Tuesday, December 13, 2022

জাপান ও সনাতন সংস্কৃতি

 প্রথমেই যে প্রশ্নটি মাথায় আসে তা হল : জাপানি শিন্তো ধর্মে ভারতীয় 'দেবতা'রা কোথা থেকে এলেন? এঁরা জাপানে এসেছেন মূলতঃ মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রসারের ফলে। বর্তমানে হিন্দু দেবতাদের পূজা হয় মূলতঃ বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের একটি ক্ষুদ্র জাপানি শাখা শিঙ্গন বৌদ্ধধর্মের বিশ্বাসীদের মধ্যে। থেরবাদী(হীনযান) বৌদ্ধ মতানুসারে, দেবতাদের অস্তিত্ব থাকতে পারে, তবে তাঁরা মানুষের চেয়ে বেশি ক্ষমতাধর বা বুদ্ধিমত্তা-বিশিষ্ট হবেন, এমন কোনো মানে নেই, তাই তাঁরা পূজ্য নন(এমনিতেও পার্থিব স্থূল বাসনা পূরণের উদ্দেশ্যে উপাসনা বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনের পরিপন্থী)। তবে মহাযান ও বজ্রযান মতানুসারে দেবতারা হলেন আদিবুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বগণের অধীন সত্ত্বা(একই ধারণা জৈনধর্মের তীর্থঙ্করদের 'শাসনদেবতা'দের মধ্যেও দেখা যায়)। তাঁরা মানুষের চেয়ে বেশি ক্ষমতাধর ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী, অতএব পূজ্য।

জাপানি ভাষায় দেবতা শব্দটির ভাবানুবাদ 'তেনবু'। এই কারণে দেবতাদের নামের শেষে 'তেন' শব্দবন্ধটি পাওয়া যায়।


জাপানে হিন্দু দেবতারা 'সৌভাগ্যের সপ্ত দেবতা'র মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এই সাত জন দেবতা'র মধ্যে চার জন ভারতীয়, দুই জন চীনা, ও এক জন জাপানি(মতান্তরে তিন জন চীনা)। চার জন ভারতীয় সৌভাগ্যের দেবতা হলেন :

  • বেনজ়াইতেন/৺সরস্বতী :

জাপানে বুদ্ধের পরে সর্বাধিক পূজিত personified deity হলেন দেবী বেনজ়াইতেন, যাঁর সংস্কৃত নাম ভগবতী ৺সরস্বতী। জাপানে তিনি দ্বিভূজা, শ্বেতাম্বরা, নবযৌবনা, হাতে ধারণ করেন 'বিওয়া' নামক তারের বাদ্যযন্ত্র। তিনি শ্বেতনাগবাহিনী; যা কিছু বহমান, সেই সব কিছুর অধিষ্ঠাত্রী দেবী তিনি - যেমন সময়, প্রেম, জ্ঞান, গুণ, জল, শব্দ, সঙ্গীত প্রমুখ। কখনও তিনি শ্বেতপদ্মাসনা, কখনও তিনি ষড়ভূজা শস্ত্রপাণি, আবার কখনও জ্ঞানের নির্মলতাকে পরিস্ফুটিত করতে তাকে নগ্নিকা রূপেও দেখা যায়।

  • বিশামন্তেন/৺কুবের :

জাপানে ইনি সম্পদ, ন্যায় ও যুদ্ধের দেবতা। ইনি দ্বিভূজ, ভীষণ-দর্শন — এক হাতে থাকে ত্রিশূল অথবা কুঠার, অপর হাতে প্যাগোডা। ইনি শিন্তো ও বৌদ্ধ মন্দিরকে শত্রুদের থেকে রক্ষাও করে থাকেন। ন্যায়পরায়ণ ও নিয়মানুবর্তী মানুষ বিশামন্তেনের আশীর্বাদ সহজেই লাভ করে থাকেন। 'বিশামন্তেন' নামটি এসেছে ৺কুবেরের বৌদ্ধ নাম 'বৈশ্রবণ' থেকে(মহামুনি বিশ্রবার পুত্র ছিলেন কুবের, রাবণ, কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ, এবং কন্যা ছিলেন সূর্পনখা)।

  • কিশহউতেন/৺লক্ষ্মী :

ভারতের মতই জাপানেও ভগবতী ৺লক্ষ্মী(বৌদ্ধ নাম মহাশ্রীদেবী) হলেন আনন্দ, সৌন্দর্য, উর্বরতা ও সমৃদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ইনি দ্বিভূজা, রক্তাম্বরা, পদ্মাসনা ও নবযৌবনা, এক হাতে বরমুদ্রা, অন্য হাতে চিন্তামণি। উল্লেখ্য : যে পেচকবাহিনী দ্বিভূজা লক্ষ্মীর উপাসনা পূর্ব ভারতে প্রচলিত আছে, তাঁর রূপকল্প এসেছে পূর্ব ভারতে ৺লক্ষ্মীর প্রাচীন বৌদ্ধ রূপ দেবী বসুধারার থেকে।

  • দাইকোকুতেন/ঈশানাতেন/দাইজ়িজিতেন/৺মহাকাল/৺মহাকালী :

'দাইকোকুতেন' অর্থ হল 'ঘনকৃষ্ণ মহান/বিরাট' বা 'Great Black One' — 'মহাকাল' শব্দের অন্যতম আক্ষরিক অনুবাদ। ভগবান ৺শিবকে জাপানিরা জানেন 'দাইকোকুতেন' বা 'মাহাকারা' হিসেবে। ইনি দ্বিভূজ, এক হাতে হাতুড়ি ও অন্য হাতে ঝুলি। ইনি গার্হস্থ্য জীবন, কৃষি, উর্বরতা, যৌনতা ও যুদ্ধের দেবতা। ঈশানাতেন রূপে তাঁর কণ্ঠে থাকে নীল রঙের সাপ ও নৃমুণ্ডমাল্য - সেই রূপে তিনি ধর্মের রক্ষক ও ঈশান কোণের অধীশ্বর।

