Wednesday, November 9, 2022

বিভিন্ন দেশের পৌরাণিক কিছু অদ্ভুত প্রাণী

 আমাদের ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত প্রাণী দিয়েই শুরু করা যাক

কামধেনু

সমুদ্রমন্থনজাত কামধেনুর কথা আমরা প্রত্যেকেই জানি। মনের কাঙ্খিত সকল বস্তু দিতে সক্ষম, বহু দিব্য ক্ষমতা সম্পন্ন এই কামধেনু। পুরাণ মতে গরু-মহিষের মত সকল দ্বিক্ষুর জাতীয় প্রাণী কামধেনুর সন্তান।

ঐরাবত

সমুদ্রমন্থন থেকে উত্থিত বিশালাকায়, প্রচন্ড শক্তিশালী, সাতশুড় যুক্ত, দিব্য সাদাহাতি হলো ঐরাবত। পুরানমতে ঐরাবত দেবরাজ ইন্দ্রের বাহন।

ইচ্ছাধারী নাগ

পুরাণ এবং বিভিন্ন উপকথায় ইচ্ছাধারী নাগ-নাগিনের ছড়াছড়ি। আমরা সবাই এদের সম্বন্ধে জানি তাই আর গভীরে গেলাম না।

গরুড়

গরুড় সম্বন্ধেও আমরা সবাই জানি, মানুষ এবং ঈগলের মিশ্রিত বিশালাকায় প্রাণী গরুড়। পুরাণ মতে গরুড় পক্ষীরাজ, পাখিদের দেবতা, বিষ্ণুবাহন এবং ব্রহ্মাণ্ডের সবথেকে শক্তিশালী জীব।

শরভ

শরভ পুরাণে উল্লিখিত এক অতি অদ্ভুত জীব। যার দেহ সিংহের, সিংহের ঘাড়ের ওপর কোমর পর্যন্ত মানুষের দেহ, সেই মানুষের ঘাড়ে সিংহের মাথা কিন্তু তার ঠোঁটে ঈগলের চঞ্চু এবং মাথায় হরিণের শিং। তার দুটি বিশাল ডানা, সুদীর্ঘ লেজ এবং আটটি পা।

ভগবান বিষ্ণু যখন নৃসিংহ রূপে ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠেন তখন মহাদেব এই শরভ রূপ নিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করেন।

গন্দভেরুণ্ড

পুরাণে উল্লিখিত দুই মুখযুক্ত বিশালাকায় পক্ষী, তার আকার এতটাই বড় যে একটি হাতিও তার কাছে খেলনার মতো।

কাহিনী অনুসারে মহাদেব যখন শরভ রূপে ভগবান নৃসিংহ কে পরাজিত করেন তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে গন্দভেরুণ্ড রূপে অবতীর্ণ হয়ে মহাদেবের শরভ রূপকে পরাজিত করেন।

মকর

মকর পুরাণে উল্লিখিত একটি প্রাণী যার দেহ মাছের কিন্তু মাথা হাতির মতো। পুরাণ মতে এই মকর মা গঙ্গার বাহন।

কবন্ধ

কবন্ধ রামায়ণে উল্লিখিত একটি রাক্ষস। তার মাথা এবং দুটি পা শরীরে ভেতর ঢোকানো। তার পেটে তীক্ষ্ম দাঁতযুক্ত মুখ এবং একটি বিশাল চোখ ছিলো, তার দুই হাত একশ যোজন লম্বা ছিলো। পা শরীরের ভেতর ঢুকে যাওয়ার কারণে সে চলতে পারতো না, কিন্তু তার হাত দুটো বিশাল হওয়ার কারণে তা দিয়ে বহুদুরের থেকেও শিকার ধরে আনতে পারতো।

রামায়ণের অরন্যকাণ্ডে এর উল্লেখ পাওয়া যায়, রাম এবং লক্ষণ যখন দেবী সীতার খোঁজ করছিলেন কবন্ধ তখন তাদের দুজনকে দুহাতে ধরে নেয় যার ফলে লক্ষণ তার হাত দুটো কেটে দেয়।

নবগুঞ্জরা

ওড়িয়া মহাভারতে উল্লিখিত 'ন রকম' প্রাণীর মিশ্রণ এই নবগুঞ্জরা। তার তিনটি পায়ের মধ্যে একটি হাতি, একটি ঘোড়া এবং একটি বাঘের পা, কিন্তু তার চতুর্থ পায়ের জায়গায় মানুষের হাত। তার ষাড়ের পিঠ, সিংহের কোমর, ময়ুরের গলা, মোরগের মাথা এবং তার লেজ একটি সাপ।

মহাভারত মতে একবার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই রূপে অর্জুনকে দর্শন দেন।



ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত জীবের বর্ণনা অনেক হলো এবার অন্যান্য পৌরাণিক জীবের সম্বন্ধে জানা যাক

মাইনটর

গ্রীক পুরাণে উল্লিখিত বিশাল প্রাণী যে মানুষ এবং ষাড়ের মিশ্রণ। এটি অত্যন্ত রগচটা প্রাণী বলে মনে করা হয়।

সেন্টর

সেন্টর গ্রীক পুরাণে উল্লিখিত খুবই জনপ্রিয় একটি জীব যার উপরিভাগ মানুষ এবং দেহের নিচের অংশ ঘোড়ার। গ্রীক পুরাণ মতে এরা সামাজিক প্রাণী হয় এবং গভীর বনে থাকে।

ড্রাগন

ড্রাগন বিভিন্ন পুরাণ এবং উপকথায় উল্লিখিত অত্যন্ত শক্তশালী প্রাণী যা আমাদের প্রত্যেকেরই পরিচিত। ইউরোপ, আফ্রিকা, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন গল্পে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ড্রাগনের বেশ কিছু প্রজাতি আছে, যেমন -

Wyvern

Qilin

Mushussu

তবে আমাদের সবথেকে পরিচিত দুটি ড্রাগন হলো

ইউরোপীয় ড্রাগন

চাইনিজ/জাপানিজ ড্রাগন

ব্যাসিলাস্ক

গ্রীক পুরাণ মতে ব্যসিলাস্ক হলো সাপেদের রাজা। এর জন্ম কাহিনী বেশ অদ্ভুত, কোনো মোরগ যদি সাপের ডিমে তা দেয় তবে এর জন্ম হয়। একে দেখতেও সাপ আর মোরগের মিশ্রণ, এর দেহ মোরগের কিন্তু লেজ ও জিভ সাপের। এবার এর গলাও কিছুটা সাপের মতো। বলা হয় যে এর চোখে চোখ রাখা মাত্রই যে কোনো প্রাণী পাথর হয়ে যায়।

কোনো কোনো মতে এটিও ড্রাগনের একটি প্রজাতি।

ক্র্যাকেন

সমুদ্রগর্ভে বসবাসকারী এক বিশাল হিংস্র দানব এই ক্র্যকেন। এর সঠিক বিবরণ কোথাও ঠিক করে দেওয়া হয়নি, তবে বলা হয় যে এটি এতটাই বিশাল, যে একটি জাহাজ নাকি এর সামনে খেলনার মতো। এর শরীরে অক্টোপাসের মতো অনেকগুলি হাত আছে। ১৮ শতকে অনেকে একে দেখার দাবিও করে। বলা হয় মাছ ধরার সময় হঠাৎ করে যদি জালে বেশী বেশী মাছ উঠতে শুরু করে তাহলে তাদের সেই মুহূর্তে পারে ফিরে আসা উচিত, কারন সেই মাছগুলি নাকি ক্র্যাকেনের ভয়েই দলে দলে সেদিকে পালিয়ে আসছে।

স্ফিংস

স্ফিংস মিশরের পৌরাণিক জীব, যার সিংহের দেহের ওপর নারী মস্তক এবং দুটি বিশাল ডানা। এটি শক্তি এবং বুদ্ধিমত্তার প্রতীক, পিরামিডের পাশাপাশি এর বহু মুর্তি দেখা যায়।

কাহিনী অনুযায়ী স্ফিংস মরুভূমিতে যাতায়াতকারী সকলকে দাড় করিয়ে একটি ধাঁধা জিজ্ঞাসা করে, আর তার তার উত্তর না পারলে সে সেই মানুষকে মেরে ফেলে। কিন্তু সে যদি উত্তর দিতে পারে তাহলে স্ফিংস নিজেই আত্মহত্যা করে নেয়।

বুরাক

ইসলামিক উপকথায় বর্ণিত একপ্রকার অদ্ভুত জীব যার দেহ গাধার কিন্তু মাথা এক নারীর। ইসলামীক কাহিনী অনুসারে মহম্মদ এই বুরাকের পিঠে চড়ে সাত আসমান পাড় করে আল্লাহর সিংহাসন অবধি পৌঁছেছিলেন।

কাপ্পা

কাপ্পা জাপানের উপকথায় বর্ণিত খুব হিংস্র প্রাণী, যার শরীর ব্যাঙের মত, চঞ্চু ও লিপ্তপদ হাঁসের মত এবং এর পিঠে কচ্ছপের মতো খাল। বলা হয় এরা জলে থাকতো এবং রাতের অন্ধকারে মানুষের ওপর আক্রমণ করতো। আর এরা নাকি বাচ্চাদের ওপরেই আক্রমণ বেশি করতো।

ফন

ফন রোমান পৌরাণিক কাহিনীর উল্লিখিত প্রাণী যার দেহের ওপরিভাগ মানুষের মতো আর কোমরের নিচের অংশ ছাগলের মত।

ম্যান্টিকোর

ম্যান্টিকোর গ্রীক পুরাণের এক অত্যন্ত হিংস্র, বিপজ্জনক, আক্রমণাত্মক পশু, যার দেহ সিংহের, মাথা মানুষের এবং লেজ একটি বিছের।

সাইনোসেফালি

মিশরীয় পুরাণে উল্লিখিত হিংস্র এবং মাংসাশী জীব যার মানুষের দেহ এবং কুকুর/শেয়ালের মাথা। বহু মিশরীয় চিত্রকলায় এর ছবি দেখা যায়।

মোনোপদ

মোনোপদ গ্রীক এবং রোমান পৌরাণিক কাহিনীতে বর্ণিত বামনাকৃতি মানব যাদের একটি মাত্র পা ছিলো। কিন্তু এদের সেই একটি পা এতটাই বড়ো যে দুপুরের কড়া রোদে সেটাকে তারা ছাতার মতো ব্যবহার করতো।


এছাড়াও আরও কিছু পৌরাণিক প্রাণী পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতায় দেখা যায় যেমনঃ 


