ হয়।মায়েরা বলেন,

"আশ্বিনে রাধে কার্তিকে খায়,

যে বর মাঁগে, সে বর পায়"


অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের ধ্যান... 


- ওঁ আশ্বিনেয়ৌ মহাভাগৌ বন্ধ্যা-পুত্রবর প্রদৌ। দ্বিভুজৌ পদ্মনয়নৌ শরদিন্দু সমগ্রতৌ। সূর্য্যপুত্রৌ স্বৰ্গবৈদ্যৈ প্রমেয়ৈ কমলাননৌ । ধায়ত্তৌ নাসিকা জাতৌ রোগ-শোক নিবারকৌ।।


সজলান্ন নিবেদন মন্ত্রঃ 

"ওঁ এতানি ধাতবঃ পাত্রস্থ সজল সোপকরণ সিদ্ধান্নাণি অশ্বিনী কুমারাভ্যাং নমঃ ।।


প্রণাম - ওঁ জয়ো রবিনন্দনৈব কবস্থশ্চন্দ্র শেখর।নাসাবাভ্য মশ্বাভ্যাং স্বর্গ-বৈদ্যভাং নমোনমঃ ।। 


তথ্যসূত্রঃ

১.ঋগ্বেদ -রামকৃষ্ণ মিশন অনুবাদিত।পশ্চিমবঙ্গ।

২.ঐতৈরেয় ব্রাহ্মণ-রামকৃষ্ণমিশন অনুবাদিত।বেলুড়মঠ,পশ্চিমবঙ্গ।

৩.বৃহদ্দেবতা-অশোককুমার চট্টোপাধ্যায়। 

৪.মৎসপুরান-পঞ্চানন তর্করত্ন -নবভারত পাবলিশার্স। 

৫.বায়ু,কূর্ম,বরাহ, স্কন্দ পুরান-পঞ্চাননতর্করত্ন।

৬.মহাভারত -হরিসিদ্ধান্ত বাগীশ ভট্টাচার্য।

Friday, May 3, 2024

শিব রাম নাম করেন তাহলে শিব কি রামের থেকে ছোট?

 সম্প্রতি রামায়েতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রচুর রামায়েতের দেখা পাওয়া যাচ্ছে যারা শ্রীরাম চন্দ্রকে উপরে তুলতে গিয়ে পরমেশ্বর শিবকে ছোট করছেন। 

চলুন দেখে নেই বাস্তবে কি বলছে বৈষ্ণবদের স্বাত্তিক পুরাণ?

হ্যাঁ উনি রাম নাম করেন। তবে এর একটি কারণ রয়েছে। নারদ পুরান কি বলছে দেখুন। 

ध्याये न किंचिद्गोविंदनमस्ये ह न किंचन ।।

किंतु नास्तिकजंतूनां प्रवृत्त्यर्थमिदं मया ।। ७९-२00 ।।


दर्शनीयं हरे चैतदन्यथा पापकारिणः ।।

तस्माल्लोकोपकारार्थमिदं सर्वं कृतं मया ।। ७९-२0१ ।।


Chapter 79, verse 200-201. “O Govinda, I do not meditate on anything. I do not bow to anybody. But in order to inspire the unbelieving animal beings, (Pasu) etc. this is shown to them. O Hari, otherwise, they will remain sinners. Hence, it was to render help to the world that all these activities have been performed by me."

মানে পশুদের ( আমাদের কথা বলা হচ্ছে) মাঝে যারা অবিশ্বাসী তাদেরকে দেখানোর জন্য আমি এই কাজ করে থাকি । নাহলে এরা পাপী থেকে যাবে। মানে শিব তা ইচ্ছা করেই করেন আমাদের জন্য। 

একই কথা আবার পদ্ম পুরান বলছেঃ 


शंकर उवाच-

ध्याये न किंचिद्गोविंद न नमस्येह किंचन २४७।

नोपास्ये कंचन हरे न जपिष्येह किंचन ।

किंतु नास्तिकजंतूनां प्रवृत्त्यर्थमिदं मया २४८।

दर्शनीयं हरे ते स्युरन्यथा पापकारिणः ।

तस्माल्लोकोपकारार्थमिदं सर्वं कृतं मया २४९।

ओमित्युक्त्वा हरिरथ तं नत्वा समतिष्ठत ।

अथ ते गौतमगृहं प्राप्ता देवगणर्षयः २५०।

सर्वे पूजामथो चक्रुर्देवदेवे पिनाकिने ।

देवो हनूमता सार्द्धं गायन्नास्ते रघूत्तम २५१।

पञ्चाक्षरीं महाविद्यां सर्व एव तदा जपन् ।

हनूमत्करमालंब्य देव्यभ्याशं गतो हरः २५२।

एकशय्यासमासीनौ तावुभौ देवदंपती ।

गायन्नास्ते स हनुमांस्तुंबुरुर्नारदस्तथा २५३।

नानाविधिविलासांश्च चकार परमेश्वरः ।

आहूय पार्वतीमीश इदं वाक्यमुवाच ह २५४।


Śaṅkara said: O Viṣṇu, I am not meditating upon anyone. I am not saluting anything. O Viṣṇu, I am not waiting upon anyone. I shall not mutter any prayer here; but O Viṣṇu, I have to exhibit (like) this for leading the unbelievers to activity. Otherwise they will be sinners. Therefore, to oblige the world, I have done all this.

Padma Purana,  Section 5 - Pātāla-Khaṇḍa, 247-254



'অচিন্ত্যভেদাভেদ' পদের কতিপয় যৌক্তিক অসঙ্গতি বিংশ শতাব্দীর অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি পর্যালোচনা

  ভূমিকা গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের কেন্দ্রীয় মতবাদ হলো 'অচিন্ত্যভেদাভেদ'। শ্রীচৈতন্যের ভাবধারা থেকে উদ্ভূত এই দার্শনিক অবস্থানটি ঈশ্...

Popular Posts