দাইকোকুতেনের ছয়টি প্রধান রূপ :

  1. বিকু দাইকোকু(মহাদেব — বিশ্বাস যে শাক্যমুনি বুদ্ধ পূর্বাবতারে মহাদেব ছিলেন) : পুরোহিত/সন্ন্যাসীরুপী, এক হাতে হাতুড়ি, অপর হাতে বজ্র-তরবারি, মঠের রক্ষাকর্তা হিসেবে পূজিত।
  2. ওইকারা দাইকোকু(শিবপুত্র ভগবান ৺কার্তিকেয়): রাজকীয় পোশাক পরিহিত, এক হাতে তরবারি, অপর হাতে বজ্র।
  3. ইয়াশা দাইকোকু : রাজকীয় পোশাক পরিহিত, হাতে ধর্মচক্র, দুষ্ট দমন করেন।
  4. মাহাকারা দাইকোকুনিয়ো(ভগবতী ৺মহাকালী) : নারী-রূপিনী, পালনকর্ত্রী, মাথায় ধানের ছড়ার গুচ্ছ।
  5. শিন্দা দাইকোকু(সম্ভবতঃ নরমুখ ৺গণপতি) : বালক-রূপী, হাতে চিন্তামণি, ভক্তের মনের ইচ্ছা পূর্ণ করেন ও সৌভাগ্য দান করেন।
  6. মাকারা দাইকোকু(সর্বাধিক পরিচিত রূপ) : হাতে হাতুড়ি ও পিঠে ধানের বস্তা, বসেন ধানের গুচ্ছের উপর।

(Metropolitan Museum of Artএ সংরক্ষিত দাইকোকুতেনের ছয় রূপের ছবি)


এই প্রধান দেবতারা ছাড়াও আরও যেই সব হিন্দু দেবতারা জাপানে পূজা পান :

  • কাঙ্গিতেন(ভগবান ৺গণেশ, বৌদ্ধ নাম বিনায়ক) :

ইনি একাধারে বিঘ্নকর্তা ও বিঘ্নহর্তা। এঁর দুই রূপ — একক ও দ্বৈত। দ্বৈত রূপটি মানবজীবনে সুখ-দুঃখ ইত্যাদি বৈপরীত্যের সহাবস্থানের প্রতীক। ইনি সুখী দাম্পত্য জীবন, সৌভাগ্য ও সু-প্রজননের আশীর্বাদ দিয়ে থাকেন।

  • ইদাতেন (ভগবান ৺স্কন্দ/৺কার্তিকেয়) :

মঠ-শ্রমণ-শ্রমণাদের রক্ষাকর্তা। রান্নাঘরের অধীশ্বর।

  • মারিশিতেন (৺মারীচি) :

ব্রক্ষ্মার মানস-সন্তান দশ প্রজাপতির মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মারীচি(অর্থ : সূর্যকিরণ)। ইনি মূলতঃ যোদ্ধা দেবতা, নারী ও পুরুষ উভয় রূপেই পূজা করা হয়।

  • সুইতেন(৺বরুণ) : পশ্চিম দিশার অধিপতি।
  • এনমাতেন(৺যম) : দক্ষিণ দিশার অধিপতি।
  • বন্তেন(৺ব্রক্ষ্মা) : ঊর্ধ্ব-দিশার অধিপতি।
  • ফুতেন(৺বায়ু) : উত্তর-পশ্চিম কোণের অধিপতি।
  • গাততেন(৺চন্দ্র)
  • জীতেন(৺পৃথিবী)
  • কাতেন(৺অগ্নি) : দক্ষিণ-পূর্ব দিশার অধিপতি।
  • নিততেন (৺সূর্য)
  • তাইশাকুতেন(৺ইন্দ্র) : পূর্ব দিশার অধিপতি।

সর্বশেষ যে দেবীর কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন চান্ডী/চুন্ডী(ভগবতী ৺চণ্ডী)।

কমলাসনের দুই পাশে দুই নাগরাজ নন্দ ও উপনন্দ সহিত দেবী চুন্ডী।

এই দেবীকে আদি বোধিসত্ত্ব বলে জ্ঞান করা হয়। ইনি আজ অবধি যত জীবাত্মা বুদ্ধত্ব লাভ করেছেন, সেই সাতশত কোটি বুদ্ধের আদি জননী। বিশ্বাস, শাক্যমুনি গৌতম বুদ্ধের বর্ণিত 'মহাচণ্ডী ধরণী' নামক স্তুতি শ্লোক পাঠ করলে জীবের সর্ব বিপদের ভয় দূর হয়। এই ত্রিনয়নী ও বহুভুজা রূপ, 'বিপত্তারিণী/দুর্গতিনাশিনী' প্রতিচ্ছবি ও পূর্বদেশীয় তান্ত্রিক ধারা হতে উৎপত্তির ইতিহাস অনুসারে বিবেচনা করলে বোঝা যায় যে ইনি ও ভারতীয় দেবী ৺চণ্ডী অভিন্ন।


এই হল জাপানে পূজিত হিন্দু দেবতা-সমূহ(অন্ততঃ আমার জানা-মতে)। তবে, ইংরেজি ক্বোরায় এক চাড্ডি-গোত্রীয় মানবরূপী ছাগসন্তানের দেওয়া postএ একবার আমি এই বিষয়ে একটা ডাহা ভুল দেখেছিলাম :

এঁকে বলা হয়েছিল দেবী ৺দুর্গা।

তবে অর্ধশিক্ষিত propagandaবাজ লোকজন যাই বলুক না কেন, প্রাচ্যীয় সভ্যতায় বহুভুজা শস্ত্রপাণি দেবীমূর্তি মাত্রই ৺দুর্গা নন।