  • নরওয়ে দেশের পুরাণে জরমুংগ্যান্ড নামে এক বিশালাকার সাপের কথা বলা আছে। সে নাকি সমুদ্রে থাকে, আর মাঝে মাঝেই সাঁতার কেটে পৃথিবীর শেষপ্রান্তে তীরে গিয়ে ওঠে। সেখানে সে লড়াই করে দেবতাদের সাথে।
  • মধ্যপ্রাচ্যের পুরাণকথায় প্রথম 'গ্রাইফোনের 'উল্লেখ পাওয়া যায়। গ্রাইফোন হল সিংহ আর ঈগল পাখির মিলিত রূপ।
  • বাইবেল আর গ্রিক উপকথায় পাওয়া যায় 'ককাট্রিসে' -কে। এ এক অদ্ভুত প্রাণী — সাপের শরীর অথচ তাতে মুরগির পাখা আর ড্রাগনের লেজ।
  • 'মেডুসা দ্য গর্গন ' হল গ্রিক পুরাণের এক দানবী। তার মাথায় থাকে অজস্র সাপ। কেউ তার মুখের দিকে তাকালেই পাথর হয়ে যেত!!
  • 'ফিনিক্স ' পাখির নাম মোটামুটি আমাদের সবারই জানা। এই ফিনিক্স পাখি নিজের শরীরে আগুন দিয়ে মারা যায়। পরে সেই ছাই থেকে জন্ম নেয় আবার।
  • 'ইউনিকর্ন '- কে আমরা অনেক হলিউড ও বলিউড মুভিতে দেখতে পাই। এদের বিশেষত্ব হলো শরীরটা ঘোড়ার মতো, কিন্তু মাথায় একটা পাকানো শিং আছে।
  • 'বুনিপ' — কি কিছু মনে পড়ল? 'চাঁদের পাহাড় ' উপন্যাসের সেই ভয়ংকর জীবটির নামই ছিল বুনিপ। অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের লোককথায় আছে জলাভূমির দানব বুনিপের কথা।
  • গ্রিক পুরাণে উল্লেখ আছে তিন মাথাওয়ালা দানব 'সারবেরাস'-এর কথা। বীর হেরাক্লিস এদের টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিলেন ইউরিসথিয়াসের রাজদরবারে। আর তারপর তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়ছিলেন পাতালপুরীতে।
  • গ্রিক পুরাণে আরও এক দানবের কথা পাওয়া যায়। এর মাথাটা সিংহের, লেজটা সাপের আর শরীরটা ছাগলের।আর এই দানবের নাম 'কিমিরা'।
  • 'মৎস্যকন্যা'-শব্দটি শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে সুন্দরী মেয়ে যার অর্ধেক শরীর মানুষের মতো আর বাকি অর্ধেকটা মাছের মতো। পুরাকাল থেকে মানুষজনের ধারণা, যদি কেউ মৎস্যকন্যার চিরুনি খুঁজে পায় তাহলে তার যেকোনো একটি ইচ্ছে পূরণ হয়।
  • সবশেষে আমাদের বাংলার রূপকথার কথা না বললেই চলে না। রূপকথার গল্পে সমৃদ্ধ আমাদের বাংলা ভাষাতেও রয়েছে ব্যাঙ্গমাব্যাঙ্গমীর মতো আজব পাখি আর পক্ষীরাজ ঘোড়ার গল্প। যা গ্রীক মাইথলজিতে Pegasus নামে পরিচিত।  


Saturday, October 15, 2022

কৃষ্ণ কি শুধুই বর লাভের জন্য শিব উপাসনা করেছেন? শিব কৃষ্ণে কি ভেদ আছে? কি বলেন স্বয়ং দ্বারকানাথ?

 নমঃ শিবায়

নমস্কার 

সনাতনী সকল ভ্রাতা ভগ্নিরদের নিকট অধমের প্রনাম ও ভালবাসা।

  বস্তুত এইসব ব্লগ দ্বৈতবাদী কৃৈষ্ণব সম্প্রদায়ের জন্য। যারা শিব কৃষ্ণে ভেদ করেন না, এদের জন্য না। 

দীর্ঘদিন অনলাইনের কল্যানে প্রায় সকল সচেতন মহল জানেন যে ভগবান কৃষ্ণ শিব উপাসনা করেছেন। মহাভারত এবং শিব মহাপুরাণের বায়বীয় সংহিতা এর বড় প্রমাণ (বিস্তারিত)। তাছাড়া হরিবংশতেও এর হাল্কা উল্লেখ রয়েছে। তবে অনেক ইস্কন সহ উগ্র দ্বৈতবাদী কৃষ্ণভক্তের দাবী উনি (শ্রীকৃষ্ণ) শুধু বর লাভের নিমিত্তেই শিব উপাসনা করেছেন বাস্তবে পরমেশ্বর শিব নাকি উল্টো পরম বৈষ্ণব ( বিস্তারিত) । যদিও এইসব দাবী বহু আগেই শৈবরা খন্ডন করেছেন এবং আগম শাস্ত্রের দ্বারাও এর প্রামাণিকতা পাওয়া যায় যে বাস্তবে পরমেশ্বর শিব কারো উপাসনা করেন না বরং নারায়ন সহ শ্রীকৃষ্ণ সবাই শিব অনুগ্রহ লাভ করেছেন বার বার। এমনকি শ্রীবিষ্ণুর ১০ অবতারকেও বার বার বধ করে পরমেশ্বর শিব নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করেছেন। শিব নারায়ণপ্রকৃতি আর পুরুষ স্বরুপ। এখানে পুরুষ হলেন শিব আর প্রকৃতি হলেন নারায়ণ। শুধু এই একটাই দাবী যা এরা শাক ঢাকতে ব্যাবহার করে। কিন্তু শাস্ত্র প্রমাণ এতই রবির ন্যায় জাজ্বল্যমান যে সেই রূপালি রঙ বের হয়েই যায়। 

আসুন আজ কূর্ম পুরাণ ( যা একদম স্বাত্তিক পুরাণ) থেকে দেখে নেই কৃষ্ণের নিজের মুখের কথা। 




বিস্তারিত বইয়ের লিঙ্ক

 তৎপরে দেবতা, খষি ও পিতৃগণের তর্পণ সমাধান করিলেন এবং মার্কেন্ডেয়ের সহিত দেবভবনে প্রাবেশ করিয়া লিঙ্গস্থ ভূতি- ভূষণ ভূতনাথের পৃজা করিলেন। হে বিপেন্দ্রসকল! অনস্তর সকল মনুষ্যের নিয়ন্তা সেই হরি আপনার সমস্ত নিয়ম সমাপন করিয়া ব্রাহ্মণদিগের পুজা করিলেন এবং মহর্ষ মার্কেন্ডেয়কে ভোজন করাইয়া, আত্মযোগ সমাপনপূর্ব্বক পুত্রাদিদ্বারা পরিবৃত হইয়া, মহর্ষি মার্কেন্ডেয়ের সহিত পৌরাণিকী পবিত্র কথা কহিতে আগন্ত করিলেন। অনন্তর মহামুনি মারকেন্ডেয় এই সমস্ত দেখিয়া হাসিতে কসিতে মধুর বাক্যে শ্রীকৃষ্ণকে বলিতে আরম্ভ  ক'রলেন। ৪২--৫১। 

মার্কেন্ডেয় কহিলেন-যাবতীয় লোকে কর্ম্মদ্ধারা আপনারই পূজা করিয়া থাকে এবং যোগিগণ আপনারই ধ্যান করে, কিন্তু আপনি পুণ্যকর্ম্মদ্বারা কোন দেবতার আরাধনা করিতেছেন, তাহা আমাকে বলুন। আপনিই সেই পরমব্রহ্ম ও নির্ব্বাণস্বরূপ অমলপদ, আপনিই ভারাবতরণ্রে নিমত্ত বৃষ্ণিকুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। ব্রহ্মবিদ্বর মগাবাহু কৃষ্ণ শ্রবণসমুৎসুক পুত্রগণের সমক্ষেই হাসিতে হাসিতে তাহাকে বলিতে লাগিলেন,আপনি যাহা! যাহা বলিলেন, সে সমস্তই সত্য, সন্দেহ নাই; তথাপি আমি সন|তন মহেশ্বরের পূজা করিতেছি। হে বিপ্র! আমার কিছুই কর্তব্য নাই, এবং আমার প্রার্থয়িতব্য কিছুই নাই; তথাপি সমস্ত জানিয়াও আমি. পরম শিব মহেশ্বরেরই পূজা করিতেছি। লোকে কামমোহিত হইয়া মোহুবশতঃ সেই দেবাদিদেবকে দেখিতে পায় না, সেই হেতু মহদেবই আত্মার মূল, ইহ! জানাইবার নিমিত্তেই আমি তাহার পুজা কারতেছি। শিবলিঙ্গ পূজা করা অপেক্ষা লোকমধ্যে আর পূণ্যকর নাই এবং দূর্গতি-খন্ডনেরও অপর কোন, উপায় নাই ; অতএব এই সমস্ত লোকের হিতের জন্য লিঙ্গে শিবের পূজা করিবে। বেদতত্বজ্ঞ পণ্ডিতেরা আমাকেই সেই শিবলিঙ্গ বলিয়া থাকেন, অতএব আমিই স্বয়ং আপনাতে মহাদেবের পূজা করিতেছি। আমিই সেই শিবের পরমা মুর্তি এবং আমিই শিবময়, আমাদের উভয়ের মধ্যে কোন প্রভেদ নাই, বেদে ইহাই নিশ্চিত হইয়াছে । অতএব সংসারভীরু লোকেরা সর্ব্বদাই লিঙ্গে সেই দেবদেব মহেশ্বরের ধ্যান, পুজা ও বন্দনা করিবে। ৫২--৬১। 

মার্কেন্ডেয় বলিলেন, হে সুরশ্রেষ্ঠ বিশলাক্ষ কৃষ্ণ সেই লিঙ্গ কি পদার্থ এবং লিঙ্গে কাহারই বা পুজা করিতে হয়? এই গভীর ও উৎকৃষ্ট বিষয়টী আমাকে বলিয়া। দিন। ভগবান কহিলেন, লিঙ্গ, অব্যক্ত আনন্দস্বরূপ জ্যতির্ম্ময় এবং অক্ষর? বেদে মহেশ্বরই অব্যয় ও লিঙ্গরূপী দেবতা বলিয়া কথিত হইয়াছেন। পূর্ববকালে ঘোর একার্ণব সময়ে স্থাবর-জঙ্গম বিলুপ্ত হইলে পর, ব্রহ্মার এবং আমার প্রবোধের নিমিত্ত মহাশিব প্রাদূর্ভূত হইয়াছিলেন। সেই অবধি ব্রহ্মা এবং আমি সমস্ত লোকের হিতের নিমিত্ত সর্বদাই মহাদেবের পূজা করিয়া থাকি। মার্কেন্ডেয় কহিলেন। হে কৃষ্ণ! পূর্ব্বে আপনাদের প্রবোধের জন্য কি প্রকারে পরমপদ ঐশ্বর লিঙ্গ উৎপন্ন হইয়াছিল, তাহাই এক্ষণে বলুন। ভগবান কহিলেন,_পূর্ব্বে যখন ঘোর অবিভক্ত তমোময় একার্ণব ছিল, তখন আমি সেই একার্ণবের মধ্যে শঙ্খ-চক্র-গদাধারী, সহস্রশীর্ষা, সহস্রাক্ষ সহস্রচরণ, সহস্রবাহু, সনাতন পুরুষ হইয়া শয়ন করিয়া ছিলাম। এমন সময়ে দূরে অমিততেজাঃ কোটিসূর্য্যপ্রতিকাশ, সৌন্দর্য সম্পন্ন, দীপ্তিবিশিষ্ট, চতূর্ব্বক্ত্র, মহাযোগী জগতের কারণ, কৃষ্ণাজিনধর, খক্‌ যজুঃ সাম মন্ত্র দ্বারা অতিষ্টুত ও বিভু আদিপুরুষকে দেখিতে পাইলাম । ৬২--৭০। 


প্রিয় ভ্রাতা ভগ্নিরা। এখানে লাল কালি দিয়ে হাইলাইট করা অংশটি দেখুন। ভগবান কৃষ্ণ শিবা উপাসনাকে নিজের উপাসনার সাথে তুলনা করেছেন। শিব কৃষ্ণে কোন ভেদ নেই। যেখানে সাক্ষাৎ ভগবান বলছেন উনি শিবময় এবং উনাতে আর শিবে ভেদ নাই। সেখানে দ্বৈতবাদী কৃৈষ্ণবগণ কোন সাহসে উনাদের আরাধ্যের বাক্য অপমান করে ভেদাভেদ করেন? পাশাপাশি ইদানিং কিছু উগ্র শৈবরাও শিব কৃষ্ণে ভেদ করে মহাপাপী হচ্ছেন। এদের জন্য করুনা হয়। এরা চোখ থাকতেও অন্ধ, জ্ঞান থাকতেও অজ্ঞানী। 

শাস্ত্র প্রমাণের মাধ্যমে সিদ্ধ হল শিব এবং কৃষ্ণ এরা অভেদ। ভগবান আর ভক্তে ভেদ নেই। আবার ভক্ত আর ভগবানেও ভেদ নেই। 