ইনি আসলে করুণার অবতার বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বরের নারী-রূপ, দেবী কোয়ানয়িন(গুয়ান শি য়িন)-এর সহস্রভুজা মূর্তি(Thousand Armed Guanyin)।

ইনি আমার অন্যতম প্রিয় personified deityদের মধ্যে অন্যতম। এঁর বিষয়ে অনেক সুন্দর গল্প আছে, পরে এক দিন বলা যাবে সেই সব।

Wednesday, November 9, 2022

বিভিন্ন দেশের পৌরাণিক কিছু অদ্ভুত প্রাণী

 আমাদের ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত প্রাণী দিয়েই শুরু করা যাক

কামধেনু

সমুদ্রমন্থনজাত কামধেনুর কথা আমরা প্রত্যেকেই জানি। মনের কাঙ্খিত সকল বস্তু দিতে সক্ষম, বহু দিব্য ক্ষমতা সম্পন্ন এই কামধেনু। পুরাণ মতে গরু-মহিষের মত সকল দ্বিক্ষুর জাতীয় প্রাণী কামধেনুর সন্তান।

ঐরাবত

সমুদ্রমন্থন থেকে উত্থিত বিশালাকায়, প্রচন্ড শক্তিশালী, সাতশুড় যুক্ত, দিব্য সাদাহাতি হলো ঐরাবত। পুরানমতে ঐরাবত দেবরাজ ইন্দ্রের বাহন।

ইচ্ছাধারী নাগ

পুরাণ এবং বিভিন্ন উপকথায় ইচ্ছাধারী নাগ-নাগিনের ছড়াছড়ি। আমরা সবাই এদের সম্বন্ধে জানি তাই আর গভীরে গেলাম না।

গরুড়

গরুড় সম্বন্ধেও আমরা সবাই জানি, মানুষ এবং ঈগলের মিশ্রিত বিশালাকায় প্রাণী গরুড়। পুরাণ মতে গরুড় পক্ষীরাজ, পাখিদের দেবতা, বিষ্ণুবাহন এবং ব্রহ্মাণ্ডের সবথেকে শক্তিশালী জীব।

শরভ

শরভ পুরাণে উল্লিখিত এক অতি অদ্ভুত জীব। যার দেহ সিংহের, সিংহের ঘাড়ের ওপর কোমর পর্যন্ত মানুষের দেহ, সেই মানুষের ঘাড়ে সিংহের মাথা কিন্তু তার ঠোঁটে ঈগলের চঞ্চু এবং মাথায় হরিণের শিং। তার দুটি বিশাল ডানা, সুদীর্ঘ লেজ এবং আটটি পা।

ভগবান বিষ্ণু যখন নৃসিংহ রূপে ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠেন তখন মহাদেব এই শরভ রূপ নিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করেন।

গন্দভেরুণ্ড

পুরাণে উল্লিখিত দুই মুখযুক্ত বিশালাকায় পক্ষী, তার আকার এতটাই বড় যে একটি হাতিও তার কাছে খেলনার মতো।

কাহিনী অনুসারে মহাদেব যখন শরভ রূপে ভগবান নৃসিংহ কে পরাজিত করেন তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে গন্দভেরুণ্ড রূপে অবতীর্ণ হয়ে মহাদেবের শরভ রূপকে পরাজিত করেন।

মকর

মকর পুরাণে উল্লিখিত একটি প্রাণী যার দেহ মাছের কিন্তু মাথা হাতির মতো। পুরাণ মতে এই মকর মা গঙ্গার বাহন।

কবন্ধ

কবন্ধ রামায়ণে উল্লিখিত একটি রাক্ষস। তার মাথা এবং দুটি পা শরীরে ভেতর ঢোকানো। তার পেটে তীক্ষ্ম দাঁতযুক্ত মুখ এবং একটি বিশাল চোখ ছিলো, তার দুই হাত একশ যোজন লম্বা ছিলো। পা শরীরের ভেতর ঢুকে যাওয়ার কারণে সে চলতে পারতো না, কিন্তু তার হাত দুটো বিশাল হওয়ার কারণে তা দিয়ে বহুদুরের থেকেও শিকার ধরে আনতে পারতো।

রামায়ণের অরন্যকাণ্ডে এর উল্লেখ পাওয়া যায়, রাম এবং লক্ষণ যখন দেবী সীতার খোঁজ করছিলেন কবন্ধ তখন তাদের দুজনকে দুহাতে ধরে নেয় যার ফলে লক্ষণ তার হাত দুটো কেটে দেয়।

নবগুঞ্জরা

ওড়িয়া মহাভারতে উল্লিখিত 'ন রকম' প্রাণীর মিশ্রণ এই নবগুঞ্জরা। তার তিনটি পায়ের মধ্যে একটি হাতি, একটি ঘোড়া এবং একটি বাঘের পা, কিন্তু তার চতুর্থ পায়ের জায়গায় মানুষের হাত। তার ষাড়ের পিঠ, সিংহের কোমর, ময়ুরের গলা, মোরগের মাথা এবং তার লেজ একটি সাপ।

মহাভারত মতে একবার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই রূপে অর্জুনকে দর্শন দেন।



ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত জীবের বর্ণনা অনেক হলো এবার অন্যান্য পৌরাণিক জীবের সম্বন্ধে জানা যাক

মাইনটর

গ্রীক পুরাণে উল্লিখিত বিশাল প্রাণী যে মানুষ এবং ষাড়ের মিশ্রণ। এটি অত্যন্ত রগচটা প্রাণী বলে মনে করা হয়।

সেন্টর

সেন্টর গ্রীক পুরাণে উল্লিখিত খুবই জনপ্রিয় একটি জীব যার উপরিভাগ মানুষ এবং দেহের নিচের অংশ ঘোড়ার। গ্রীক পুরাণ মতে এরা সামাজিক প্রাণী হয় এবং গভীর বনে থাকে।

ড্রাগন

ড্রাগন বিভিন্ন পুরাণ এবং উপকথায় উল্লিখিত অত্যন্ত শক্তশালী প্রাণী যা আমাদের প্রত্যেকেরই পরিচিত। ইউরোপ, আফ্রিকা, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন গল্পে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ড্রাগনের বেশ কিছু প্রজাতি আছে, যেমন -

Wyvern

Qilin

Mushussu

তবে আমাদের সবথেকে পরিচিত দুটি ড্রাগন হলো

ইউরোপীয় ড্রাগন

চাইনিজ/জাপানিজ ড্রাগন

ব্যাসিলাস্ক

গ্রীক পুরাণ মতে ব্যসিলাস্ক হলো সাপেদের রাজা। এর জন্ম কাহিনী বেশ অদ্ভুত, কোনো মোরগ যদি সাপের ডিমে তা দেয় তবে এর জন্ম হয়। একে দেখতেও সাপ আর মোরগের মিশ্রণ, এর দেহ মোরগের কিন্তু লেজ ও জিভ সাপের। এবার এর গলাও কিছুটা সাপের মতো। বলা হয় যে এর চোখে চোখ রাখা মাত্রই যে কোনো প্রাণী পাথর হয়ে যায়।

কোনো কোনো মতে এটিও ড্রাগনের একটি প্রজাতি।

ক্র্যাকেন

সমুদ্রগর্ভে বসবাসকারী এক বিশাল হিংস্র দানব এই ক্র্যকেন। এর সঠিক বিবরণ কোথাও ঠিক করে দেওয়া হয়নি, তবে বলা হয় যে এটি এতটাই বিশাল, যে একটি জাহাজ নাকি এর সামনে খেলনার মতো। এর শরীরে অক্টোপাসের মতো অনেকগুলি হাত আছে। ১৮ শতকে অনেকে একে দেখার দাবিও করে। বলা হয় মাছ ধরার সময় হঠাৎ করে যদি জালে বেশী বেশী মাছ উঠতে শুরু করে তাহলে তাদের সেই মুহূর্তে পারে ফিরে আসা উচিত, কারন সেই মাছগুলি নাকি ক্র্যাকেনের ভয়েই দলে দলে সেদিকে পালিয়ে আসছে।

স্ফিংস

স্ফিংস মিশরের পৌরাণিক জীব, যার সিংহের দেহের ওপর নারী মস্তক এবং দুটি বিশাল ডানা। এটি শক্তি এবং বুদ্ধিমত্তার প্রতীক, পিরামিডের পাশাপাশি এর বহু মুর্তি দেখা যায়।

কাহিনী অনুযায়ী স্ফিংস মরুভূমিতে যাতায়াতকারী সকলকে দাড় করিয়ে একটি ধাঁধা জিজ্ঞাসা করে, আর তার তার উত্তর না পারলে সে সেই মানুষকে মেরে ফেলে। কিন্তু সে যদি উত্তর দিতে পারে তাহলে স্ফিংস নিজেই আত্মহত্যা করে নেয়।

বুরাক

ইসলামিক উপকথায় বর্ণিত একপ্রকার অদ্ভুত জীব যার দেহ গাধার কিন্তু মাথা এক নারীর। ইসলামীক কাহিনী অনুসারে মহম্মদ এই বুরাকের পিঠে চড়ে সাত আসমান পাড় করে আল্লাহর সিংহাসন অবধি পৌঁছেছিলেন।

কাপ্পা

কাপ্পা জাপানের উপকথায় বর্ণিত খুব হিংস্র প্রাণী, যার শরীর ব্যাঙের মত, চঞ্চু ও লিপ্তপদ হাঁসের মত এবং এর পিঠে কচ্ছপের মতো খাল। বলা হয় এরা জলে থাকতো এবং রাতের অন্ধকারে মানুষের ওপর আক্রমণ করতো। আর এরা নাকি বাচ্চাদের ওপরেই আক্রমণ বেশি করতো।

ফন

ফন রোমান পৌরাণিক কাহিনীর উল্লিখিত প্রাণী যার দেহের ওপরিভাগ মানুষের মতো আর কোমরের নিচের অংশ ছাগলের মত।

ম্যান্টিকোর

ম্যান্টিকোর গ্রীক পুরাণের এক অত্যন্ত হিংস্র, বিপজ্জনক, আক্রমণাত্মক পশু, যার দেহ সিংহের, মাথা মানুষের এবং লেজ একটি বিছের।

সাইনোসেফালি

মিশরীয় পুরাণে উল্লিখিত হিংস্র এবং মাংসাশী জীব যার মানুষের দেহ এবং কুকুর/শেয়ালের মাথা। বহু মিশরীয় চিত্রকলায় এর ছবি দেখা যায়।

মোনোপদ

মোনোপদ গ্রীক এবং রোমান পৌরাণিক কাহিনীতে বর্ণিত বামনাকৃতি মানব যাদের একটি মাত্র পা ছিলো। কিন্তু এদের সেই একটি পা এতটাই বড়ো যে দুপুরের কড়া রোদে সেটাকে তারা ছাতার মতো ব্যবহার করতো।


এছাড়াও আরও কিছু পৌরাণিক প্রাণী পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতায় দেখা যায় যেমনঃ 