শিব শিব 

নমঃ শিবায়। 

    `    

Wednesday, October 5, 2022

হিন্দু ধর্মের যাবতীয় সকল বিশ্বরূপ

 শ্রী কৃষ্ণতো শুধুমাত্র একবার  যোগযুক্ত অবস্থায় অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন আর তাতেই বৈষ্ণবরা কৃষ্ণকে ঈশ্বর মনে করেন।  নিচে লক্ষ করুন বিষ্ণুর মায়াবসত কারনে দধীচি মুনিও বিষ্ণুকে  বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন।যারা শুধু কৃষ্ণকেই পরমেশ্বর ভাবেন এই পোস্ট তাদের জন্য।

মহাকাব্য মহাভারত বা ভাঃগীতা অনুসারে শ্রীকৃষ্ণ বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন এটা আমরা সবাই জানি। বাস্তবে বিশ্বরূপে স্রষ্টার পরমতত্ত্বকে অনুধাবণ করার জন্য উত্তরদাতা প্রশ্নকর্তাকে দেখিয়ে থাকেন। এখানে প্রশ্ন কর্তা সহজেই সেই পরম তত্ত্বের বিশালত্ব উপলব্ধি করতে পারেন। তাই উত্তরদাতা কোনভাবেই শুধুমাত্র একাই ব্রহ্ম হয়ে যান না। ইস্কন সহ অনেক বিভেদকামী সংঘটন আজকাল বিশ্বরূপ নিয়ে বড়াই করে হিন্দু সমাজে বিভেদ এনে আমাদের বিভক্ত করে নিজেদের পকেট ভারী করছে। বলা বাহুল্য শুধু শ্রীকৃষ্ণ বিশ্বরূপ দেখান নাই আরও অনেকেই দেখিয়েছেন। নিম্নের এর কিছু তুলে ধরা হল। 

 

>> দক্ষের কন্যা সতী জন্মের পরেই দক্ষকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেনঃ

(কূর্মপুরাণ, পূর্বভাগঃ ১২/৫২-৫৩,৫৮)

>> বৃহৎ সংহিতায় ইন্দ্রের বিশ্বরূপের বর্ণনা করা হয়েছেঃ(বৃহৎ সংহিতাঃ ৪৩/৫৪-৫৫)

>> গণেশ রাজা বরেণ্যকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেনঃ

(গণেশ গীতাঃ ৮/৬-৭)

>> ব্রহ্মা চন্ডিকে স্তুতি করে বলছেনঃ

-হে দেবী, তুমিই সবকিছু ধারণ কর, তুমি জগৎ সৃষ্টি কর, তুমিই পালন কর, তুমিই প্রলকালে গ্রাস কর।

(চণ্ডীঃ ১/৬৮-৬৯)

- এই জগতে আমি একাই, আমি ছাড়া আর দ্বিতীয় কে আছে? এই দুষ্ট দেখো- আমার বিভূতি আমাতেই প্রবেশ করছে।

(চণ্ডী - ১০/৮)

>>বরাহ পুরাণে শিবের বিশ্বরূপ প্রদর্শিত হয়েছেঃ

- শিব এখানে প্রোদেশ প্রমাণমাত্র হয়েও শতশীর্ষ, শত উদর বিশিষ্, সহস্র বাহু, সহস্র পদ, সহস্র চক্ষু, সহস্র মস্তক ও সহস্র মুখ সমন্বিত। অণু থেকে ক্ষুদ্র হয়েও সর্ববৃহৎ।

(বরাহ পুরাণ - ১/৯/৬৮)

>> বায়ু পুরাণেও শিবের বিশ্বমূর্তি বর্ণিত হয়েছেঃ

- শিবের উৎপত্তি অব্যাক্ত, তার দেহ ব্যাক্ত অর্থাৎ প্রকাশিত। তার দেহের অন্তর্গতসমূহ কাল। অগ্নি তাঁর মুখ, চন্দ্র ও সূর্য তার নেত্রদ্বয়, দিকসমূহ তাঁর কর্ণ, বায়ু তার ঘ্রাণ, বেদ তার বাক্য, অন্তরীক্ষ শরীর, পৃথিবী পদদ্বয়, তারকাগণ রোমকূপ।

(বায়ু পুরাণঃ ১/৯/৬৮)

>> বামন পূরাণেও শিবের বিশ্বরূপ পাওয়া যায়ঃ

- তুমিই বিষ্ণু, তুমিই ব্রহ্মা, তুমিই মৃত্যু, তুমিই বরদ, তুমি সূর্য ও চন্দ্র, তুমি ভূমি, তুমি জল, তুমি যজ্ঞ, নিয়ম, তুমি অতীত, ভবিষ্যৎ, তুমি আদি ও অন্ত, তুমি সূক্ষ্ম ও স্থুল, তুমিই (বিরাট) পুরুষ।

(বামন পুরাণঃ ৫৪/৯৬-৯৯)

>> পদ্মপুরাণে ব্রহ্মার বিশ্বরূপের বর্ণনাঃ

- হে বিভু, আমি দেখছি তোমার অনেক মুখ, তুমি যজ্ঞের গতি, তুমি পুরাণ পুরুষ, তুমি ব্রহ্মা, ঈশ, জগৎসমূহের সৃষ্টিকর্তা। প্রপিতামহ, তোমাকে নমস্কার।

(পদ্মপুরাণ সৃষ্টি খণ্ডঃ ৩৪/১০০)





>> গণেশ গীতাতে গণেশকে ব্রহ্মস্বরূপ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। গণেশ নিজের স্বরূপ বর্ণনা করছেন এভাবে:

- হে রাজন। শিব, বিষ্ণু, শক্তি এবং সূর্যে যে ভেদবুদ্ধি সে আমারই সৃষ্টি, যেহেতু আমিই জগৎ সৃষ্টি করি, হে প্রিয়। আমিই মহা বিষ্ণু, আমিই সদাশিব, আমিই মহাশক্তি, আমিই অর্যমা।

(গণেশ গীতাঃ ১/২০-২২)

>> মহাভারতের মার্কেণ্ডেয়-কৃত কার্তিকেয় স্তবে কার্তিকেয়ে বিশ্বমূর্তিরূপে বন্দিত হয়েছেনঃ

- তুমি পদ্মপলাশলোচন, তুমি অরবিন্দতুল্যমুখ-বিশিষ্ট, তোমার সহস্র বদন,সহস্র বাহু, তুমি লোকপাল, শ্রেষ্ঠ হরি, সকল দেব ও অসুরগণের আবাধ্য।

(মহাভাঃ বনপর্বঃ ২৩১, অঃ৪৩)

>> লিঙ্গপুরাণ পূর্বভাগের ৩৬ তম অধ্যায়ে এরকম বর্ননা এসেছে। শ্রীবিষ্ণু ব্রাহ্মণবেশে দধীচি মুনির নিকট এসে বললেন - আমি আপনার নিকট বর প্রার্থনা করি আমাকে বর প্রদান করুন। দধীচি মুনি বললেন রুদ্রদেবের অনুগ্রহে ভূত ভবিষ্যত আমি জানি। আপনাকে আমি চিনিতে পারিয়াছি আপনি স্বরূপে ফিরে আসুন। আপনি কৃপা করে বলুন শিব আরাধনা পরায়ন ব্যক্তির কোন ভীতি থাকে? আমি কাহারও সমীপে ভয় পাই না। তখন বিষ্ণু ছদ্মবেশ ত্যাগ করে বললেন - হে বিপ্র আমি জানি তুমি কাহারো নিকট ভয় পাও না তবুও তুমি সভামধ্যে ক্ষুপভূপতিকে বলো আমি ভয় পাইতেছি। তখন মহামুনি বললেন আমি ভয় পাই না। তখন বিষ্ণু ক্ষুব্ধ হইয়া মহামুনিকে চক্র উত্তোলন করে মারতে উদ্যত হলেন। তখন মুনির সহিত ভয়ানক যুদ্ধ বাধলো। অতপর বিষ্ণু মুনির বিস্ময় সাধনার্থে বিশ্বমূর্তি ধারন করলেনঃ

- অনন্তর হরি মুনির বিস্ময় সাধনার্থে বিশ্বমূর্তি ধারন করলেন। মুনিবর ভগবান দধিচী নারায়ন শরীর মধ্যে পৃথক পৃথক দেবতা, কোটি কোটি রুদ্র এবং কোটি কোটি ব্রহ্মান্ড অবলোকন করলেন।

(৫৮;৫৯)

অতঃপর দধীচি মুনি মুনি বললেন -

- হে মহাবাহো! বিচারপূর্বক প্রতিভা দ্বারা মায়া ত্যাগ করুন, হে মাধব! বিজ্ঞানসহস্র নিতান্ত দূর্বিজ্ঞেয়। হে অনিন্দিত! আমি তোমাকে দিব্যদৃষ্টি দান করিতেছি, তুমি আমার শরীর মধ্যে তোমা সহ সমস্ত জগৎ ব্রহ্মা, রুদ্র এই সকল অবলোকন করো। (৬২;৬৩)

শ্লোকগুলোতে দধীচি মুনি বিশ্বরূপ কে মায়ার সাথে তুলোনা করেছেন এমনকি তিনি নিজেও বিষ্ণুকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন। অতঃএব বিশ্বরূপ প্রদর্শন একজন মুনির পক্ষেও সম্ভব।

পুরাণ সমূহে বিশ্বরূপের এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে।

Thursday, September 22, 2022

গণেশ কি পরম বৈষ্ণব? গণেশ কি বৈদিক?


গণেশ, শিবগণের মুখ্য, তাদের নায়ক.. গণনায়ক; তিনি কি বৈষ্ণব হবেন? স্বয়ং পরমেশ্বর শিব যিনি নিজেই বৈষ্ণব নন বরং নারায়ন উনার ভজনা করেন সেই পরম প্রভুর গণনায়ক কিভাবে বৈষ্ণব হতে পারেন??  তিনি বিঘ্নেশ, বিঘ্নকর্তা; আবার একইসঙ্গে তিনি সিদ্ধিদাতা। যিনি সিদ্ধি দান করেন তিনি বিঘ্নের কর্তা বা বিঘ্ন দান করেন কীভাবে? আসুন আলোচনা করি। 

তিনি কেন গজানন? 

প্রথমেই বাঙালী পাঠক ভ্রূ তুলে বলবেন, "শনি, শনি; শনির নজরেই তো উমার ছেলের অত সুন্দর মুখটা গলা থেকে খসে পড়ল। আহা গো!" 