  • নরওয়ে দেশের পুরাণে জরমুংগ্যান্ড নামে এক বিশালাকার সাপের কথা বলা আছে। সে নাকি সমুদ্রে থাকে, আর মাঝে মাঝেই সাঁতার কেটে পৃথিবীর শেষপ্রান্তে তীরে গিয়ে ওঠে। সেখানে সে লড়াই করে দেবতাদের সাথে।
  • মধ্যপ্রাচ্যের পুরাণকথায় প্রথম 'গ্রাইফোনের 'উল্লেখ পাওয়া যায়। গ্রাইফোন হল সিংহ আর ঈগল পাখির মিলিত রূপ।
  • বাইবেল আর গ্রিক উপকথায় পাওয়া যায় 'ককাট্রিসে' -কে। এ এক অদ্ভুত প্রাণী — সাপের শরীর অথচ তাতে মুরগির পাখা আর ড্রাগনের লেজ।
  • 'মেডুসা দ্য গর্গন ' হল গ্রিক পুরাণের এক দানবী। তার মাথায় থাকে অজস্র সাপ। কেউ তার মুখের দিকে তাকালেই পাথর হয়ে যেত!!
  • 'ফিনিক্স ' পাখির নাম মোটামুটি আমাদের সবারই জানা। এই ফিনিক্স পাখি নিজের শরীরে আগুন দিয়ে মারা যায়। পরে সেই ছাই থেকে জন্ম নেয় আবার।
  • 'ইউনিকর্ন '- কে আমরা অনেক হলিউড ও বলিউড মুভিতে দেখতে পাই। এদের বিশেষত্ব হলো শরীরটা ঘোড়ার মতো, কিন্তু মাথায় একটা পাকানো শিং আছে।
  • 'বুনিপ' — কি কিছু মনে পড়ল? 'চাঁদের পাহাড় ' উপন্যাসের সেই ভয়ংকর জীবটির নামই ছিল বুনিপ। অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের লোককথায় আছে জলাভূমির দানব বুনিপের কথা।
  • গ্রিক পুরাণে উল্লেখ আছে তিন মাথাওয়ালা দানব 'সারবেরাস'-এর কথা। বীর হেরাক্লিস এদের টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিলেন ইউরিসথিয়াসের রাজদরবারে। আর তারপর তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়ছিলেন পাতালপুরীতে।
  • গ্রিক পুরাণে আরও এক দানবের কথা পাওয়া যায়। এর মাথাটা সিংহের, লেজটা সাপের আর শরীরটা ছাগলের।আর এই দানবের নাম 'কিমিরা'।
  • 'মৎস্যকন্যা'-শব্দটি শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে সুন্দরী মেয়ে যার অর্ধেক শরীর মানুষের মতো আর বাকি অর্ধেকটা মাছের মতো। পুরাকাল থেকে মানুষজনের ধারণা, যদি কেউ মৎস্যকন্যার চিরুনি খুঁজে পায় তাহলে তার যেকোনো একটি ইচ্ছে পূরণ হয়।
  • সবশেষে আমাদের বাংলার রূপকথার কথা না বললেই চলে না। রূপকথার গল্পে সমৃদ্ধ আমাদের বাংলা ভাষাতেও রয়েছে ব্যাঙ্গমাব্যাঙ্গমীর মতো আজব পাখি আর পক্ষীরাজ ঘোড়ার গল্প। যা গ্রীক মাইথলজিতে Pegasus নামে পরিচিত।  


Saturday, October 15, 2022

কৃষ্ণ কি শুধুই বর লাভের জন্য শিব উপাসনা করেছেন? শিব কৃষ্ণে কি ভেদ আছে? কি বলেন স্বয়ং দ্বারকানাথ?

 নমঃ শিবায়

নমস্কার 

সনাতনী সকল ভ্রাতা ভগ্নিরদের নিকট অধমের প্রনাম ও ভালবাসা।

  বস্তুত এইসব ব্লগ দ্বৈতবাদী কৃৈষ্ণব সম্প্রদায়ের জন্য। যারা শিব কৃষ্ণে ভেদ করেন না, এদের জন্য না। 

দীর্ঘদিন অনলাইনের কল্যানে প্রায় সকল সচেতন মহল জানেন যে ভগবান কৃষ্ণ শিব উপাসনা করেছেন। মহাভারত এবং শিব মহাপুরাণের বায়বীয় সংহিতা এর বড় প্রমাণ (বিস্তারিত)। তাছাড়া হরিবংশতেও এর হাল্কা উল্লেখ রয়েছে। তবে অনেক ইস্কন সহ উগ্র দ্বৈতবাদী কৃষ্ণভক্তের দাবী উনি (শ্রীকৃষ্ণ) শুধু বর লাভের নিমিত্তেই শিব উপাসনা করেছেন বাস্তবে পরমেশ্বর শিব নাকি উল্টো পরম বৈষ্ণব ( বিস্তারিত) । যদিও এইসব দাবী বহু আগেই শৈবরা খন্ডন করেছেন এবং আগম শাস্ত্রের দ্বারাও এর প্রামাণিকতা পাওয়া যায় যে বাস্তবে পরমেশ্বর শিব কারো উপাসনা করেন না বরং নারায়ন সহ শ্রীকৃষ্ণ সবাই শিব অনুগ্রহ লাভ করেছেন বার বার। এমনকি শ্রীবিষ্ণুর ১০ অবতারকেও বার বার বধ করে পরমেশ্বর শিব নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করেছেন। শিব নারায়ণপ্রকৃতি আর পুরুষ স্বরুপ। এখানে পুরুষ হলেন শিব আর প্রকৃতি হলেন নারায়ণ। শুধু এই একটাই দাবী যা এরা শাক ঢাকতে ব্যাবহার করে। কিন্তু শাস্ত্র প্রমাণ এতই রবির ন্যায় জাজ্বল্যমান যে সেই রূপালি রঙ বের হয়েই যায়। 

আসুন আজ কূর্ম পুরাণ ( যা একদম স্বাত্তিক পুরাণ) থেকে দেখে নেই কৃষ্ণের নিজের মুখের কথা। 




বিস্তারিত বইয়ের লিঙ্ক

 তৎপরে দেবতা, খষি ও পিতৃগণের তর্পণ সমাধান করিলেন এবং মার্কেন্ডেয়ের সহিত দেবভবনে প্রাবেশ করিয়া লিঙ্গস্থ ভূতি- ভূষণ ভূতনাথের পৃজা করিলেন। হে বিপেন্দ্রসকল! অনস্তর সকল মনুষ্যের নিয়ন্তা সেই হরি আপনার সমস্ত নিয়ম সমাপন করিয়া ব্রাহ্মণদিগের পুজা করিলেন এবং মহর্ষ মার্কেন্ডেয়কে ভোজন করাইয়া, আত্মযোগ সমাপনপূর্ব্বক পুত্রাদিদ্বারা পরিবৃত হইয়া, মহর্ষি মার্কেন্ডেয়ের সহিত পৌরাণিকী পবিত্র কথা কহিতে আগন্ত করিলেন। অনন্তর মহামুনি মারকেন্ডেয় এই সমস্ত দেখিয়া হাসিতে কসিতে মধুর বাক্যে শ্রীকৃষ্ণকে বলিতে আরম্ভ  ক'রলেন। ৪২--৫১। 

মার্কেন্ডেয় কহিলেন-যাবতীয় লোকে কর্ম্মদ্ধারা আপনারই পূজা করিয়া থাকে এবং যোগিগণ আপনারই ধ্যান করে, কিন্তু আপনি পুণ্যকর্ম্মদ্বারা কোন দেবতার আরাধনা করিতেছেন, তাহা আমাকে বলুন। আপনিই সেই পরমব্রহ্ম ও নির্ব্বাণস্বরূপ অমলপদ, আপনিই ভারাবতরণ্রে নিমত্ত বৃষ্ণিকুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। ব্রহ্মবিদ্বর মগাবাহু কৃষ্ণ শ্রবণসমুৎসুক পুত্রগণের সমক্ষেই হাসিতে হাসিতে তাহাকে বলিতে লাগিলেন,আপনি যাহা! যাহা বলিলেন, সে সমস্তই সত্য, সন্দেহ নাই; তথাপি আমি সন|তন মহেশ্বরের পূজা করিতেছি। হে বিপ্র! আমার কিছুই কর্তব্য নাই, এবং আমার প্রার্থয়িতব্য কিছুই নাই; তথাপি সমস্ত জানিয়াও আমি. পরম শিব মহেশ্বরেরই পূজা করিতেছি। লোকে কামমোহিত হইয়া মোহুবশতঃ সেই দেবাদিদেবকে দেখিতে পায় না, সেই হেতু মহদেবই আত্মার মূল, ইহ! জানাইবার নিমিত্তেই আমি তাহার পুজা কারতেছি। শিবলিঙ্গ পূজা করা অপেক্ষা লোকমধ্যে আর পূণ্যকর নাই এবং দূর্গতি-খন্ডনেরও অপর কোন, উপায় নাই ; অতএব এই সমস্ত লোকের হিতের জন্য লিঙ্গে শিবের পূজা করিবে। বেদতত্বজ্ঞ পণ্ডিতেরা আমাকেই সেই শিবলিঙ্গ বলিয়া থাকেন, অতএব আমিই স্বয়ং আপনাতে মহাদেবের পূজা করিতেছি। আমিই সেই শিবের পরমা মুর্তি এবং আমিই শিবময়, আমাদের উভয়ের মধ্যে কোন প্রভেদ নাই, বেদে ইহাই নিশ্চিত হইয়াছে । অতএব সংসারভীরু লোকেরা সর্ব্বদাই লিঙ্গে সেই দেবদেব মহেশ্বরের ধ্যান, পুজা ও বন্দনা করিবে। ৫২--৬১। 

মার্কেন্ডেয় বলিলেন, হে সুরশ্রেষ্ঠ বিশলাক্ষ কৃষ্ণ সেই লিঙ্গ কি পদার্থ এবং লিঙ্গে কাহারই বা পুজা করিতে হয়? এই গভীর ও উৎকৃষ্ট বিষয়টী আমাকে বলিয়া। দিন। ভগবান কহিলেন, লিঙ্গ, অব্যক্ত আনন্দস্বরূপ জ্যতির্ম্ময় এবং অক্ষর? বেদে মহেশ্বরই অব্যয় ও লিঙ্গরূপী দেবতা বলিয়া কথিত হইয়াছেন। পূর্ববকালে ঘোর একার্ণব সময়ে স্থাবর-জঙ্গম বিলুপ্ত হইলে পর, ব্রহ্মার এবং আমার প্রবোধের নিমিত্ত মহাশিব প্রাদূর্ভূত হইয়াছিলেন। সেই অবধি ব্রহ্মা এবং আমি সমস্ত লোকের হিতের নিমিত্ত সর্বদাই মহাদেবের পূজা করিয়া থাকি। মার্কেন্ডেয় কহিলেন। হে কৃষ্ণ! পূর্ব্বে আপনাদের প্রবোধের জন্য কি প্রকারে পরমপদ ঐশ্বর লিঙ্গ উৎপন্ন হইয়াছিল, তাহাই এক্ষণে বলুন। ভগবান কহিলেন,_পূর্ব্বে যখন ঘোর অবিভক্ত তমোময় একার্ণব ছিল, তখন আমি সেই একার্ণবের মধ্যে শঙ্খ-চক্র-গদাধারী, সহস্রশীর্ষা, সহস্রাক্ষ সহস্রচরণ, সহস্রবাহু, সনাতন পুরুষ হইয়া শয়ন করিয়া ছিলাম। এমন সময়ে দূরে অমিততেজাঃ কোটিসূর্য্যপ্রতিকাশ, সৌন্দর্য সম্পন্ন, দীপ্তিবিশিষ্ট, চতূর্ব্বক্ত্র, মহাযোগী জগতের কারণ, কৃষ্ণাজিনধর, খক্‌ যজুঃ সাম মন্ত্র দ্বারা অতিষ্টুত ও বিভু আদিপুরুষকে দেখিতে পাইলাম । ৬২--৭০। 