বাঙালী মানসে ব্রহ্মবৈবর্তের প্রভাব অনস্বীকার্য ও সুদূরপ্রসারী। সেই ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণেই আছে শনির দৃষ্টির জন্য গণেশ গজমুণ্ডধারী। 

ছোটবেলায় এটাই আমিও জানতাম। তারপর ধীরে ধীরে পৌরাণিক সিরিয়ালের বাড়বাড়ন্তের আমলে শিবপুরাণের তথ্যটি সামনে এল। 

উমা নিজের গাত্রমল দিয়ে এক শিশুকে সৃজন করেছেন। নিযুক্ত করেছেন দ্বারপালরূপে। শিব উপস্থিত হয়েছেন উমাভবনের দ্বারে। বিনায়ক কিছুতেই তাকে প্রবেশ করতে দেবেন না। অবশেষে শিবের ত্রিশূলের আঘাতেই তিনি মুণ্ডহীন হলেন যদিও পরে গজানন রূপে আত্মপ্রকাশ করলেন। 

শিবপুরাণ অনুসারে, দেবী পার্বতী কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থী তিথিতে বিনায়ককে সৃজন করেছিলেন। 

তবে এই দুই কাহিনির পরেও রয়ে যায় কিছু অতিরিক্ত; যা নিয়ে সকলে চর্চা করেন, যে কাহিনি সকলের জানা তা চর্বিতচর্বণে আমি আগ্রহী নই কোনওকালেই। গণেশ কেন গজানন এই বিষয় নিয়েও আজকের দিনে আলোচনা করতাম না কিন্তু আমি নিশ্চিত গণেশের গজানন হওয়ার যে কাহিনিটি লিখতে চলেছি, তা অধিক আলোচিত নয়। 

গণেশের জন্য কোনও ভিন্ন পুরাণ নেই। তবে গণেশ পুরাণ নামে একটি উপপুরাণ পাওয়া যায়। উমাত্মজ গণেশের সন্ধান পাই তাই শৈব পুরাণের পাতাতেই। 

স্কন্দপুরাণের মাহেশ্বর খণ্ডে গণেশের জন্মকথা বিবৃত হয়েছে। 

তারকাসুর দেবতাদের স্বর্গচ্যূত করেছেন; দেবতারা মরিয়া হয়ে হর পার্বতীর বিয়ে দেবার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারপর বিস্তর কাঠখড় এবং আস্ত কামদেবকে পুড়িয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন হৈমবতী ও শঙ্কর। মন্দারপর্বতের রত্নময় প্রাসাদে বাস করা কালীন পার্বতী নিজের গাত্রমল থেকে এক গজমুখ মনুষ্যমূর্তি নির্মাণ করলেন। 

এতস্মিন্তরে দেবী প্রোদ্বর্ত্তয়তি গাত্রকম্।। 

উদ্বর্ত্তনমলেনাথ নরং চক্রে গজাননম্। 

দেবানাং সংস্তবৈঃ পুণ্যৈঃ কৃপয়াভিপরিপ্লুতা।। 

পুত্রেত্যুবাচ তং দেবী ততঃ সংহৃষ্টমানসা। 

দেবতাদের পুণ্য স্তুতি শুনে আপ্লুত হয়ে দেবী হৃষ্টচিত্তে তাকেই পুত্র বলে সম্বোধন করলেন ও আদর করতে শুরু করলেন। 

অর্থাৎ মাহেশ্বরখণ্ডের অন্তর্গত কুমারিকা খণ্ডমের এই অংশ অনুসারে গণেশ গজমুণ্ড নিয়েই আবির্ভূত হয়েছিলেন; তার মস্তক কর্তিতই হয়নি কখনও। 

এবারে ফিরি সেই প্রথম কথায়, বিঘ্নের দেবতা নাকি বিঘ্ননাশক? 

এই কুমারিকাখণ্ডমেই গজাননের জন্মের পরে মহাদেব পার্বতীকে বলেন যে তাদের পুত্র মহাদেবের মতই গুণবান হবেন। বিক্রমে, বীর্যে, দয়ায় তিনি শিবতুল্য। 

আর এরপরেই গণেশের সম্পর্কে অতীব গুরুত্বপূর্ণ কথাটি ঘোষণা করেন। 

যেষাং ন পূজ্যাঃ পূজ্যন্তে ক্রোধাসত্যপরাশ্চ যে। 

রৌদ্রসাহসিকা যে তেষাং বিঘ্নং করিষ্যতি। 

শ্রুতিধর্ম্মান্ জ্ঞাতিধর্ম্মান্ পালয়ন্তি গুরূংশ্চ যে।। 

কৃপালবো গতক্রোধাস্তেষাং বিঘ্নং হরিষ্যতি। 

যারা পূজনীয়দের পূজা (সম্মান প্রদর্শন ইত্যাদি) করবে না, যারা ক্রোধী, দুঃসাহসী ও অসত্যপরায়ণ, এই পুত্র (গণেশ) তাদের জীবনে বিঘ্ন উৎপাদন করবেন। 

যারা ধর্ম পালন করেন(এর মানে এই নয় তিলক কেটে নিরামিষ কেহেয় লাফালাফি করবো), গুরুজনের পূজা করেন, দয়ালু, ক্রোধহীন তাদের বিঘ্ননাশ করবেন। 

অর্থাৎ বোঝা গেল বিঘ্ন নামের বিভাগের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তাকেই দেওয়া হয়েছে। কর্ম অনুসারে তিনিই কখনও বিঘ্নদান করেন কখনওবা বিঘ্ননাশ। 

আর শুধু তাই নয়,

সবিঘ্নানি ভবিষ্যন্তি পূজয়াস্য বিনা শুভে 

শঙ্কর, পার্বতীকে বললেন, "হে শুভে, এঁর পূজা ছাড়া সমস্ত ধর্মকর্ম বিবিধ বিঘ্নে আক্রান্ত হবে"। 

এমনকি স্কন্দপুরাণ অনুসারে কার্তিকের অগ্রজ তিনি। তারকাসুরহন্তা কার্তিকের আবির্ভাবের আগে অবধি তিনিই দায়িত্ব নিয়ে দেবতাদের বিঘ্ননাশ ও দৈত্য দানবদের বিঘ্নদান করে গেছেন।

পরবর্তীতেও, এই একই কাজ দায়িত্ব সহকারে পালন করেছেন তিনি। 

এইবার যেহেতু বাঙালি হিন্দু এক শ্রেণীর অসাধু ধর্ম ব্যাবসায়ীদের দ্বারা মারাত্মক রকমের ইনফ্লুয়েন্সড এবং এদের ধারনা গণেশ হলেন সামান্য দেবতা। আর যেহেতু ভাগবত গীতায় বলা আছে দেবতা পূজা ঠিক না তাই এরা গণেশকে অবহেলা করেন বা গণেশকে খুব একটা পাত্তা দেন না। 

আমাদের জানা উচিৎ বেদ ছাড়া আমাদের কোন গতি নেই। বেদেই সকল কিছুর উৎস্য আমাদের ঋষি মুনিরা সবাই বেদ মাতাকে আশ্রয় করেই এই ধর্মীয় জ্ঞানকে ত্বরান্বিত করেছেন যুগে যুগে। তাই বেদের উল্লেখিত দেবতারাই আমাদের মুখ্য পূজ্য। আসুন দেখে নেই  বেদে 'গাণপত্য' মত বা গণেশ ভক্তদের সম্পর্কে কি বলা আছে। 



'গণ' বা জীবের যিনি ঈশ্বর তিনিই গণেশ। ভগবান গণেশ হলেন, গণশক্তির প্রতীক । সিদ্ধিবিনায়ক মঙ্গলমূর্তি ভগবান শ্রীগণেশকে বিঘ্নহর্তা নামে অবিহিত করা হয়। সকল শুভ কর্মের শুরুতে শ্রীগণেশের পূজা করা হয়। দেবতাদের মধ্যে ‘প্রথম পূজ্য’ তিনি।বৈদিককাল থেকেই গণেশের উপাসনা দেখতে পাওয়া যায় । ঋগ্বেদ সংহিতায় গণপতি বা গণেশকে কবিদের মধ্যে কবি, এবং মন্ত্রসমূহের স্বামী বলে অবিহিত করা হয়েছে।


গণানাং ত্বা গণপতিং হবামহে

কবিং কবীনামুপমশ্রবস্তমম্।

জ্যেষ্ঠরাজং ব্রহ্মণাং ব্রহ্মণস্পত

আ নঃ শৃণ্বন্নূতিভিঃ সীদ সাদনম্।।

(ঋগ্বেদ সংহিতা:২.২৩.১)


"হে ব্রহ্মণস্পতি! তুমি গণপতি, কবিদের মধ্যে তুমি কবি, তোমার অন্ন সর্বোৎকৃষ্ট ও উপমানভূত। তুমি প্রশংসনীয়দের মধ্যে রাজা এবং মন্ত্রসমূহের স্বামী। আমরা তোমাকে আহ্বান করি, তুমি আমাদের স্তুতি শ্রবণ করে আশ্রয় প্রদানার্থে যজ্ঞগৃহে উপবেশন কর।"


যাস্কাচার্যের নিরুক্তে ব্ৰহ্মণস্পতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি ব্রহ্মের রক্ষক বা পালয়িতা। ব্রহ্মরূপ ব্ৰহ্মণস্পতি কি করে ব্রহ্মের রক্ষক বা পালয়িতা হতে পারে? এ বিষয়ের সংশয় নিরসনে বলা যায় যে, বৈদিক নিঘণ্টকোষ অনুসারে (২.৭) ‘ব্রহ্মন্’ শব্দের অর্থ অন্ন এবং ঋগাদি মন্ত্র। ব্রহ্মণস্পতি হলেন মন্ত্র এবং অন্ন এ উভয়েরই রক্ষক বা পালয়িতা।বৃষ্টিপ্রদানাদি দ্বারা; বৃষ্টি না হলে অন্ন হয় না এবং অন্নের অভাবে জীবলোক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে সমাজ সভ্যতা বিনষ্ট হয়। তখন আর মন্ত্র যথাযথভাবে রক্ষিত হয় না।


ব্ৰহ্মণস্পতির্ব্রহ্মণঃ পাতা বা পালয়িতা বা ৷৷

(নিরুক্ত:১০.১২.৫)


"ব্রহ্মণস্পতি শব্দের অর্থ ব্রহ্মের রক্ষক বা পালয়িতা।"


শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতায় গণপতিকে গণের অধিপতি, প্রিয় গণের প্রিয়পতি এবং নিধি বা সম্পদের অধিপতি বলা হয়েছে ।


গণানাং ত্বা গণপতিং হবামহে,

প্রিয়াণাং ত্বা প্রিয়পতিং হবামহে।

নিধীনাং ত্বা নিধিপতিং হবামহে, বসো মম।।

(যজুর্বেদ : ২৩.১৯)


"হে জীবের অধিপতি গণপতি, তোমাকে আহ্বান করি। হে প্রিয়গণের মধ্যে প্রিয়পতি, তোমায় আহ্বান করি।তুমি নিধিগণের (সম্পদ) মধ্যে নিধিপতি, তোমায় আহ্বান করি। হে বসুরূপ ভগবান তোমায় আহ্বান করি; তুমিই আমার একমাত্র পালক হও।"


কৃষ্ণ যজুর্বেদীয় তৈত্তিরীয় আরণ্যকে ভগবান গণেশকে 'তৎপুরুষায়' বলে অবিহিত করে একটি বিনায়ক গায়ত্রী রয়েছে।


তৎপুরুষায় বিদ্মহে বক্রতুণ্ডায় ধীমহি।

তন্নো দন্তিঃ প্রচোদয়াৎ।।

(তৈত্তিরীয় আরণ্যক:১০.১.২৫)


"সেই বিনায়ক পুরুষকে জানতে আমরা বক্রতুণ্ড গজাননের ধ্যান করি। সেই ধ্যানে মহাদন্ত গণপতি আমাদের অনুপ্রাণিত করুন বা তাঁর পথে প্রেরণ করুন।"


শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার ষোড়শ অধ্যায়ে সর্বব্যাপী এবং সকলের মাঝে বিরাজমান রুদ্রের স্তোত্র করতে গিয়ে রুদ্রকে গণপতি বলে অবিহিত করা হয়েছে।অর্থাৎ রুদ্ররূপ শিব এবং গণপতিরূপ গণেশ যে একই এ মন্ত্রে বিষয়টি সুস্পষ্ট।


নমো গণেভ্যো গণপতিভ্যশ্চ বো নমো৷

নমো ব্রাতভ্যো ব্রাতপতিভাশ্চ বো নমো।

নমো গৃৎসেভ্যো গৃৎসপতিভ্যশ্চ বো নমো।

নমো বিরূপেভ্যো বিশ্বরূপেভ্যশ্চ বো নমঃ॥


নমঃ সেনাভ্যঃ সেনানিভ্যশ্চ বো নমো।

নমো রথিভ্যো অরথেভ্যশ্চ বো নমো।

নমঃ ক্ষত্তৃভাঃ সংগ্রহীতৃভ্যশ্চ বো নমো।

নমো মহদ্ভ্যো অর্ভকেভ্যশ্চ বো নমঃ৷৷


নমস্তক্ষভ্যো রথকারেভ্যশ্চ বো নমো।

নমঃ কুলালেভ্যঃ কর্মরেভ্যশ্চ বো নমো।

নমো নিষাদেভ্যঃ পুঞ্জিষ্ঠেভ্যশ্চ বো নমো।

নমঃ শ্বনিভ্যো মৃগয়ুভ্যশ্চ বো নমঃ৷৷

(শুক্লযজুর্বেদ সংহিতা:১৬.২৫-২৭)


"গণসমূহকে নমস্কার এবং তোমাদের অর্থাৎ গণপতিগণকেও নমস্কার। নানা জাতিসমূহের সঙ্ঘকে নমস্কার। এই সঙ্ঘের পালকগণকে নমস্কার। লম্পটগণকে নমস্কার। জটী-মুণ্ডী ইত্যাদি বিরূপগণকে নমস্কার। (নগ্নমুণ্ডজটিলাদয়স্তেভ্যো বো নমঃ)। এবং তুরঙ্গবদন তথা হয়গ্রীব প্রভৃতি বিশ্বরূপ গণসমূহকে নমস্কার ৷


সেনাগণ রূপী রুদ্রদের নমস্কার; সেনাপতিগণকে নমস্কার; রথারোহীগণকে নমস্কার এবং রথহীনগণকে নমস্কার। রথের অধিষ্ঠাতাবৃন্দ রূপী রুদ্রদের নমস্কার; রথের অশ্বকে চালিতকারী সারথিগণকে নমস্কার; মহান্ বীরগণরূপী রুদ্রগণকে নমস্কার; বীর শিশুসমূহরূপী রুদ্রগণকে নমস্কার৷


তক্ষ (সূত্রধার) জনরূপী রুদ্রগণকে নমস্কার; রথনির্মাতারূপী রুদ্রগণকে নমস্কার; কুম্ভকারগণকে নমস্কার, কর্মকারগণকে নমস্কার, গিরিচর মাংসাসী নিষাদগণকে নমস্কার; শিকারী কুক্কুরসমূহকে নমস্কার; শিকারী কুক্কুরগণের শিকারী প্রভুবৃন্দরূপী রুদ্রগণকে নমস্কার৷"


শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার ষোড়শ অধ্যায়ের মত কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতাতেও গণ ও গণপতি স্বরূপ রুদ্রকে নমস্কার করা হয়েছে। মন্ত্রগুলো বা মন্ত্রগুলোর কয়েকটি পাদ প্রায় একই বলা চলে। অর্থাৎ রুদ্ররূপ শিব এবং গণপতিরূপ গণেশ যে একই তা শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার মত কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতার মন্ত্রেও বিষয়টি সুস্পষ্ট। সেই মন্ত্রে মহৎ ও ক্ষুদ্র রূপসহ বিকৃতরূপ ও বিশ্বরূপধারী রুদ্রদেব এবং তাঁর গণদের উদ্দেশে বারবার নমস্কার করা হয়েছে।


নমো গণেভ্যো গণপতিভ্যশ্চ বো নমো

নমো বিরূপেভ্যো বিশ্বরূপেভ্যশ্চ বো নমো।

নমো মহদ্ভ্যঃ ক্ষুল্লকেভ্যশ্চ বো নমো নমো রথিভ্যোঽরথেভ্যশ্চ বো নমো নমো রথেভ্যঃ

রথপতিভ্যশ্চ বো নমো।

নমো রথেভ্যঃ রথপতিভ্যশ্চ বো নমো নমঃ

সেনাভ্যূঃ সেনানিভ্যশ্চ বো নমো। নমঃ ক্ষত্তৃভ্যঃ সংগ্রহীতৃভ্যশ্চ বো নমো নমস্তক্ষভ্যো রথকারেভ্যশ্চ

বো নমো। নমঃ কুলালেভ্যঃ কর্মারেভ্যশ্চ বো নমো

নমঃ পুঞ্জিষ্টেভ্যো নিষাদেভ্যশ্চ বো নমো।

নম ইষুকৃদ্ভ্যো ধন্বকৃদ্ভ্যশ্চ বো নমো।

নমো মৃগয়ুভ্যঃ স্বনিভ্যশ্চ বো নমো নমঃ

শ্বভ্যঃ শ্বপতিভ্যশ্চ বো নমঃ।।

(কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা:৪.৫.৪)


শুক্লযজুর্বেদ সংহিতায় ভগবান গণেশের উদ্দেশ্যে যজ্ঞে আহুতি প্রদানের মন্ত্র প্রদান করা হয়েছে। সেই মন্ত্র হল, "গণপতয়ে স্বাহা"। যে মন্ত্র আজও ভগবান গণেশের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত যজ্ঞে ব্যবহৃত হয়।


অসবে স্বাহা বসবে স্বাহা বিভুবে

স্বাহা বিবস্বতে স্বাহা গণশ্রিয়ে স্বাহা

গণপতয়ে স্বাহাঽভিভুবে স্বাহাঽধিপতয়ে

স্বাহা শূষায় স্বাহা সংসর্পায় স্বাহা চন্দ্রায়

স্বাহা জ্যোতিষে স্বাহা মলিম্বুচায় স্বাহা

দিবা পতয়তে স্বাহা৷।

(শুক্লযজুর্বেদ সংহিতা:২২.৩০)


"অসু-বসু-বিভু-বিবস্বান-গণশ্রী-গণপতি-অভিভূ-বল-

সংসর্প জ্যোতিষ-ম্লীমুচ-দিবাপতি ইত্যাদির অধিপতি দেবগণের উদ্দেশ্যে স্বাহা মন্ত্রে এই আহুতি প্রদান করছি।"


ভগবান গণপতিকে যারা ব্রহ্মরূপে উপাসনা করে, তাদের গাণপত্য বলে। এ গাণপত্য মতটি সনাতন পঞ্চমতের অন্যতম। এ গাণপত্য মতপথের সম্প্রদায়টি বৈদিককাল থেকেই বহমান। বেদের মধ্যেই আমরা গণেশ গায়ত্রী মন্ত্র পাই। সেই মন্ত্রে "বক্রতুণ্ডায় ধীমহি" এবং 'তন্নো দন্তিঃ প্রচোদয়াৎ" বাক্য পাই। যে বাক্য সুস্পষ্টভাবে ভগবান গণেশকে নির্দেশ করে। ভগবান গণেশকে বেদে কখনো ব্রহ্মণস্পতি (ঋগ্বেদ সংহিতা:২.২৩.১) ; কখনো রুদ্র বলা হয়েছে (কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতা:৪.৫.৪)।আবার ইন্দ্রও বলা হয়েছে:


নি ষু সীদ গণপতে গণেষু

ত্বামাহুর্বিপ্রতমং কবীনাম্।

ন ঋতে ত্বৎ ক্রিয়তে কিং

চনারে মহামর্কং মঘবঞ্চিত্ৰমর্চ।।

(ঋগ্বেদ সংহিতা:১০.১১২.৯)


"হে বহুলোকের অধিপতি গণপতি ! স্তবকর্তাদের মধ্যে উপবেশন কর, ক্রিয়াকুশল ব্যক্তিদের মধ্যে তুমিই শ্রেষ্ঠ। কি নিকটে, কি দূরে, তোমা ব্যতিরেকে কিছুই অনুষ্ঠান হয় না। হে ধনশালী ! আমাদের ঋকসমূহকে বিস্তারিত ও বিচিত্র রূপ করে দাও।"


একই পরমেশ্বর গণপতিকে ব্রহ্মণস্পতি, রুদ্র, ইন্দ্র ইত্যাদি বিবিধ নামে অবিহিত করার কারণ বেদেই সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। বেদে বলা হয়েছে যে, সেই পপরমেশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। সেই এক এবং অদ্বিতীয় পরমেশ্বরকেই বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হলেও, তিনি বহু নন।


ইন্দ্রং মিত্রং বরুণমগ্নি-মাহু রথো

দিব্যঃ স সুপর্ণো গরুত্মান্।

একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি

অগ্নি যমং মাতরিশ্বানমাহুঃ।।

(ঋগ্বেদ: ১.১৬৪.৪৬)


"সেই সদ্বস্তু অর্থাৎ পরব্রহ্ম এক ও অদ্বিতীয়। কিন্তু জ্ঞানীগণ তাঁকেই ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, অগ্নি, দিব্য (সূর্য্য), সুপর্ণ, গরুড়, যম, বায়ু ইত্যাদি বিভিন্ন নামে অভিহিত করে থাকেন।"


শৈব এবং শাক্ত মতের মিলিত রূপ গাণপত্য। এ গাণপত্য মত বেদ থেকে উদ্ভূত হয়ে বৈদিক যুগ থেকেই প্রচলিত। এ গাণপত্য মত সনাতন পঞ্চমতের অন্যতম। কেউ যদি বলেন গণেশ বা গণপতি শুধুমাত্র দেবতা বা কারো দাস তাঁদের শক্তভাবে বর্জন করুন। 














Saturday, August 6, 2022

ঋকবেদে পরমেশ্বর শিব

 ঋগবেদে প্রভু পরমেশ্বর শিব

পরমেশ্বর ভগবান শিব বৈদিকযুগ থেকেই উপাসিত। আমরা জানি বেদের মুল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছেন প্রভু পরমেশ্বর আদি দেব সদা শিব। সকল কিছু উনার থেকেই উৎপন্ন আবার সকল কিছু উনাতেই নিঃশেষ হবে। বেদে রুদ্র রূপী শিব বা শিব রূপী রুদ্র নতুন কিছু না। সকল শৈবরা জানেন বেদের সেই রেফারেন্স গুলো। প্রশ্ন হচ্ছে UNESCO কতৃক সবথেকে প্রাচীন যে গ্রন্থ সেটার মধ্যে কি শিব আছেন? আসুন দেখে নেই। এখানে উল্লেখ্য ঋগবেদ বলতে আমি শুধু বেদের সংহিতা ভাগকে বুঝাই নাই। ঋগবেদের ৩ টি শাখা বর্তমান তা হল শাকল, ভাস্কল এবং আশ্বালায়ন শাখা। এর থেকে যদি কেউ কিছু বলে তাহলে তা অবশ্যই বেদের থেকে বলছেন বুঝতে হবে।  তাই অযথা কমেন্টে তর্ক না করার অনুরোধ রইলো। 

ঋগ্বেদ সংহিতার দশম মণ্ডলে কৈলাশ পর্বতের স্বর্ণশিখরে বসবাসকারী শিবের উল্লেখ পাই। সেই শিব যেমন অচিন্ত্য নিরাকার তেমনি, সাকার রূপধারী। সে জ্যোতির্ময় রূপের তিনটি নয়ন এবং তিনি নীলকন্ঠ। কৈলাশ পর্বতে শিবের সে নিবাস অত্যন্ত রমনীয়। সে নিবাস জীবের শুভ এবং কল্যাণকর। পরমেশ্বর শিবের সে নিবাসে দেবতারা সদা আনন্দে বিরাজ করেন। 

কৈলাশশিখরাভাসং হিমবদ্ গিরিসংস্থিতম্।

নীলকন্ঠং ত্র‍্যক্ষং চ তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু।।

কৈলাশশিখরে রম্যে শঙ্করস্য শুভে গৃহে।

দেবতাস্তত্র মোদন্তি তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু।।

(ঋগ্বেদ সংহিতা : আশ্বলায়ন শাখা, ১০.১৭১.২৪-২৫)

"কৈলাশ পর্বতের স্বর্ণশিখরের ন্যায় জ্যোতির্ময়,  হিমগিরিতে সংস্থিত, নীলকন্ঠ ত্রিনেত্র রূপ শিবে আমার মন সংযুক্ত হোক।

রমনীয় কৈলাশ পর্বতের শুভ গৃহে বা শিবের নিবাসে দেবতারা সদা আনন্দে বিরাজ করেন, সেই আমার মন শিবসঙ্কল্পময় বা শিবের সাথে সংযুক্ত হোক।"

শুধু ঋগ্বেদই নয় অথর্ববেদসহ শুক্ল-কৃষ্ণ উভয় যজুর্বেদেই পরমেশ্বর শিবের স্তোত্র রয়েছে।   শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার ষোলতম অধ্যায়টি পুরোটাই রুদ্ররূপী,শিবরূপী পরমব্রহ্মের স্তোত্র দিয়েই পূর্ণ।সমাজের প্রত্যেকটি শ্রেণী এবং পেশার মানবের মাঝেই রুদ্ররূপ ব্রহ্মের প্রকাশ। ষোলতম অধ্যায়ে  গুরুজন, বালক, তরুণ, গর্ভস্থ শিশু,পিতা, মাতা ও সকল আপনজনদের ভগবান রুদ্রের কাছে রক্ষা করার প্রার্থনা করা হয়েছে অনন্য অসাধারণ  কাব্যময়তায়। ব্রহ্মরূপী রুদ্রই বৃক্ষ-লতা-গুল্মরূপে, জীবের পালকরূপে, সন্ন্যাসী, সাধু-সন্ত থেকে চোর, বাটপাড়, ছিনতাইকারী সকলরূপে এক তিনিই বিরাজিত। কারণ তিনি ছাড়া যে জগতে আর দ্বিতীয় কেউ নেই।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়:

"দেবাধিদেব মহাদেব!