প্রিয় ভ্রাতা ভগ্নিরা। এখানে লাল কালি দিয়ে হাইলাইট করা অংশটি দেখুন। ভগবান কৃষ্ণ শিবা উপাসনাকে নিজের উপাসনার সাথে তুলনা করেছেন। শিব কৃষ্ণে কোন ভেদ নেই। যেখানে সাক্ষাৎ ভগবান বলছেন উনি শিবময় এবং উনাতে আর শিবে ভেদ নাই। সেখানে দ্বৈতবাদী কৃৈষ্ণবগণ কোন সাহসে উনাদের আরাধ্যের বাক্য অপমান করে ভেদাভেদ করেন? পাশাপাশি ইদানিং কিছু উগ্র শৈবরাও শিব কৃষ্ণে ভেদ করে মহাপাপী হচ্ছেন। এদের জন্য করুনা হয়। এরা চোখ থাকতেও অন্ধ, জ্ঞান থাকতেও অজ্ঞানী। 

শাস্ত্র প্রমাণের মাধ্যমে সিদ্ধ হল শিব এবং কৃষ্ণ এরা অভেদ। ভগবান আর ভক্তে ভেদ নেই। আবার ভক্ত আর ভগবানেও ভেদ নেই। 

শিব শিব 

নমঃ শিবায়। 

    `    

Wednesday, October 5, 2022

হিন্দু ধর্মের যাবতীয় সকল বিশ্বরূপ

 শ্রী কৃষ্ণতো শুধুমাত্র একবার  যোগযুক্ত অবস্থায় অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন আর তাতেই বৈষ্ণবরা কৃষ্ণকে ঈশ্বর মনে করেন।  নিচে লক্ষ করুন বিষ্ণুর মায়াবসত কারনে দধীচি মুনিও বিষ্ণুকে  বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন।যারা শুধু কৃষ্ণকেই পরমেশ্বর ভাবেন এই পোস্ট তাদের জন্য।

মহাকাব্য মহাভারত বা ভাঃগীতা অনুসারে শ্রীকৃষ্ণ বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন এটা আমরা সবাই জানি। বাস্তবে বিশ্বরূপে স্রষ্টার পরমতত্ত্বকে অনুধাবণ করার জন্য উত্তরদাতা প্রশ্নকর্তাকে দেখিয়ে থাকেন। এখানে প্রশ্ন কর্তা সহজেই সেই পরম তত্ত্বের বিশালত্ব উপলব্ধি করতে পারেন। তাই উত্তরদাতা কোনভাবেই শুধুমাত্র একাই ব্রহ্ম হয়ে যান না। ইস্কন সহ অনেক বিভেদকামী সংঘটন আজকাল বিশ্বরূপ নিয়ে বড়াই করে হিন্দু সমাজে বিভেদ এনে আমাদের বিভক্ত করে নিজেদের পকেট ভারী করছে। বলা বাহুল্য শুধু শ্রীকৃষ্ণ বিশ্বরূপ দেখান নাই আরও অনেকেই দেখিয়েছেন। নিম্নের এর কিছু তুলে ধরা হল। 

 

>> দক্ষের কন্যা সতী জন্মের পরেই দক্ষকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেনঃ

(কূর্মপুরাণ, পূর্বভাগঃ ১২/৫২-৫৩,৫৮)

>> বৃহৎ সংহিতায় ইন্দ্রের বিশ্বরূপের বর্ণনা করা হয়েছেঃ(বৃহৎ সংহিতাঃ ৪৩/৫৪-৫৫)

>> গণেশ রাজা বরেণ্যকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেনঃ

(গণেশ গীতাঃ ৮/৬-৭)

>> ব্রহ্মা চন্ডিকে স্তুতি করে বলছেনঃ

-হে দেবী, তুমিই সবকিছু ধারণ কর, তুমি জগৎ সৃষ্টি কর, তুমিই পালন কর, তুমিই প্রলকালে গ্রাস কর।

(চণ্ডীঃ ১/৬৮-৬৯)

- এই জগতে আমি একাই, আমি ছাড়া আর দ্বিতীয় কে আছে? এই দুষ্ট দেখো- আমার বিভূতি আমাতেই প্রবেশ করছে।

(চণ্ডী - ১০/৮)

>>বরাহ পুরাণে শিবের বিশ্বরূপ প্রদর্শিত হয়েছেঃ

- শিব এখানে প্রোদেশ প্রমাণমাত্র হয়েও শতশীর্ষ, শত উদর বিশিষ্, সহস্র বাহু, সহস্র পদ, সহস্র চক্ষু, সহস্র মস্তক ও সহস্র মুখ সমন্বিত। অণু থেকে ক্ষুদ্র হয়েও সর্ববৃহৎ।

(বরাহ পুরাণ - ১/৯/৬৮)

>> বায়ু পুরাণেও শিবের বিশ্বমূর্তি বর্ণিত হয়েছেঃ

- শিবের উৎপত্তি অব্যাক্ত, তার দেহ ব্যাক্ত অর্থাৎ প্রকাশিত। তার দেহের অন্তর্গতসমূহ কাল। অগ্নি তাঁর মুখ, চন্দ্র ও সূর্য তার নেত্রদ্বয়, দিকসমূহ তাঁর কর্ণ, বায়ু তার ঘ্রাণ, বেদ তার বাক্য, অন্তরীক্ষ শরীর, পৃথিবী পদদ্বয়, তারকাগণ রোমকূপ।