অসীম সম্পদ, অসীম মহিমা ॥

মহাসভা তব অনন্ত আকাশে।

কোটি কণ্ঠ গাহে জয় জয় জয় হে ॥"

আমরা আজ কথায় কথায় নিজদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতায় অবলীলায় বলে ফেলি যে, বেদে কোন দেবতা প্রসঙ্গে বলা নেই। কিন্তু কথাটি সত্য তো নয়ই ; বরং সর্বাংশে মিথ্যা। বেদের আরণ্যক অংশের প্রায় পুরোটা উপাসনাবিধি নিয়েই রচিত। আর আরণ্যক যে বেদ তা সম্প্রতি বহু ব্যাকরণ এবং বেদজ্ঞ পন্ডিত গন স্বীকার করেছেন।





 বর্তমানে আমরা ভগবান শিবের অভিষেক এবং সকল রোগনাশের জন্যে 

"ত্র‍্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম" মন্ত্র এবং শিবের ষড়াক্ষর মন্ত্র " ওঁ নমঃ শিবায় " জপ করি। আপনারা জানলে অবাক হবেন,  সকল মন্ত্রই বেদ থেকেই নেয়া। মৃত্যু প্রত্যেকের জীবনেই নিশ্চিত।গাছের একটি পাকা ফল আম বা পেপে পেকে টশটশে হয়ে  নিজেই গাছ থেকে ঝরে পরে। ঠিক সেভাবেই পূর্ণায়ু পেয়ে আমরা যেন আমাদের দেহরূপ প্রদীপকে যাঁর থেকে এসেছি, তাঁর কাছেই সমর্পণ করতে পারি ভগবানের কাছে এমনই আমাদের প্রার্থনা করা উচিত। আমরা কেউ অনন্তকাল বেঁচে থাকতে থাকতে পারব না।মহাকাল রুদ্রের প্রতি সমর্পিত বেদের মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রে ঠিক এ সমর্পণ ভাবটিই সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবিদর্দ্ধনম্।

উর্বারুকমিব বন্ধনান্ মৃত্যোর্মুক্ষীয় মামৃতাৎ।।

(ঋগ্বেদ সংহিতা:০৭.৫৯.১২)

"অতীত,বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বা জন্ম,জীবন ও মৃত্যু -এ ত্রয়ীদ্রষ্টা রুদ্ররূপ হে পরমেশ্বর, তোমার বন্দনা করি।তুমি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য সুন্দর পরিবেশ ও পুষ্টিকর খাদ্যের দাতা।পাকা উর্বারুক ফলের ন্যায় আমরা যেন পূর্ণায়ু পেয়েই মৃত্যুর বন্ধন হতে মুক্ত হতে পারি। তোমার অমৃতরূপ হতে যেন বঞ্চিত না হই।"

নমঃ শম্ভবায় চ ময়োভবায় চ।

নমঃ শঙ্করায় চ ময়স্করায় চ।

নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ।।

(শুক্লযজুর্বেদ সংহিতা : ১৬.৪১)

"মুক্তি এবং সংসারসুখদাতা ভগবান শিবকে নমস্কার, লৌকিক ও মোক্ষসুখের কারক শিবকে নমস্কার ; যিনি কল্যাণরূপ হয়ে ভক্তজনের কল্যাণ-বিধান করেন সেই ভগবান রুদ্রকে নমস্কার। "

বেদের তৈত্তিরীয় আরণ্যকের দশম প্রপাঠকের বাইশ অনুবাকে একা শুধু ভগবান শিব নয়; অম্বিকাপতি, উমাপতিকেও বন্দনা করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ ভগবান শিবের সাথে সাথে জগন্মাতা অম্বিকাকেও বন্দনা করা হয়েছে। 

নমো হিরণ্যবাহবে হিরণ্যবর্ণায় হিরণ্যরূপায়

হিরণ্যপতয়ে অম্বিকাপতয় উমাপতয়ে

পশুপতয়ে নমো নমঃ।।

"অম্বিকাপতি,উমাপতি, পশুপতি, হিরণ্যাদি সর্বনিধির পালক,তেজোময়, হিরণ্যবাহু, হিরণ্যবর্ণ, হিরণ্যরূপ পরমেশ্বর শিবের উদ্দেশে নমস্কার। "

শুধুমাত্র বেদেই নয়, মহাভারতের অসংখ্য স্থানে শিবমহিমা এবং স্তোত্র আছে। এর মধ্যে অনুশাসন পর্বের সপ্তদশ অধ্যায়ে বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক বলা ভগবান শ্রীশিবের সহস্র নামস্তোত্র অন্যতম , এ পবিত্র স্তোত্র সনাতন ধর্মাবলম্বী আমাদের নিত্যপাঠ্য।সেই স্তোত্রের শুরুতেই ভগবান শিবের মহিমা সম্পর্কে ঋষি তণ্ডী শ্রীকৃষ্ণকে যা বলছেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

"যিনি তেজেরও তেজ, তপস্যারও তপস্যা, শান্তদিগের মধ্যে অতিশান্ত, সকল প্রভারও প্রভা, জিতেন্দ্রিয়দের মধ্যে যিনি জিতেন্দ্রিয়, জ্ঞানীদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, দেবতাদেরও যিনি দেবতা,ঋষিদের ঋষি, যজ্ঞসমূহের যজ্ঞ, মঙ্গলকারীদের মঙ্গলকারী, রুদ্রগণের রুদ্র, প্রভাবশালীদের প্রভাব, যোগীদের যোগী, সকল কারণের কারণ এবং যাঁর থেকে সমস্তলোক উৎপন্ন হয় আবার যাঁর মধ্যে লয় পায়, সেই সর্বভূতাত্মা, সংহর্তা, অমিততেজা ভগবান মহাদেবের অষ্টোত্তর সহস্রনাম আমার নিকট শুনুন ; হে মনুষ্যশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ, এ মহাপবিত্র স্তোত্র শ্রবনেই আপনি সকল অভীষ্ট লাভ করবেন।

(শিবসহস্রনামস্তোত্রম : ২৬-৩০)

প্রায় দুইহাজার বছর পূর্বে মহাকবি কালিদাস তাঁর জগতনন্দিত মহাকাব্য রঘুবংশের শুরুতে প্রথম শ্লোকেই জগতের আদি মাতা-পিতা পার্বতী এবং পরমেশ্বর শিবের বন্দনা করেছেন অসাধারণ আলঙ্কারিক ব্যঞ্জনায়। তিনি বলেছেন-যেমন শব্দ এবং শব্দ থেকে উৎপন্ন তার অর্থকে আলাদা করা যায় না; ঠিক একইভাবে শিব এবং শক্তিকেও আলাদা করা যায় না। 

বাগর্থাবিব সম্পৃক্তৌ বাগর্থপ্রতিপত্তয়ে।

জগতঃ পিতরৌ বন্দে পার্বতীপরমেশ্বরৌ।।

"শব্দ এবং শব্দের অর্থ যেমন করে সম্পৃক্ত ; ঠিক একইভাবে সম্পৃক্ত জগতের আদি পিতা-মাতা শিব এবং পার্বতী। বাগর্থ সহ সকল প্রকার বিদ্যা কলার প্রতিপত্তির জন্যে সেই পার্বতী- পরমেশ্বরকেই সদা বন্দনা করি।"

উপাস্য হিসেবে আলাদা আলাদাভাবে উপাসনা করলেও আমরা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মূলত এক ব্রহ্মেরই অনন্ত রূপ-রূপান্তরের উপাসনা করি। তাই বর্তমানের কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কথায় সংশয়াছন্ন না হয়ে আমরা আমাদের পূর্ববর্তী ঋষি-মুনিদের পথেই সাকার-নিরাকারের সমন্বয়েই অধিকারী ভেদে এক পরমেশ্বরের উপাসনা করতে চাই। অনেকে বলেন, সৃষ্টিকর্তা সাকার হতে পারেন না । আমি তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, সৃষ্টিকর্তা যদি সর্বশক্তিমান হন তবে তিনি সব পারেন, আর যদি না পারেন সেটা তার ব্যর্থতা; তখন তিনি আর সর্বশক্তিমান নন। তাইতো ঋগ্বেদ সংহিতায় বলা হয়েছে:

একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি 

অগ্নিং যমং মাতরিশ্বানমাহুঃ।। 

(ঋগ্বেদ : ০১.১৬৪.৪৬)

"সেই এক পরমেশ্বরকেই আমরা অগ্নি, যম, মাতরিশ্বান সহ বিভিন্ন নামে অভিহিত করি।"

বিভিন্ন নামে এবং রূপে অভিহিত করলেও তিনি বহু নন, তিনি আদতে একজনই। সেই অনন্তরূপে পরিব্যাপ্ত এক ঈশ্বরের করুণায় এ জগত পূর্ণ। 

বেদে কি আমাদের সবাইকে বৈষ্ণব হতে বলেছে? নব্য কৃষ্ণ ভক্তদের দাবী !!!

আমরা সকলেই জানি ইস্কনি ভন্ড কৃষ্ণভক্তদের ভন্ডামি খুব সূক্ষ্য। এরা শাস্ত্র না জানা সহজ সরল হিন্দুদের মাথা ধোলাই দিয়ে নিজেদের ব্যাবসা ভারী করে আর নারী সঙ্গ লাভে অনেকে তা করেও থাকেন। Propoganda ছড়াতে এদের জুরি মেলা ভার। এরই ফলশ্রুতিতে, নব্য কৃষ্ণ ভক্ত ইস্কনীদের নতুন আমদানী।

এরা শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার কোন এক মন্ত্র দেখিয়ে আমাদের বলে থাকেন যে আমাদের সকলকে বৈষ্ণব হতে বেদ নির্দেশ দিচ্ছেন।  চলুন দেখে নেই এই মন্ত্রটি আসলে কি  শুক্লযজুর্বেদ  (৫/২১, ৫/২৫)(স্ক্রীনশট) 


এই মন্ত্র দেখে বা প্রমাণ দেখে অনেকেই মগজ ধোলাই খেয়ে নিবেন। এই মন্ত্র শুক্লযজুর্বেদ সংহিতা শ্রী বিজন বিহারী গোস্বামী কতৃক সম্পাদিত। 

উনার বইয়ের থেকে স্ক্রীনশট



মজার ব্যাপার হল এইসব ভন্ড বৈষ্ণবের দল 

  • মন্ত্রের বিনিয়োগ কি?, 
  • কোন যাগের অন্তর্ভূক্ত?, 
  • যাগের নাম কি? 
  • কোন যাগে এই মন্ত্র বলতে হয় ? 
  • কেন বলতে হয়?
  • স্তব মন্ত্র নাকি আহুতি মন্ত্র? 
  • ঋক মন্ত্র? 
  • মন্ত্রের আহুতি কে? 
  • হোত্র কে?  
এইসব কিছুই বা  মন্ত্রের কোন পরিচয়ই এরা দেয় নাই।  যাইহোক এরা অবৈদিক এবং বেদ এরা মানেন না এটা জিজ্ঞাসু চক্ষুর জন্য নতুন কিছু না। প্রশ্ন এখানে আরেকটা!!!