(বায়ু পুরাণঃ ১/৯/৬৮)

>> বামন পূরাণেও শিবের বিশ্বরূপ পাওয়া যায়ঃ

- তুমিই বিষ্ণু, তুমিই ব্রহ্মা, তুমিই মৃত্যু, তুমিই বরদ, তুমি সূর্য ও চন্দ্র, তুমি ভূমি, তুমি জল, তুমি যজ্ঞ, নিয়ম, তুমি অতীত, ভবিষ্যৎ, তুমি আদি ও অন্ত, তুমি সূক্ষ্ম ও স্থুল, তুমিই (বিরাট) পুরুষ।

(বামন পুরাণঃ ৫৪/৯৬-৯৯)

>> পদ্মপুরাণে ব্রহ্মার বিশ্বরূপের বর্ণনাঃ

- হে বিভু, আমি দেখছি তোমার অনেক মুখ, তুমি যজ্ঞের গতি, তুমি পুরাণ পুরুষ, তুমি ব্রহ্মা, ঈশ, জগৎসমূহের সৃষ্টিকর্তা। প্রপিতামহ, তোমাকে নমস্কার।

(পদ্মপুরাণ সৃষ্টি খণ্ডঃ ৩৪/১০০)





>> গণেশ গীতাতে গণেশকে ব্রহ্মস্বরূপ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। গণেশ নিজের স্বরূপ বর্ণনা করছেন এভাবে:

- হে রাজন। শিব, বিষ্ণু, শক্তি এবং সূর্যে যে ভেদবুদ্ধি সে আমারই সৃষ্টি, যেহেতু আমিই জগৎ সৃষ্টি করি, হে প্রিয়। আমিই মহা বিষ্ণু, আমিই সদাশিব, আমিই মহাশক্তি, আমিই অর্যমা।

(গণেশ গীতাঃ ১/২০-২২)

>> মহাভারতের মার্কেণ্ডেয়-কৃত কার্তিকেয় স্তবে কার্তিকেয়ে বিশ্বমূর্তিরূপে বন্দিত হয়েছেনঃ

- তুমি পদ্মপলাশলোচন, তুমি অরবিন্দতুল্যমুখ-বিশিষ্ট, তোমার সহস্র বদন,সহস্র বাহু, তুমি লোকপাল, শ্রেষ্ঠ হরি, সকল দেব ও অসুরগণের আবাধ্য।

(মহাভাঃ বনপর্বঃ ২৩১, অঃ৪৩)

>> লিঙ্গপুরাণ পূর্বভাগের ৩৬ তম অধ্যায়ে এরকম বর্ননা এসেছে। শ্রীবিষ্ণু ব্রাহ্মণবেশে দধীচি মুনির নিকট এসে বললেন - আমি আপনার নিকট বর প্রার্থনা করি আমাকে বর প্রদান করুন। দধীচি মুনি বললেন রুদ্রদেবের অনুগ্রহে ভূত ভবিষ্যত আমি জানি। আপনাকে আমি চিনিতে পারিয়াছি আপনি স্বরূপে ফিরে আসুন। আপনি কৃপা করে বলুন শিব আরাধনা পরায়ন ব্যক্তির কোন ভীতি থাকে? আমি কাহারও সমীপে ভয় পাই না। তখন বিষ্ণু ছদ্মবেশ ত্যাগ করে বললেন - হে বিপ্র আমি জানি তুমি কাহারো নিকট ভয় পাও না তবুও তুমি সভামধ্যে ক্ষুপভূপতিকে বলো আমি ভয় পাইতেছি। তখন মহামুনি বললেন আমি ভয় পাই না। তখন বিষ্ণু ক্ষুব্ধ হইয়া মহামুনিকে চক্র উত্তোলন করে মারতে উদ্যত হলেন। তখন মুনির সহিত ভয়ানক যুদ্ধ বাধলো। অতপর বিষ্ণু মুনির বিস্ময় সাধনার্থে বিশ্বমূর্তি ধারন করলেনঃ

- অনন্তর হরি মুনির বিস্ময় সাধনার্থে বিশ্বমূর্তি ধারন করলেন। মুনিবর ভগবান দধিচী নারায়ন শরীর মধ্যে পৃথক পৃথক দেবতা, কোটি কোটি রুদ্র এবং কোটি কোটি ব্রহ্মান্ড অবলোকন করলেন।

(৫৮;৫৯)

অতঃপর দধীচি মুনি মুনি বললেন -

- হে মহাবাহো! বিচারপূর্বক প্রতিভা দ্বারা মায়া ত্যাগ করুন, হে মাধব! বিজ্ঞানসহস্র নিতান্ত দূর্বিজ্ঞেয়। হে অনিন্দিত! আমি তোমাকে দিব্যদৃষ্টি দান করিতেছি, তুমি আমার শরীর মধ্যে তোমা সহ সমস্ত জগৎ ব্রহ্মা, রুদ্র এই সকল অবলোকন করো। (৬২;৬৩)

শ্লোকগুলোতে দধীচি মুনি বিশ্বরূপ কে মায়ার সাথে তুলোনা করেছেন এমনকি তিনি নিজেও বিষ্ণুকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন। অতঃএব বিশ্বরূপ প্রদর্শন একজন মুনির পক্ষেও সম্ভব।

পুরাণ সমূহে বিশ্বরূপের এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে।

'অচিন্ত্যভেদাভেদ' পদের কতিপয় যৌক্তিক অসঙ্গতি বিংশ শতাব্দীর অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি পর্যালোচনা

  ভূমিকা গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের কেন্দ্রীয় মতবাদ হলো 'অচিন্ত্যভেদাভেদ'। শ্রীচৈতন্যের ভাবধারা থেকে উদ্ভূত এই দার্শনিক অবস্থানটি ঈশ্...

Popular Posts