আসুন অক্ষয় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত শুক্লযজুর্বেদ সংহিতা পূর্বভাগ থেকে একই মন্ত্র প্রত্যক্ষ্য করি।


সুধী, এখানে মন্ত্রটির অর্থ খেয়াল করুন। ভন্ডদের দেয়া উক্ত মন্ত্রের যুক্তিতে আমি পরে আসছি। আপাতত এই ২ টি স্ক্রীনশট খেয়াল করুন। এখানে অক্ষয় প্রকাশনী থেকে যে সংহিতা তাতে ভিন্ন কথা লেখা। এখানে তো " বৈষ্ণব হও "  এমন বাক্য কি পাওয়া যাচ্ছে? উত্তর হল না। পাওয়া যাচ্ছে না। সংস্কৃত ভাষার বিভিন্ন মারপ্যাচ এখানে মারতে আসিনি। বেদের কিছু মন্ত্র একদম অপরিবর্তনীয়। এই সব মন্ত্রের কোন ভিন্ন অর্থ সাধারণত করা যায় না। কিন্তু এমন কিছু মন্ত্র আছে যা ভাষ্যকার বিভিন্ন অর্থ করে থাকেন। এখন আন্তর্জাতিক মানের একটি সংঘটন শুধু এক ভাষ্য নিয়ে এমন কথা বলবেন কেন? এটা কেমন ধরণের ভন্ডামি? ভক্ত সংখ্যা বাড়ানো আর নিজেদের দূর্বল বেসকে শক্ত করার জন্য কেনই বা এদের এরকম ভন্ডামির আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে? 

এবার আসি যদি বেদে এই কথা থেকেও থাকে তাহলে প্রশ্ন হল এখানে কিসের ভিত্তিতে আপনাকে বৈষ্ণব হতে বলছে? 

যজ্ঞক্ষেত্র নির্বাচন  এবং এর অধিষ্ঠাতা -অধিষ্ঠাত্রী দেবতা -দেবীদের ক্ষেত্রে  প্রথমে তাঁর প্রার্থনা করা হয় এরপর তাঁর উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করা হয়। সংহিতা ভাগ সব সময় যজ্ঞের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। যজ্ঞতে যজ্ঞকর্তাকে অনেক কিছুর ভূমিকা পালন করতে হয় । এইবার এই ভাগে যেহেতু বিষ্ণুর বিক্রম বর্ণন করা হয়েছে তাই এই যজ্ঞে অবশ্যই যজ্ঞ যজমান বৈষ্ণব ( বিষ্ণু প্রীতি লাভের উদ্দেশ্যে উনার ভক্তি সাধন) হতে হবে। এখন এই মন্ত্রের মাধ্যমে কি বলা যায় যে সকল মানুষকে বৈষ্ণব হতে বলেছে? তাছাড়া যজ্ঞ শুধুমাত্র কয়েক মূহুর্ত বা কয়েক দিনের জন্য হয়ে থাকে। সেই সময় কেউ বৈষ্ণব বা বিষ্ণু ভক্ত থাকবেন এইটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে  Propoganda চালানো সরাসরি বেদে বলা বৈষ্ণব হতে বলা হচ্ছে এরকম মিথ্যাবাদী একমাত্র এরাই হতে পারে।  এতসময় যে আলোচনা করলাম তা মন্ত্রের এই ভাষ্যানুমোদিত সম্বোধ্য বা অর্থে কি ভাব প্রকাশ পায়, সুধীগণেরই তা বিচার্য। মন্ত্রগুলির মধ্যে কোনও সম্বোধ্য পদ নেই। সে ক্ষেত্রে শকট, হবিধান, ররাট্যন্ত, লজানি প্রভৃতি পদ অধ্যাহার করবার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধ মনে হয় না এই মিথ্যেবাদীর দল করেছেন।

আমার সর্বশেষ নিবেদন পাঠকের উদ্দেশ্যে, আমরা জানি বেদের সংহিতা ভাগে যজ্ঞ তথা কর্মকান্ড নিয়ে কথা বলে। আর আমাদের প্রিয় বৈষ্ণব সমাজ সবসময় আর্য সমাজের বিপক্ষে কথা বলার সময় মুক্তি নিয়ে কথা বলে আর্য সমাজকে কোনঠাসা করেন। সব সময়  পরা আর অপরা বিদ্যা নিয়ে কথা বলেন।  বিস্তারিত এই লিঙ্ক কিন্তু আজকে উনারাই কর্মকান্ড নিয়ে পোষ্ট দিচ্ছেন !! এইটা কি স্বেচ্চাচারী না? 

আরও বলা যায় এরা ভগবান বিষ্ণুদেবকে মানেন না। এদের মতে এক কৃষ্ণের থেকে লক্ষ লক্ষ বিষ্ণুর সৃষ্টি। এখন যখন বেদে কৃষ্ণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় তখন এরা নারায়ন বা বিষ্ণুকে দেখান। যখন কৃষ্ণের supremacy নিয়ে কথা  বলা হয় তখন এরা বেদের নারায়নকে দেখান। মানে যখন আসল ধরে টান দেয়া হয় তখন নারায়ন কৃষ্ণ এক। যখন এদের দলে ভিড়ে যাবেন তখন নারায়ন কিছুই না। কৃষ্ণই সমস্ত কিছু। 

আসলে এরা হল ভন্ড ধর্ম ব্যাবসায়ী। যা যা এদের সুবিধা তাই এরা মানে। যা এদের বিপক্ষে এরা তা মানেন না । যাকে ইংরেজী ভাষায় বলা হয় Hypocrisy...  



Sunday, July 10, 2022

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত ( ইসকন) এর অশাস্ত্রীয় কাল্পনিক গুরু পরম্পরা

 

খুব ছোট লেখা এবং খুব সংক্ষেপে যাতে পাঠক এক নজরে বুঝতে পারে। এই কথাগুলো যেকোন ইসকনের আখড়ায় ( মন্দির না) গিয়ে জিজ্ঞাসা করে দেখুন। এই অশাস্ত্রীয় পাপীগুলো চুপ করে থাকবে নাহয় উলটাপালটা যুক্তি প্রদর্শন করবে। 
কেশব দত্ত ঠক্কুর মহাশয় ছিলেন গৌড়ীয় বৈষ্ণব ( পড়ুন কৃৈষ্ণব )পন্থার এক অন্যতম গুরু বা Pioneer বলা যায়। তো উনার ছেলে শ্রী বিনোদ দত্ত তাঁর বাবার পরম্পরায় দীক্ষিত না হয়ে উনি এদেরই আরেক পরম্পরার গুরু গৌড় কিশোরদাস  বাবাজির নিকট দীক্ষা নেন। এইদিকে গৌড় কিশোর দাস বাবাজি হলেন জগন্নাথ দাস বাবাজির দীক্ষিত। বলা হয় জগন্নাথ দাস বাবাজি ,গৌড়িয় কৃৈষ্ণবদের অন্যতম পন্ডিত শ্রী বলদেব বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের পরম্পরার একজন ছিলেন। মজার ব্যাপার হল যাদের আপনারা সন্ন্যাসী বলে জানেন এরা আসলে গৃহস্থ ছিলেন। এই যে মহা পন্ডিত শ্রী বলদেব বিদ্যাভূষণ, উনি কিন্তু গৃহস্থ ছিলেন। মানে উনার স্ত্রী সন্তান ছিল। এই সমস্থ সন্ন্যাসকে আতুড় সন্ন্যাস বলা হয়। আর এই কথা আমার না উপনিষদ বাক্য। 

যাইহোক, বিনোদ দত্ত বাবু কি করলেন? গৌড় কিশোর দাস বাবাজি গত হবার পর নিজে ব্রাহ্মন ডেকে উনার ছবি সামনে রেখে বিরজা করান এবং এরপর সন্ন্যাস নেন। কি হাস্যকর চিন্তা করেন। সাধারণত গুরু সবার সামনে এবং সর্ব সম্মুখকে স্বাক্ষী মেনে তাঁর শিষ্যকে দীক্ষা দেন এবং সেটাই হাজার হাজার বছর থেকে হয়ে আসছে আর এটাই শাস্ত্রীয় নিয়ম। কিন্তু এই বিনোদ বাবু কি করলেন? গায়ের জোরে বলা যায় নিজেই নিজের সন্ন্যাস দীক্ষা সম্পন্ন করলেন। এইখানে মূর্খের দল ট্যালিপ্যাথি, স্বপ্ন সহ অনেক হাস্যকর যুক্তি টানবে। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন একে জোড়াতালি বলে। যখন এরা ধরা খায় তখন এরা এইসব বলেই পার পায়। বাস্তবে এই ধরণের অধিকার শাস্ত্র আমাদের কাউকে দেয় না। তাছাড়া বিরজা সন্ন্যাসে অব্রাহ্মণের অধিকার নাই।  তো এইসব কুকীর্তি শুনে আমাদের কেশব দত্ত ঠক্কুর মহাশয় অনেক রাগান্বিত হয়ে যান। উনি তাঁর সন্তানকে প্রশ্ন করেন 

"তুমি তো ব্রাহ্মণ নউ! আমি তা নই। তো তুমি কোন যুক্তিতে এই ব্রাহ্মণের ন্যায় সন্ন্যাস নিলে?"

এর উত্তরে উনি কিছুই বলতে পারেন নাই। ফলে কেশব বাবু উনার সন্তানকে ত্যাজ্য পুত্র করেন । এখন কথা হল সরস্বতী পরম্পরা যেহেতু ইসকনী কৃৈষ্ণবদের নাই তাই এরা এই উপাধি লিখতে পারে না। ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী বলে যার চুরণ সাধারণ ভক্তদের খাওয়ানো হয় তা আসলে ভুল। ইনাদের পরম্পরা হলেন সোজা কথায় গৌড় কিশোর দাস বাবাজি । সন্ন্যাস পরম্পরা নিয়ে এরা যে ফাইযলামী আর গায়ের জোরে অতিরিক্ত পরম্পরা যুক্ত করেছেন সেখানে গুরুর কোন অস্তিত্বই নাই।  এরজন্যই এই ইসকনের যে পরম্পরা তা একটি ভ্রান্ত পরম্পরা। গৌড়ীয় পরম্পরার সাথে এই ইসকনের পরম্পরার কোন সম্পর্ক নেই। অতিরক্ত যে পরম্পরা সেখানে যোগ হয়েছে এর কারণে এদের যে পরম্পরা সেটা একটা দূষিত পরম্পরা। আর কলিতে এটাই যে স্বাভাবিক তা শাস্ত্রবাক্য সিদ্ধ। 



এবার আসি দ্বিতীয় যুক্তিতে। যারা আরও ডিটেলে পড়তে চান এঁদের জন্য।


ইসকনীদের দাবী এরা হলেন চৈতন্য ভারতীর ( এরা মহাপ্রভু বলেন) অনুসারী। উনার দেখানো পথেই এরা চলেন। এখন আসুন দেখে নেই এই চৈতন্য ভারতী কে ছিলেন? এবং উনার পরম্পরা কি? 

প্রথমে দেখে নেই আদি শংকর প্রবর্তিত গুরু পরম্পরা।  (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় দ্বিতীয় ভাগ, পৃষ্ঠা-১৪) এর মতে, 


আনন্দগিরি-কৃত শঙ্করদিগ্বিজয় গ্রন্থে বলা হয়েছে–


শৃঙ্গপুরসমীপে তুঙ্গভদ্রানদীতীরে চক্রং নির্ম্মায় তদগ্রে সরস্বতীং নিঘায় এবমাকল্পং স্থিরাভব মদাশ্রমে ইত্যাজ্ঞাপ্য নিজমঠং কৃত্বা তত্র দেব্যাঃ পীঠনির্ম্মাণং কৃত্বা ভারতীসম্প্রদায়ং নিজশিষ্যাঞ্চকার। –(শঙ্করদিগ্বিজয়)

অর্থাৎ : তুঙ্গভদ্রা-নদীতীরে শৃঙ্গপুরের নিকটে চক্র নির্মাণ করিয়া তাহার সম্মুখে সরস্বতীদেবীকে প্রতিষ্ঠিত করিলেন, এবং বলিলেন, “কল্পান্ত পর্যন্ত আমার আশ্রমে অবস্থিতি কর।” পরে নিজ মঠ নির্মাণ ও তাহাতে দেবীর পীঠ প্রস্তুত করিয়া ভারতী নামক শিষ্য-সম্প্রদায় প্রবর্তিত করিলেন।

লিখিত আছে, শঙ্করাচার্যের শিষ্যেরা তাঁর আদেশানুসারে নানা দেশে ভ্রমণ ও সেখানকার পণ্ডিতদের সাথে বিতর্ক-বিচারে অবতীর্ণ হয়ে শিব, বিষ্ণু প্রভৃতি সাকার দেবতার উপাসনা প্রচার করেন। যেমন–

এবমশেষদিগ্বিজয়ং কৃত্বা তত্তদ্দেশস্থান্ কাংশ্চিত্ পঞ্চাক্ষরিহামন্ত্ররাজ্যে পদেশাদিনা তন্মতাবলম্বিনঃ করোতি পরমতকালানলঃ শঙ্করচার্য্যশিষ্যঃ। –(আনন্দগিরি-কৃত শঙ্করদিগ্বিজয়)

অর্থাৎ : শঙ্করাচার্যের শিষ্য পরমতকালানল অশেষরূপে দিগ্বিজয় করিয়া সেই সেই দেশের অনেক লোককে পঞ্চাক্ষর মন্ত্রের উপদেশ দ্বারা শৈবমতাবলম্বী করিতে থাকেন।


এভাবে দিবাকর আচার্য দ্বারা সৌর-মত, ত্রিপুর-কুমার দ্বারা শাক্ত-মত, গিরিজাপুত্র দ্বারা গাণপত্য-মত ও বটুকনাথ দ্বারা ভৈরব-উপাসনা প্রচারিত হয় বলে লিখিত আছে। তাঁরা সবাই পরম গুরু শঙ্করাচার্যের শিষ্য। তাঁর প্রধান চার শিষ্য হলেন– পদ্মপাদ, হস্তামলক, মণ্ডন ও তোটক। পদ্মপাদের দুই শিষ্য– তীর্থ ও আশ্রম। হস্তামলকের দুই শিষ্য– বন ও অরণ্য। মণ্ডনের তিন শিষ্য– গিরি, পর্বত ও সাগর। তোটকের তিন শিষ্য– সরস্বতী, ভারতী ও পুরি। 

এই শব্দগুলো উপাধি-বিশেষ। লিখিত আছে, বিশেষ বিশেষ লক্ষণানুসারে এই দশ শিষ্যের তীর্থাদি দশটি নাম ও এই দশ জন থেকেই দশনামী সন্ন্যাসীদের তীর্থাদি দশ সংজ্ঞা উৎপন্ন হয়েছে। 

এবার চৈতন্যদেবের জীবনী দিকে তাকাই। 

উনার সন্ন্যাসের দীক্ষাগুরু ছিলেন কেশব ভারতী। উনি কুলিয়াতে যা বর্ধমান পশ্চিম বঙ্গে অবস্থিত ।উনার পূর্ব নাম ছিল কালীনাথ আচার্য। তিনি মাধবেন্দ্ৰ পুরীর শিষ্য ছিলেন। শ্ৰীচৈতন্যদেব তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাসব্রত গ্ৰহণ করেন। এটা পরিস্কার যে উনি দশনামী সম্প্রদায়ের ছিলেন। এর জন্য চৈতন্য চরিতামৃততে দেখিঃ 

উনি নিজেই শঙ্করাচার্য্যকে গুরু মানতেন।।

পাশাপাশি যারা শ্রীধরকে মানে না, তাদের বেশ্যা বলে গালিগালাজ করতেন।।

" প্রভু হাসি কহে স্বামী না মানে যেইজন

বেশ্যার ভিতরে তারে করয়ে গণন "

------- চৈ.চঃ অন্তলীলা, সপ্তম পরিচ্ছদ, ১০০---------


"শ্রীধরের অনুগত যে করে লিখন

সব লোক মান্য করি করয়ে গ্রহণ।"

-------চৈ.চঃ অন্তলীলা, সপ্তম পরিচ্ছদ, ১২০----------


স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভু ভাগবত পুরানের ক্ষেত্রে শ্রীধর স্বামীর ভাষ্যকেই শ্রেষ্ঠ বলেছেন।

এবং এও বলেছেন, "যে ভাগবতে শ্রীধর স্বামীর ভাষ্য মানে না তাকে তোমরা বেশ্যার মধ্যে গণন কর।"

"শ্রীধর-উপরে গর্ব যে কিছু করিবে।

অন্তব্যন্ত লিখন সে লোকে না মানিবে।"

[অন্তব্যন্ত লিখন= অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত অর্থাৎ, শাস্ত্রের মীমাংসা বা সিদ্ধান্ত না বুঝে যথেচ্ছ ভাবে লেখা]

শ্রী ধর স্বামী ছিলেন ১১৬ তম গোবর্ধন পুরীপিঠাধীশ শঙ্করাচার্য্য।।


মাধবেন্দ্র পুরী মহাশয় ছিলেন লক্ষীপতি তীর্থের শিষ্য । ইনারা সবাই ছিলেন আচার্য্য শংকর প্রবর্তিত ১০ নামী সম্প্রদায়ের । প্রমাণ এদের নামের টাইটেলেই আছে। তীর্থ, পুরী , ভারতী ইত্যাদী যত টাইটেল বা উপাধি দেখা যায় এরা সবাই ১০ নামীর অন্তর্ভূক্ত। যদিও গৌড়িয়রা এঁদের সবাইকে মাধ্বচার্য্যের শিষ্য বলে দাবী করেন কিন্তু এই দাবী খুব খোঁড়া এবং হাস্যকর বটে। কারণ মাধ্বচার্য্য বা আনন্দ তীর্থ  মহাশয়ের যে সময় তা মধ্যযুগ  (১২৩৮-১৩১৭) এবং উনি নিজে যে তীর্থ উপাধি পান সেটা অদ্বৈত মঠের অধীন ১০ নামী সম্প্রদায় থেকে পান। তাহলে এইটা পরিষ্কার যে উনাদের গোড়াপত্তনকারী নিজেই দশনামীর অন্তর্ভুক্ত। মধ্যযুগীয় একজন ব্যাক্তি থেকে কিভাবে হাজার হাজার বছরের সনাতন ধর্মের পরম্পরার শুরু হয়? সাধারণ কমন সেন্স দিয়ে ধরলেই এঁদের ভন্ডামি ধরা যায়। তাছাড়া এঁদের যে ভাগবত গীতার হাস্যকর গুরু পরম্পরা সেটাও একটি কাল্পনিক মত। সে নিয়ে আলাদা লেখার ইচ্ছা আছে। 

এবার তাহলে ভাবুন,  শঙ্করাচার্যের সিদ্ধান্তকে খন্ডন করার অর্থ হলো চৈতন্য মহাপ্রভুকে কাঁদানো, তাই নয় কি! সোজা কথায় মহাপ্রভুকে গালি দেওয়া। কি রকম হাস্যকর ব্যাপার যার নাম ব্যবহারের মাধ্যমে গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের প্রসিদ্ধি হয়েছে, তাঁর(চৈতন্য মহাপ্রভুর) সিদ্ধান্তকেই অস্বীকার করা যে চরম অজ্ঞতা এটা আপনাদের বুঝতে হবে।


আরেকটা মজার ব্যাপার হল,চৈতন্য মহাপ্রভু কতগুলো গ্রন্থ লিখেছেন সেটা নিয়ে ওনাদের নিজেদের মধ্যেই মতবিরোধ রয়েছে ।  ক্ষোদ চৈতন্য চরিতামৃত চৈতন্য ভারতী মারা যাবার ২৪ বছর পরে লিখা হয় । যাইহোক এই নিয়ে নাহয় আরেকদিন লিখবো। সেখানে উল্লেখিত শিক্ষাষ্টকম যা চৈতন্য ভারতীর কতৃক একমাত্র রচনা। মজার ব্যাপার হল  এঁদের মাঝে আবার তিনি যে শিক্ষাষ্টক্(আটটি শ্লোকের) রচনা করছেন এটা নিয়ে কোন মতবিরোধ নেই।এবার শিক্ষাষ্টক্ এর প্রথম শ্লোকের যে সিদ্ধান্ত তা শঙ্করাচার্যের সিদ্ধান্ত নয় কি! এই শিক্ষাষ্টক উনি ভজ গোবিন্দম ( আদি গুরু শংকরের রচনা) এর সিদ্ধান্ত থেকেই রচনা করেন। এবার দেখুন

 ―"চেতদর্পন মার্জনম্ অন্তে― শ্রীকৃষ্ণ সংকীর্তনম্"― অর্থাৎ চিত্তরূপী দর্পনের(যা পূর্বজন্মের সংস্কার,অহংকার ক্রোধ ইত্যাদির দরুন ময়লা হয়ে গেছে) পরিষ্কার শ্রীকৃষ্ণ সংকীর্তনের মাধ্যমে হয়(এটাই সংক্ষেপে প্রথম শ্লোকের অর্থ)।এবার একটু বিচার করুন তো, এটি কার সিদ্ধান্ত? উপনিষদ তথা শঙ্করাচার্য্যের সিদ্ধান্ত নয় কি? এবার শুনুন ও বিচার করুন― অন্যের মুখ দেখার জন্য শুধু নেত্র হলেই চলে নাকি দর্পণের প্রয়োজনীয়তা আছে?না নেই।শুধু নেত্র হলেই হয়।কিন্তু নিজের মুখ দেখতে হলে নেত্রের সাথে দর্পনের প্রয়োজন পড়ে। যদি চৈতন্য মহাপ্রভুর দৃষ্টিতে শ্রীকৃষ্ণ কেবলমাত্র উনার উপাস্যই বা আত্মীয়ই হত তাহলে তিনি শ্রীকৃষ্ণের দর্শনের জন্য কেবল নেত্রের কথাই উল্লেখ করতেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ উনার দৃষ্টিতে নিজ-আত্মাস্বরূপ বিধায়, আত্মাস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণের দর্শনের জন্য চিত্তরূপী দর্পনের পরিষ্কারের প্রয়োজনীয় পড়েছে।



'অচিন্ত্যভেদাভেদ' পদের কতিপয় যৌক্তিক অসঙ্গতি বিংশ শতাব্দীর অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি পর্যালোচনা

  ভূমিকা গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের কেন্দ্রীয় মতবাদ হলো 'অচিন্ত্যভেদাভেদ'। শ্রীচৈতন্যের ভাবধারা থেকে উদ্ভূত এই দার্শনিক অবস্থানটি ঈশ্...

Popular Posts